• শনিবার, ৩০ মে ২০২৬, ০৫:৩৮ অপরাহ্ন

কুরআনের সঙ্গীদের ঐক্য

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ৫৪ Time View
Update : শনিবার, ৩ জানুয়ারি, ২০২৬

কুরআনের সঙ্গীদের ঐক্য
লিখকঃ- আবুল কালাম আজাদ
(সাবেক, ইলেক্ট্রিক্যাল ইঞ্জিনিয়ার, বাংলাদেশ বেতার)


আজকের মুসলিম সমাজের একটি বাস্তব চিত্র হলো—সত্য বোঝা মানুষের সংখ্যা কম নয়, কিন্তু একসাথে দাঁড়ানো মানুষের সংখ্যা খুবই কম। অনেকেই কুরআন পড়ে বুঝতে পারছেন যে হিদায়াতের মূল কেন্দ্র গ্রন্থটি নিজেই। কিন্তু এই বোঝাপড়া তাদের শক্তিশালী করেনি; বরং অনেক ক্ষেত্রে তাদের আরও নিঃসঙ্গ করে তুলেছে।


যে ব্যক্তি কুরআনকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করতে চায়, তাকে প্রায়ই পরিবারে প্রশ্নের মুখে পড়তে হয়, সমাজে সন্দেহের চোখে দেখা হয় এবং মসজিদে ভিন্ন মানুষ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। সত্য মেনে নেওয়ার পরও সে একা হয়ে যায়। এই নিঃসঙ্গতাই আজ কুরআন-অনুসারীদের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা।


সমাজে একটি কঠিন বাস্তবতা কাজ করে—একজন মানুষ একা কথা বললে তাকে সহজেই চেপে রাখা যায়, কিন্তু বহু মানুষ একসাথে কথা বললে তা উপেক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়ে। ইতিহাসে সব সময়ই দেখা গেছে, সংগঠিত মিথ্যা অনেক সময় বিচ্ছিন্ন সত্যকে চাপা দেয়। তাই কুরআনের অনুসারীদের জন্য একা থাকা কখনোই সমাধান হতে পারে না।


কুরআন এই বাস্তবতাকে অস্বীকার করেনি। বরং খুব স্পষ্ট ভাষায় নির্দেশ দিয়েছে—সবাই মিলে আল্লাহর রশি দৃঢ়ভাবে ধরতে এবং বিভক্ত না হতে। এখানে “আল্লাহর রশি” বলতে কোনো ব্যক্তি, দল, মতবাদ বা গোষ্ঠীকে বোঝানো হয়নি। বোঝানো হয়েছে সেই হিদায়াতকে, যা আল্লাহ নিজে মানুষের জন্য নির্ধারণ করেছেন—অর্থাৎ কুরআন।


সমস্যা হলো, আমরা ঐক্য বলতে প্রায়ই দল বুঝে থাকি। নতুন নাম, নতুন পরিচয়, নতুন কাঠামো। কিন্তু কুরআনের ঐক্যের ধারণা ভিন্ন। কুরআন মানুষকে এক পতাকার নিচে নয়, এক নীতির নিচে আনতে চায়। সেই নীতি হলো—আল্লাহর নির্দেশের কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ।
আজ মুসলিম সমাজে বিভাজনের অভাব নেই। মতবাদ, ফিকহ, তরিকা, আকিদা—এসব পরিচয়ের ভিড়ে আসল পরিচয় চাপা পড়ে গেছে। কুরআন এই বিভাজনকে কোনোভাবেই উৎসাহ দেয় না। বরং সতর্ক করে বলে—যারা নিজেদের দলে দলে ভাগ করেছে এবং মতভেদকে পরিচয় বানিয়েছে, তারা সঠিক পথ থেকে দূরে সরে গেছে।


এই সতর্কতা শুধু অতীতের কোনো জাতির জন্য নয়; এটি সব যুগের মানুষের জন্য। যখনই মানুষ মূল হিদায়াত ছেড়ে ব্যাখ্যা, মতবাদ ও ব্যক্তিকে কেন্দ্র বানায়—তখনই বিভাজন অনিবার্য হয়ে ওঠে।
কুরআনের অনুসারীরা আজ যে বিচ্ছিন্ন অবস্থায় আছে, তার মূল কারণ কুরআনের অভাব নয়; বরং কুরআনের চারপাশে মানুষের তৈরি দেয়াল। কেউ কুরআন বোঝার জন্য একটি নির্দিষ্ট চশমা পরতে বাধ্য করছে, কেউ আবার কুরআনের ওপর নিজের মত চাপিয়ে দিচ্ছে। ফলে কুরআন সবার হয়েও কারো হয়ে উঠছে না।
এই অবস্থায় যারা কুরআনকে সরাসরি বুঝতে চায় এবং কুরআনের আলোয় নিজেদের যাচাই করতে চায়, তারা একা পড়ে যাচ্ছে। অথচ কুরআনের নির্দেশ হলো—বিশ্বাসীরা একে অপরের সহায়ক হবে। এই সহায়তা কেবল আর্থিক বা সামাজিক নয়; এটি নৈতিক ও আদর্শিক সহায়তা।


