• রবিবার, ২০ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০২:৪১ অপরাহ্ন

তাফসীর | ৩৫ : আয়াত ৩২

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ৩২৫ Time View
Update : মঙ্গলবার, ৩ মার্চ, ২০২৬

তাফসীর | সূরা ফাতির : আয়াত ৩২

লেখক: মাহাতাব আকন্দ
প্রকাশনা: Friends of Quran Foundation


আরবি আয়াত

ثُمَّ أَوْرَثْنَا الْكِتَابَ الَّذِينَ اصْطَفَيْنَا مِنْ عِبَادِنَا ۖ فَمِنْهُمْ ظَالِمٌ لِّنَفْسِهِ وَمِنْهُمْ مُقْتَصِدٌ وَمِنْهُمْ سَابِقٌ بِالْخَيْرَاتِ بِإِذْنِ اللَّهِ ۚ ذَٰلِكَ هُوَ الْفَضْلُ الْكَبِيرُ


বাংলা ভাবার্থ

তারপর আমরা কিতাবের উত্তরাধিকারী বানিয়েছি আমাদের বান্দাদের মধ্যে যাদেরকে আমরা নির্বাচিত করেছি। অতঃপর তাদের মধ্যে কেউ নিজের উপর জুলুমকারী, কেউ মধ্যপন্থী, আর কেউ আল্লাহর অনুমতিতে সৎকর্মে অগ্রগামী। এটাই মহা অনুগ্রহ।


আয়াতের তাফসীর ও বিশদ ব্যাখ্যা

এই আয়াত কুরআনের একটি অত্যন্ত গভীর আয়াত। এখানে “কিতাবের উত্তরাধিকার” এবং “নির্বাচিত বান্দা” — এই দুটি ধারণা একত্রে এসেছে। তারপর সেই নির্বাচিতদের মধ্যেই তিন শ্রেণির মানুষ বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ কুরআনের উত্তরাধিকারী হওয়া মানেই সবাই সমান স্তরে নয়।


১. “ثم أورثنا الكتاب” — কিতাবের উত্তরাধিকার

“আওরাছনা” মানে উত্তরাধিকার দেওয়া।

অর্থাৎ আল্লাহ কিতাবকে (কুরআনকে) এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে আমানত হিসেবে দিয়েছেন।

এটি কেবল পাঠের দায়িত্ব নয়;
এটি বোঝা, মানা, বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব।

সূরা বাকারায় (২:১২১) বলা হয়েছে—
যারা কিতাবকে যথাযথভাবে তিলাওয়াত করে, তারাই প্রকৃত ঈমানদার।

অতএব “কিতাবের উত্তরাধিকারী” মানে—কুরআনের বাহক উম্মাহ।


২. “الذين اصطفينا من عبادنا” — নির্বাচিত বান্দা

“ইস্তাফাইনা” মানে বাছাই করা, নির্বাচন করা।

এখানে একটি বড় মর্যাদা দেওয়া হয়েছে—এই উম্মাহ নির্বাচিত।

সূরা হাজ্জ (২২:৭৮)-এ বলা হয়েছে—
“তিনি তোমাদেরকে নির্বাচন করেছেন।”

