• বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:১৯ পূর্বাহ্ন

তাফসীর | সূরা ৬৫ : আয়াত ৪

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ২২৬ Time View
Update : বৃহস্পতিবার, ৫ মার্চ, ২০২৬

তাফসীর | সূরা আত-তালাক : আয়াত ৪

লেখক: মাহাতাব আকন্দ
প্রকাশনা: Friends of Quran Foundation


আরবি আয়াত

وَاللَّائِي يَئِسْنَ مِنَ الْمَحِيضِ مِن نِّسَائِكُمْ إِنِ ارْتَبْتُمْ فَعِدَّتُهُنَّ ثَلَاثَةُ أَشْهُرٍ وَاللَّائِي لَمْ يَحِضْنَ ۚ وَأُولَاتُ الْأَحْمَالِ أَجَلُهُنَّ أَن يَضَعْنَ حَمْلَهُنَّ ۚ وَمَن يَتَّقِ اللَّهَ يَجْعَل لَّهُ مِنْ أَمْرِهِ يُسْرًا


বাংলা ভাবার্থ

আর তোমাদের নারীদের মধ্যে যারা ঋতুস্রাব থেকে নিরাশ হয়ে গেছে—যদি তোমাদের সন্দেহ থাকে—তবে তাদের ইদ্দত তিন মাস। আর যারা এখনও ঋতুবতী হয়নি তাদেরও ইদ্দত তিন মাস। আর গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতের সময় হলো তাদের সন্তান প্রসব পর্যন্ত। আর যে আল্লাহর বিষয়ে সচেতন থাকে, তিনি তার জন্য তার ব্যাপারে সহজতা সৃষ্টি করেন।


আয়াতের তাফসীর ও বিশদ ব্যাখ্যা

সূরা আত-তালাকের এই আয়াত মূলত তালাকের পরে নারীর ইদ্দতের সময়সীমা নির্ধারণ নিয়ে আলোচনা করে। ইসলামী পারিবারিক আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হলো তালাকের পর নির্দিষ্ট সময় অপেক্ষা করা, যাকে ইদ্দত বলা হয়। এই সময়ের উদ্দেশ্য হলো পারিবারিক সম্পর্কের সম্ভাব্য পুনর্বিবেচনা, গর্ভধারণের বিষয় নিশ্চিত করা এবং সামাজিক শৃঙ্খলা বজায় রাখা।

এই আয়াতকে কেন্দ্র করে মাঝে মাঝে ভুল ধারণা তৈরি হয়—বিশেষ করে “যারা এখনও ঋতুবতী হয়নি” অংশটি নিয়ে। কিন্তু আয়াতটির ভাষা, প্রেক্ষাপট এবং কুরআনের সামগ্রিক নীতিমালা বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়—এই আয়াত বিবাহের অনুমতি বা বয়স নির্ধারণ করছে না, বরং তালাকের পরে বিভিন্ন পরিস্থিতিতে ইদ্দতের সময় কীভাবে গণনা করা হবে তা ব্যাখ্যা করছে।


ইদ্দত কী এবং কেন

কুরআনে তালাকের পরে ইদ্দতের বিষয়টি একাধিক স্থানে এসেছে। সূরা আল-বাকারা ২:২২৮ আয়াতে বলা হয়েছে—

“তালাকপ্রাপ্ত নারীরা নিজেদেরকে তিন ঋতুচক্র পর্যন্ত অপেক্ষায় রাখবে।”

এই নিয়ম সাধারণ পরিস্থিতির জন্য। অর্থাৎ একজন নারী যার নিয়মিত ঋতুচক্র রয়েছে, তার ইদ্দত নির্ধারণ করা হয় তিনটি মাসিক চক্র দ্বারা।

এর পেছনে কয়েকটি উদ্দেশ্য রয়েছে:

১. সম্ভাব্য গর্ভধারণ নির্ধারণ
২. আবেগের সময় পার হওয়া
৩. দাম্পত্য সম্পর্ক পুনর্বিবেচনার সুযোগ
৪. সামাজিক শৃঙ্খলা রক্ষা