একজন মানুষ যখন সত্য বুঝেও ভয়ে চুপ থাকে, তখন তার পাশে আরেকজন থাকা জরুরি। যখন কেউ প্রশ্ন করার কারণে সমাজচ্যুত হয়, তখন তার কণ্ঠ হওয়া দরকার। এই পারস্পরিক সহায়তা ছাড়া কুরআনের পথ চলা দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখা কঠিন।
এখানেই ঐক্যের প্রয়োজনীয়তা সামনে আসে। কিন্তু এই ঐক্য কোনো ক্ষমতা অর্জনের জন্য নয়, কোনো সংখ্যার গর্ব দেখানোর জন্য নয়। এই ঐক্য আত্মরক্ষার জন্য, সত্য টিকিয়ে রাখার জন্য এবং পরস্পরের ঈমান শক্ত করার জন্য।


কুরআন নিজেই বলে—মানুষকে একত্রিত হতে হবে ভালো কাজের আহ্বানে। এখানে “দল” শব্দটি ব্যবহৃত হলেও তা কোনো আনুষ্ঠানিক সংগঠনের অর্থে নয়; বরং সমমনা, একই নীতিতে বিশ্বাসী মানুষদের বোঝাতে।
এই ঐক্য না হলে কী হয়, তা আমরা প্রতিদিন দেখছি। বিচ্ছিন্ন মানুষ সহজেই ভেঙে পড়ে, আপস করে, অথবা নীরব হয়ে যায়। কিন্তু সহযাত্রী থাকলে মানুষ সাহস পায়, প্রশ্ন করতে শেখে এবং অন্যায়ের সামনে মাথা নত করতে অস্বীকার করে। এই বাস্তবতা বোঝা না গেলে কুরআনের আহ্বানও পূর্ণতা পায় না।


ঐক্যের উদ্দেশ্য, সীমা ও বাস্তব রূপ
কুরআনভিত্তিক ঐক্যের কথা বললেই অনেকের মনে প্রথম যে আশঙ্কা তৈরি হয়, তা হলো—নতুন কোনো দল, নতুন কোনো নাম, নতুন কোনো বিভাজন। এই আশঙ্কা অমূলক নয়, কারণ ইতিহাসে বহুবার “ঐক্য”র নামে নতুন বিভক্তি তৈরি হয়েছে।
কিন্তু কুরআনের ঐক্যের ধারণা এই পথের নয়। কুরআন কোনো নতুন পরিচয় তৈরি করতে আসেনি; বরং সব পরিচয়ের ঊর্ধ্বে একটি সহজ পরিচয় ফিরিয়ে দিতে চেয়েছে—মানুষ আল্লাহর বান্দা, আর তার পথনির্দেশ কুরআন।


এই ঐক্যের প্রথম ও মৌলিক উদ্দেশ্য হলো—কুরআনকে একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে গ্রহণ করা। অর্থাৎ চিন্তা, বিশ্বাস, সিদ্ধান্ত ও কর্মের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত বিচারক হবে কুরআন। কোনো আলেম, কোনো নেতা, কোনো ঐতিহ্য, এমনকি কোনো জনপ্রিয় ব্যাখ্যাও কুরআনের ঊর্ধ্বে অবস্থান করতে পারবে না। সবাই—বক্তা, শ্রোতা, শিক্ষক ও অনুসারী—কুরআনের সামনে জবাবদিহির আওতায় থাকবে। এই নীতির ফলে ব্যক্তি-পূজা বা চিন্তার অচলাবস্থা তৈরি হওয়ার সুযোগ বন্ধ হয়। সত্য তখন আর কোনো ব্যক্তির মুখে বন্দি থাকে না; সত্য পরিণত হয় নীতিনির্ভর ও দলনিরপেক্ষ অবস্থানে।


এই মানদণ্ড প্রতিষ্ঠিত হলে সমাজে একটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন ঘটে। মানুষ আর “কে বলেছে” তা দেখে সিদ্ধান্ত নেয় না; বরং “কী বলা হয়েছে এবং তা কুরআনের সঙ্গে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ”—এই প্রশ্ন সামনে আসে। এতে করে নেতৃত্ব হয়ে ওঠে দায়িত্বভিত্তিক, নামভিত্তিক নয়। কেউ ভুল করলে তাকে সংশোধন করা যায়, কারণ সে নিজেও কুরআনের ঊর্ধ্বে নয়। এই অবস্থানই প্রকৃত ঐক্যের ভিত্তি তৈরি করে।


