লেখক: মাহাতাব আকন্দ
প্রকাশনা: Friends of Quran Foundation
الْيَوْمَ أُحِلَّ لَكُمُ الطَّيِّبَاتُ ۖ وَطَعَامُ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ حِلٌّ لَّكُمْ وَطَعَامُكُمْ حِلٌّ لَّهُمْ ۖ وَالْمُحْصَنَاتُ مِنَ الْمُؤْمِنَاتِ وَالْمُحْصَنَاتُ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِن قَبْلِكُمْ إِذَا آتَيْتُمُوهُنَّ أُجُورَهُنَّ مُحْصِنِينَ غَيْرَ مُسَافِحِينَ وَلَا مُتَّخِذِي أَخْدَانٍ ۗ وَمَن يَكْفُرْ بِالْإِيمَانِ فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِينَ
আজ তোমাদের জন্য পবিত্র ও উত্তম বস্তুসমূহ বৈধ করা হয়েছে। যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে তাদের খাদ্য তোমাদের জন্য বৈধ, আর তোমাদের খাদ্য তাদের জন্য বৈধ। মুমিন নারীদের মধ্যে সচ্চরিত্র নারীরা এবং তোমাদের পূর্বে যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছিল তাদের সচ্চরিত্র নারীরাও তোমাদের জন্য বৈধ—যখন তোমরা তাদের প্রাপ্য দান প্রদান করবে, বিবাহের উদ্দেশ্যে; ব্যভিচারী হয়ে নয় এবং গোপন সম্পর্ক গ্রহণকারী হয়ে নয়। আর যে ব্যক্তি বিশ্বাস অস্বীকার করে, তার কাজ নিষ্ফল হয়ে যাবে, এবং সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।
সূরা আল-মায়িদাহর ৫ নম্বর আয়াত ইসলামের সামাজিক সম্পর্ক, খাদ্যবিধান, বিবাহনীতি এবং ঈমানের মৌলিক অবস্থানকে একত্রে তুলে ধরে। এটি পূর্ববর্তী আয়াতের (৫:৩–৪) ধারাবাহিকতা, যেখানে হালাল-হারামের সীমা নির্ধারণ করা হয়েছে। এখানে সেই সীমার ভেতরে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিস্তার ঘটানো হয়েছে—বিশেষত আহলে কিতাবের সাথে সামাজিক ও বৈবাহিক সম্পর্ক প্রসঙ্গে।
আয়াতের শুরুতেই আবারও ঘোষণা—
আজ তোমাদের জন্য পবিত্র ও উত্তম বস্তুসমূহ বৈধ করা হয়েছে।
“তাইয়্যিবাত” শব্দটি পুনরায় এসেছে (দেখুন ৫:৪)। অর্থাৎ ইসলামের খাদ্যনীতি সংকীর্ণ নয়। মূলনীতি হলো—পবিত্র, কল্যাণকর, নৈতিকভাবে গ্রহণযোগ্য বস্তু বৈধ। হারাম নির্দিষ্ট ব্যতিক্রম।
এখানে “আজ” শব্দটি (اليوم) গুরুত্বপূর্ণ। এটি দ্বীনের পূর্ণতার প্রেক্ষাপটে এসেছে (৫:৩)। অর্থাৎ ইসলামের বিধান সুস্পষ্ট হয়েছে; খাদ্য ও সামাজিক সম্পর্কের নীতি নির্ধারিত।
“وطعام الذين أوتوا الكتاب حل لكم وطعامكم حل لهم”
যাদেরকে কিতাব দেওয়া হয়েছে—অর্থাৎ ইয়াহূদী ও নাসারা—তাদের খাদ্য তোমাদের জন্য বৈধ, আর তোমাদের খাদ্য তাদের জন্য বৈধ।
এখানে “তা‘আম” শব্দটি অধিকাংশ তাফসীরে যবেহকৃত খাদ্যের দিকে ইঙ্গিত করে। অর্থাৎ তাদের সঠিক পদ্ধতিতে যবেহকৃত পশু মুসলিমদের জন্য বৈধ। এটি ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক নীতি—সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নতা নয়; বরং নৈতিক সীমার মধ্যে সহাবস্থান।
এখানে দুটি বিষয় স্পষ্ট:
১. ইসলাম আহলে কিতাবকে সম্পূর্ণ মুশরিকদের মতো বিবেচনা করেনি।
২. খাদ্যের বিনিময় সামাজিক সম্পর্কের একটি মাধ্যম।
