• বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ০৪:১৫ পূর্বাহ্ন

তাফসীর | সূরা ২ : আয়াত ১৯৩

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ২১২ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৩ মার্চ, ২০২৬

তাফসীর | সূরা আল-বাকারা : আয়াত ১৯৩

লেখক: মাহাতাব আকন্দ
প্রকাশনা: Friends of Quran Foundation


আরবি আয়াত

وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّىٰ لَا تَكُونَ فِتْنَةٌ وَيَكُونَ الدِّينُ لِلَّهِ ۖ فَإِنِ انتَهَوْا فَلَا عُدْوَانَ إِلَّا عَلَى الظَّالِمِينَ


বাংলা ভাবার্থ

তোমরা তাদের বিরুদ্ধে লড়াই করো—যতক্ষণ না ফিতনা দূর হয় এবং দ্বীন আল্লাহর জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়। কিন্তু যদি তারা বিরত হয়, তবে জালিমদের ছাড়া আর কারও বিরুদ্ধে শত্রুতা নেই।


আয়াতের তাফসীর ও বিশদ ব্যাখ্যা

এই আয়াতটি কুরআনের জিহাদ-সংক্রান্ত আয়াতগুলোর মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত। কিন্তু এটি সঠিক প্রেক্ষাপট ছাড়া বোঝা হলে ভুল ধারণা তৈরি হতে পারে। তাই আয়াতটি পূর্ববর্তী আয়াতসমূহ (২:১৯০–১৯২) এবং সামগ্রিক কুরআনিক নীতির আলোকে বোঝা আবশ্যক।


১. প্রেক্ষাপট: প্রতিরক্ষামূলক যুদ্ধ

সূরা আল-বাকারার ১৯০ নম্বর আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—

“যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করে, তোমরাও আল্লাহর পথে তাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করো; কিন্তু সীমালঙ্ঘন করো না।”

অর্থাৎ যুদ্ধের অনুমতি দেওয়া হয়েছে আক্রমণের প্রতিক্রিয়ায়, সীমালঙ্ঘন নয়।

মক্কার মুসলিমরা দীর্ঘদিন নির্যাতিত হয়েছিল। তাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেওয়া হয়েছিল (২:১৯১)। সেই প্রেক্ষাপটে এই নির্দেশ।


২. “وقاتلوهم حتى لا تكون فتنة” — ফিতনা দূর না হওয়া পর্যন্ত

“ফিতনা” শব্দটি এখানে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

এটি সাধারণ অর্থে মতভেদ নয়; বরং নিপীড়ন, ধর্মীয় স্বাধীনতা হরণ, ঈমানের কারণে অত্যাচার।

সূরা আনফাল (৮:৩৯)-এ একই বাক্য এসেছে।

অর্থাৎ লড়াইয়ের উদ্দেশ্য ছিল—

  • জোরপূর্বক ধর্মত্যাগ বন্ধ করা
  • নির্যাতন দূর করা
  • ধর্মচর্চার স্বাধীনতা নিশ্চিত করা

এটি কোনো জোরপূর্বক ধর্মপ্রচার নয়।


৩. “ويكون الدين لله” — দ্বীন আল্লাহর জন্য

এর মানে—
ধর্মচর্চা হবে আল্লাহর জন্য স্বাধীনভাবে।

কুরআন স্পষ্টভাবে বলেছে—

“দ্বীনে কোনো জবরদস্তি নেই।” (২:২৫৬)

অতএব “দ্বীন আল্লাহর জন্য” মানে—
শিরক বা জোরপূর্বক ব্যবস্থা নয়;
বরং নিপীড়নমুক্ত পরিবেশ।


৪. “فإن انتهوا” — যদি তারা বিরত হয়

এখানে শান্তির দরজা খোলা রাখা হয়েছে।

যদি তারা অত্যাচার বন্ধ করে, যুদ্ধ বন্ধ করে—
তাহলে আর শত্রুতা নয়।

এটি প্রতিশোধের নীতি নয়;
এটি ন্যায়ভিত্তিক প্রতিরক্ষা।


৫. “فلا عدوان إلا على الظالمين” — জালিমদের বিরুদ্ধে ছাড়া শত্রুতা নেই

অর্থাৎ আক্রমণ নয়;
অন্যায়কারীর বিরুদ্ধে সীমিত প্রতিরোধ।

ইসলাম যুদ্ধকে লক্ষ্য নয়; বরং অন্যায় প্রতিরোধের উপায় হিসেবে দেখে।


৬. ভারসাম্যপূর্ণ বোঝাপড়া

এই আয়াতকে বিচ্ছিন্নভাবে নিলে কেউ ভাবতে পারে—
ইসলাম চিরস্থায়ী যুদ্ধের আহ্বান করে।

কিন্তু কুরআনের পূর্ণ বার্তা হলো—

  • জবরদস্তি নেই (২:২৫৬)
  • শান্তির প্রস্তাব এলে গ্রহণ (৮:৬১)
  • সীমালঙ্ঘন নয় (২:১৯০)
  • ন্যায়বিচার বজায় রাখা (৫:৮)

অতএব এটি নির্যাতনবিরোধী প্রতিরক্ষা নীতি।


৭. আধুনিক প্রাসঙ্গিকতা

আজ “ফিতনা” হতে পারে—

  • ধর্মীয় স্বাধীনতা হরণ
  • বিশ্বাসের কারণে নিপীড়ন
  • অন্যায়ের প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থা

এই আয়াত ন্যায়ভিত্তিক প্রতিরোধের নীতি দেয়।


গভীর তাৎপর্য

এই আয়াতের মূল শিক্ষা—

১. যুদ্ধ লক্ষ্য নয়; নিপীড়ন দূর করা লক্ষ্য।
২. সীমালঙ্ঘন হারাম।
৩. শান্তি এলে যুদ্ধ বন্ধ।
৪. ন্যায়বিচারই মূলনীতি।


সম্পর্কিত আয়াতসমূহ

  • ২:১৯০ — সীমালঙ্ঘন নয়
  • ২:২৫৬ — দ্বীনে জবরদস্তি নেই
  • ৮:৬১ — শান্তির প্রস্তাব গ্রহণ
  • ৫:৮ — ন্যায়বিচার

সংক্ষেপে (করণীয়)

✔ অন্যায়ের বিরুদ্ধে দাঁড়ানো
✔ সীমালঙ্ঘন না করা
✔ শান্তির সুযোগ গ্রহণ
✔ ন্যায়কে অগ্রাধিকার দেওয়া
✔ ফিতনার প্রকৃত অর্থ বোঝা

আল্লাহ আমাদেরকে ন্যায়ভিত্তিক অবস্থান গ্রহণের তাওফীক দিন, যেন আমরা অন্যায়ের বিরুদ্ধে দৃঢ় থাকি, কিন্তু সীমালঙ্ঘন না করি। নিশ্চয় আল্লাহ জালিমদের পছন্দ করেন না।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page