কিন্তু নির্বাচন মানে দায়িত্ব।
নির্বাচিত হওয়া মানে পরীক্ষা।


৩. তিন শ্রেণির উত্তরাধিকারী

এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ—

(ক) “فمنهم ظالم لنفسه” — নিজের উপর জুলুমকারী

এরা কুরআনের উত্তরাধিকারী হলেও নিজেদের উপর জুলুম করে।

জুলুম এখানে মানে—

  • কুরআনের নির্দেশ উপেক্ষা
  • পাপ করা
  • দায়িত্বে গাফিল হওয়া

তারা কিতাবের উম্মাহ, কিন্তু পূর্ণ অনুসারী নয়।


(খ) “ومنهم مقتصد” — মধ্যপন্থী

“মুকতাসিদ” মানে সংযত, ভারসাম্যপূর্ণ।

এরা ফরজ পালন করে, হারাম বর্জন করে।
কিন্তু অতিরিক্ত অগ্রসর নয়।

এরা নিরাপদ অবস্থানে থাকে।


(গ) “ومنهم سابق بالخيرات بإذن الله” — সৎকর্মে অগ্রগামী

“সাবিক” মানে এগিয়ে যাওয়া।

এরা শুধু ফরজ নয়, নফল, সেবা, দাওয়াহ, ত্যাগ—সবকিছুতে অগ্রগামী।

কিন্তু লক্ষ্য করুন—
“بإذن الله” — আল্লাহর অনুমতিতে।

অর্থাৎ অগ্রগামিতা অহংকার নয়; তাওফীক।


৪. “ذلك هو الفضل الكبير” — মহা অনুগ্রহ

আল্লাহ বলেন—এটাই বড় অনুগ্রহ।

অর্থাৎ কুরআনের উত্তরাধিকারী হওয়াই বিশাল ফজিলত।

যদিও তিন স্তর আছে, তবুও তারা নির্বাচিত উম্মাহ।

এটি আশাবাদও দেয়—
নিজের উপর জুলুমকারীও উম্মাহর অংশ।
কিন্তু লক্ষ্য হবে—সাবিক হওয়া।


৫. আয়াতের কাঠামো

এই আয়াতের গভীর দিক হলো—
জুলুমকারীকে প্রথমে উল্লেখ করা হয়েছে।

এতে বোঝা যায়—
উম্মাহর বড় অংশ দুর্বল হতে পারে।
তবুও তারা কিতাবের উত্তরাধিকারী।

কিন্তু লক্ষ্য—অগ্রগামী হওয়া।


৬. বাস্তব প্রয়োগ

আমরা নিজেদেরকে কোন স্তরে দেখি?

  • কুরআন পড়ে কিন্তু মানি না?
  • মানি, কিন্তু সীমিতভাবে?
  • নাকি অগ্রগামী?

এই আয়াত আত্মমূল্যায়নের আয়াত।


৭. ভারসাম্য

এখানে দুটি চরমপন্থা ভেঙে দেওয়া হয়েছে—

১. সবাই সমান নয়।
২. আবার কেউ কিতাব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নও নয় (যদি ঈমান থাকে)।

এটি আশা ও সতর্কতার সমন্বয়।


সম্পর্কিত আয়াতসমূহ

  • ২:১২১ — যথাযথ তিলাওয়াত
  • ২২:৭৮ — নির্বাচিত উম্মাহ
  • ৩:১১০ — শ্রেষ্ঠ উম্মাহ
  • ৫৬:১০–১১ — অগ্রগামীদের মর্যাদা

গভীর তাৎপর্য

এই আয়াত আমাদের পরিচয় নির্ধারণ করে—

আমরা কুরআনের উত্তরাধিকারী।
কিন্তু উত্তরাধিকার মানে দায়িত্ব।

তিন স্তরের মধ্যে আমাদের অবস্থান নির্ধারণ করতে হবে।

লক্ষ্য হবে—
নিজের উপর জুলুমকারী থেকে মুকতাসিদ,
আর মুকতাসিদ থেকে সাবিক হওয়া।


সংক্ষেপে (করণীয়)

✔ কুরআনের দায়িত্ব উপলব্ধি
✔ আত্মমূল্যায়ন করা
✔ ফরজে দৃঢ় থাকা
✔ সৎকর্মে অগ্রগামী হওয়ার চেষ্টা
✔ অহংকার নয়, আল্লাহর তাওফীকের উপর নির্ভর

আল্লাহ আমাদেরকে কুরআনের প্রকৃত উত্তরাধিকারী বানান—যারা কেবল নামমাত্র নয়, বরং সৎকর্মে অগ্রগামী। নিশ্চয় সেটাই মহা অনুগ্রহ।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page