সূরা মায়িদাহ (৫:৪৮)-এ বলা হয়েছে—আল্লাহ প্রত্যেকের জন্য আলাদা শরিয়াহ নির্ধারণ করেছেন। কিন্তু ন্যায় ও সৎকর্মে সহযোগিতা সম্ভব।
এরপর আয়াত বৈবাহিক সম্পর্কের কথা বলে—
“والمحصنات من المؤمنات والمحصنات من الذين أوتوا الكتاب”
মুমিন নারীদের মধ্যে সচ্চরিত্র নারীরা এবং আহলে কিতাবের সচ্চরিত্র নারীরা বৈধ।
এখানে “মুহসানাত” শব্দের অর্থ—সচ্চরিত্র, পবিত্র, শালীন। অর্থাৎ বৈধতা শর্তহীন নয়। চরিত্রগত শুদ্ধতা আবশ্যক।
এটি গুরুত্বপূর্ণ যে এখানে “মুহসানাত” শর্ত দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ কেবল ধর্মীয় পরিচয় যথেষ্ট নয়; নৈতিক চরিত্রও শর্ত।
এরপর বলা হয়েছে—
“إذا آتيتموهن أجورهن”
যখন তোমরা তাদের প্রাপ্য দান প্রদান করবে।
এটি মোহর (মাহর) — যা নারীর অধিকার। বিবাহ একটি চুক্তি; শারীরিক সম্পর্কের বৈধতার পূর্বশর্ত হলো সম্মানজনক চুক্তি ও আর্থিক দায়বদ্ধতা।
এরপর দুটি নিষেধ—
“غير مسافحين ولا متخذي أخدان”
ব্যভিচারী হয়ে নয় এবং গোপন সম্পর্ক গ্রহণকারী হয়ে নয়।
এখানে ইসলাম বৈধ বিবাহ ও অবৈধ সম্পর্কের পার্থক্য স্পষ্ট করেছে। “মুসাফিহ” মানে প্রকাশ্য ব্যভিচারী; “মুতাখিযি আখদান” মানে গোপন প্রেমিক/প্রেমিকা গ্রহণকারী। অর্থাৎ প্রকাশ্য হোক বা গোপন—ব্যভিচার হারাম।
এই অংশ আধুনিক সমাজেও অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক। ইসলাম বিবাহকে সামাজিক ও নৈতিক কাঠামোর মধ্যে স্থাপন করে। সম্পর্ক হবে দায়িত্বপূর্ণ, প্রকাশ্য ও বৈধ।
আয়াতের শেষাংশ হঠাৎ একটি সতর্কতা দেয়—
“ومن يكفر بالإيمان فقد حبط عمله”
যে ব্যক্তি ঈমান অস্বীকার করে, তার কাজ নিষ্ফল।
এখানে “ইমান” শব্দটি মৌলিক বিশ্বাসের দিকে ইঙ্গিত করে। অর্থাৎ সামাজিক সম্পর্ক, বিবাহ, খাদ্য—সবই বৈধ হতে পারে; কিন্তু ঈমান ছাড়া আমল টেকে না। দ্বীনের মূল ভিত্তি আকীদা।
“وهو في الآخرة من الخاسرين”
সে আখিরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হবে।
এটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ উপসংহার। ইসলাম সামাজিক সহাবস্থান অনুমোদন করে, কিন্তু আকীদাগত আপস নয়। ঈমান রক্ষা সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার।
এই আয়াত চারটি বড় শিক্ষা দেয়:
১. ইসলাম পবিত্রতার ভিত্তিতে বৈধতার নীতি স্থাপন করেছে।
২. আহলে কিতাবের সাথে সীমাবদ্ধ সামাজিক সম্পর্ক বৈধ।
৩. বিবাহ হবে সচ্চরিত্রতা ও দায়িত্বের ভিত্তিতে।
৪. ঈমান ছাড়া আমল অর্থহীন।
এখানে একটি ভারসাম্য আছে—উন্মুক্ততা ও সীমারেখা। ইসলাম বিচ্ছিন্নতা চায় না; কিন্তু আকীদার আপসও নয়।
✔ হালাল-তাইয়্যিব নীতি অনুসরণ
✔ আহলে কিতাবের সাথে ন্যায়ভিত্তিক সম্পর্ক
✔ বিবাহে সচ্চরিত্রতা ও দায়িত্বশীলতা
✔ ব্যভিচার ও গোপন সম্পর্ক বর্জন
✔ ঈমানকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দেওয়া
আল্লাহ আমাদেরকে পবিত্র জীবনযাপনের তাওফীক দিন, নৈতিক সীমা রক্ষা করার শক্তি দান করুন, এবং ঈমানের উপর দৃঢ় রাখুন—যাতে আমাদের আমল আখিরাতে ফলপ্রসূ হয়।