কিন্তু বাস্তবে সব নারীর ক্ষেত্রে মাসিক চক্র দিয়ে সময় গণনা করা সম্ভব নয়। সূরা তালাকের এই আয়াত সেই ব্যতিক্রমী পরিস্থিতিগুলোর সমাধান দিয়েছে।


“واللائي يئسن من المحيض” — যাদের মাসিক বন্ধ হয়ে গেছে

আয়াতের প্রথম অংশে বলা হয়েছে—

“তোমাদের নারীদের মধ্যে যারা ঋতুস্রাব থেকে নিরাশ হয়ে গেছে।”

এটি সেই নারীদের বোঝায় যারা মেনোপজে পৌঁছেছে। অর্থাৎ বয়সের কারণে তাদের মাসিক বন্ধ হয়ে গেছে।

এমন অবস্থায় তিন মাসিক চক্র দিয়ে ইদ্দত নির্ধারণ করা সম্ভব নয়। তাই বিকল্প সময় নির্ধারণ করা হয়েছে—

তিন মাস।

অর্থাৎ এখানে মাসিকের পরিবর্তে সময়ের হিসাব দেওয়া হয়েছে।


“واللائي لم يحضن” — যারা ঋতুবতী হয়নি

এই অংশটি সবচেয়ে বেশি আলোচনার বিষয়। কিন্তু আয়াতের ভাষা গভীরভাবে দেখলে বোঝা যায়—এটি বিবাহের অনুমতি নিয়ে নয়; বরং ইদ্দতের হিসাব নিয়ে।

কিছু নারীর ক্ষেত্রে মাসিক নিয়মিত হয় না, অথবা বিভিন্ন শারীরিক কারণে মাসিক শুরু হয়নি। এমন পরিস্থিতিতে তিন মাসিক চক্র দিয়ে ইদ্দত নির্ধারণ করা সম্ভব নয়।

সেই জন্যই এখানে বিকল্প সময় নির্ধারণ করা হয়েছে—

তিন মাস।

অর্থাৎ এটি একটি আইনি নির্দেশনা—কীভাবে ইদ্দত গণনা করা হবে।


“وأولات الأحمال” — গর্ভবতী নারীদের ইদ্দত

আয়াতের তৃতীয় অংশে বলা হয়েছে—

“গর্ভবতী নারীদের ইদ্দতের সময় তাদের সন্তান প্রসব পর্যন্ত।”

এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ বিধান। কারণ গর্ভবতী নারীর ক্ষেত্রে তিন মাস বা তিন মাসিক চক্র যথেষ্ট নাও হতে পারে। তাই কুরআন স্পষ্টভাবে বলেছে—

ইদ্দতের সমাপ্তি হবে সন্তান জন্মের মাধ্যমে

এই বিধানটি সূরা আল-বাকারার ২:২৩৪ আয়াতের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ, যেখানে বিধবা নারীর ইদ্দতের সময় নির্ধারণ করা হয়েছে।


বিবাহের ক্ষেত্রে কুরআনের নীতি

এই আয়াতকে বোঝার সময় কুরআনের অন্যান্য আয়াতও দেখতে হবে। কুরআনে বিবাহের প্রসঙ্গে বারবার “নিসা” শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে।

আরবি ভাষায় “নিসা” শব্দ সাধারণত পূর্ণবয়স্ক নারীদের বোঝায়।

সূরা নিসা ৪:৩ আয়াতে বলা হয়েছে—

“তোমরা নারীদের মধ্যে যাদের তোমাদের কাছে উত্তম মনে হয় তাদেরকে বিবাহ করো।”

এখানে “নিসা” শব্দ ব্যবহৃত হয়েছে।


বিবাহের জন্য পরিপক্বতার শর্ত

সূরা নিসা ৪:৬ আয়াতে বলা হয়েছে—

“এতিমদের পরীক্ষা করো যতক্ষণ না তারা বিয়ের বয়সে পৌঁছায় এবং তাদের মধ্যে পরিপক্বতা দেখতে পাও।”

এখানে দুটি শর্ত এসেছে:

১. বিয়ের বয়সে পৌঁছানো
২. মানসিক পরিপক্বতা (রুশদ)

অর্থাৎ কুরআনের দৃষ্টিতে বিবাহ কেবল বয়সের বিষয় নয়; বরং শারীরিক ও মানসিক পরিপক্বতার বিষয়।


সূরা তালাক ৪ আয়াতের প্রকৃত উদ্দেশ্য

এই আয়াতের মূল বিষয় হলো—

তালাকের পরে ইদ্দতের সময়সীমা নির্ধারণ।

এটি কোনো নতুন বিবাহের অনুমতি বা বয়স নির্ধারণের আয়াত নয়।

আয়াতটি তিন ধরনের নারীর জন্য বিধান দিয়েছে:

১. যাদের মাসিক বন্ধ হয়ে গেছে
২. যাদের মাসিক হয়নি বা নিয়মিত নয়
৩. যারা গর্ভবতী

এই তিন পরিস্থিতিতে কীভাবে ইদ্দত গণনা হবে তা ব্যাখ্যা করা হয়েছে।


বাস্তব জীবনের আইনি সমাধান

কুরআনের আইন বাস্তব জীবনের সমস্যার সমাধান দেয়।

কখনো এমন পরিস্থিতি হতে পারে যা আদর্শ নয়, কিন্তু আইনকে সেই পরিস্থিতির জন্যও নির্দেশ দিতে হয়।

উদাহরণ হিসেবে বলা যায়—আইনে বলা থাকে:

“যদি দুর্ঘটনায় মৃত্যু ঘটে তবে ক্ষতিপূরণ দিতে হবে।”

এই আইন দুর্ঘটনাকে উৎসাহ দেয় না; বরং ঘটলে কীভাবে বিচার হবে তা নির্ধারণ করে।

একইভাবে সূরা তালাক ৪ আয়াতটি একটি বাস্তব পরিস্থিতির আইনি সমাধান


আয়াতের শেষ অংশ: তাকওয়ার শিক্ষা

আয়াতের শেষে বলা হয়েছে—

“যে আল্লাহর বিষয়ে সচেতন থাকে, তিনি তার জন্য তার ব্যাপারে সহজতা সৃষ্টি করেন।”

এটি তালাকের প্রসঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা।

তালাক একটি সংবেদনশীল বিষয়। আবেগ, ক্ষোভ বা প্রতিশোধের মাধ্যমে এটি পরিচালিত হলে অন্যায় হতে পারে।

তাই কুরআন বারবার তাকওয়ার কথা স্মরণ করিয়ে দেয়—যেন মানুষ ন্যায় ও দায়িত্বের সাথে সিদ্ধান্ত নেয়।


গভীর তাৎপর্য

এই আয়াত কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি তুলে ধরে:

১. কুরআনের আইন বাস্তব জীবনের জন্য প্রযোজ্য
২. তালাকের পর ইদ্দত পারিবারিক শৃঙ্খলার অংশ
৩. বিভিন্ন পরিস্থিতির জন্য আলাদা বিধান রয়েছে
৪. তাকওয়া আইন প্রয়োগের মূল ভিত্তি


সম্পর্কিত আয়াতসমূহ

  • ২:২২৮ — তালাকপ্রাপ্ত নারীর ইদ্দত
  • ২:২৩৪ — বিধবা নারীর ইদ্দত
  • ৪:৩ — বিবাহের প্রসঙ্গ
  • ৪:৬ — বিবাহের পরিপক্বতা
  • ৬৫:১ — তালাকের বিধান

সংক্ষেপে (করণীয়)

✔ তালাকের ক্ষেত্রে কুরআনের বিধান মেনে চলা
✔ ইদ্দতের সময়সীমা সম্মান করা
✔ পারিবারিক বিষয়ে ন্যায় ও সংযম বজায় রাখা
✔ বিবাহে পরিপক্বতার গুরুত্ব উপলব্ধি করা
✔ তাকওয়ার মাধ্যমে সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা


আল্লাহ আমাদেরকে কুরআনের বিধান গভীরভাবে বুঝার তাওফীক দিন এবং পারিবারিক জীবনে ন্যায়, সংযম ও দায়িত্ববোধ প্রতিষ্ঠা করার শক্তি দান করুন। নিশ্চয় তিনি তাকওয়াবানদের জন্য পথ সহজ করে দেন।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page