ঐক্যের দ্বিতীয় উদ্দেশ্য হলো—পরস্পরের জন্য একটি নিরাপদ বুদ্ধিবৃত্তিক পরিসর তৈরি করা। আজ বাস্তবতা হলো, অনেক মানুষ কুরআনের আলোকে প্রশ্ন তুলতে ভয় পান। তারা আশঙ্কা করেন—প্রশ্ন করলেই হয়তো তাদের “ভ্রান্ত”, “বিদ্রোহী” কিংবা “বিপথগামী” আখ্যা দেওয়া হবে। এই ভয়ের সংস্কৃতি চিন্তার মৃত্যু ঘটায়। ঐক্যের অর্থ হলো—এমন পরিবেশ সৃষ্টি করা, যেখানে প্রশ্ন অপরাধ নয়, বরং বোঝার প্রথম ধাপ।


ঐক্যের তৃতীয় উদ্দেশ্য হলো—দাওয়াতকে শক্তিশালী ও কার্যকর করা। একা একা বললে অনেক সময় সত্যের কথা সমাজের গভীরে পৌঁছায় না। তা হয়তো শোনা হয়, কিন্তু গুরুত্ব পায় না। কিন্তু যখন বহু মানুষ একই নীতির কথা বলে, তখন সেই বক্তব্য আলোচনার কেন্দ্রে আসে। এখানে উদ্দেশ্য কণ্ঠের সংখ্যা বাড়ানো নয়, বরং বার্তার ওজন বাড়ানো।


এই সম্মিলিত অবস্থান সত্যকে জনপ্রিয় করার কৌশল নয়; বরং সত্যকে স্পষ্ট করার একটি উপায়। বহু কণ্ঠে একই বার্তা উচ্চারিত হলে মানুষ বুঝতে শুরু করে—এটি কোনো ব্যক্তিগত মত নয়, এটি একটি নীতিগত আহ্বান। এতে করে দাওয়াত আবেগনির্ভর না হয়ে যুক্তিনির্ভর হয়, এবং ব্যক্তিনির্ভর না হয়ে কুরআননির্ভর হয়।
ঐক্যের চতুর্থ উদ্দেশ্য হলো—ঈমান রক্ষা করা। একাকিত্ব মানুষকে ধীরে ধীরে দুর্বল করে দেয়। যখন কেউ দেখে সে একা, তখন তার মধ্যে আপসের প্রবণতা তৈরি হয়। সে চুপ থাকতে শেখে, প্রশ্ন করা বন্ধ করে দেয়, কিংবা একসময় হতাশ হয়ে পড়ে। কিন্তু সহচর থাকলে মানুষ দৃঢ় থাকে। জানে—সে একা নয়, তার পাশে এমন মানুষ আছে যারা একই নীতিতে বিশ্বাস করে।


কুরআন বারবার “একসাথে” থাকার কথা বলে এই কারণেই। কারণ ঈমান শুধু ব্যক্তিগত অনুভূতি নয়; এটি সামাজিক শক্তিও। নৈতিক দৃঢ়তা দলবদ্ধ হলে টিকে থাকে, একা হলে ক্ষয় হয়। তাই ঐক্য এখানে বিলাসিতা নয়, বরং ঈমান সংরক্ষণের একটি বাস্তব প্রয়োজন।
তবে এই ঐক্যের কিছু স্পষ্ট সীমারেখা আছে। এই ঐক্য কখনোই অন্ধ আনুগত্যের ভিত্তিতে গড়ে উঠবে না। কেউ যদি কুরআনের বিপরীতে কথা বলে, সে যত বড় নামই হোক, যত জনপ্রিয়ই হোক—তার সঙ্গে ঐক্য থাকবে না। কারণ এই ঐক্যের কেন্দ্র ব্যক্তি নয়, সত্য।
এই ঐক্য কাউকে বিশেষ মর্যাদা দেবে না, আবার কাউকে হেয়ও করবে না। এখানে নেতৃত্ব তৈরি হবে জ্ঞান, চরিত্র ও দায়িত্ববোধ থেকে—নামের জোরে নয়। কেউ শিক্ষক হবে আজ, শিক্ষার্থী হবে কাল। সবাই শেখাবে, সবাই শিখবে, এবং সবাই নিজেকে সংশোধনের জন্য উন্মুক্ত রাখবে। এই বিনয়ই ঐক্যের সৌন্দর্য।


সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই ঐক্য অন্যদের বিরুদ্ধে গড়ে তোলা কোনো প্রকল্প নয়। এটি কোনো গোষ্ঠীকে আক্রমণ করার জন্য নয়, কাউকে পরাজিত করার জন্য নয়। এটি আত্মশুদ্ধি ও সমাজ সংশোধনের একটি শান্ত কিন্তু দৃঢ় প্রক্রিয়া। এর ভাষা হবে যুক্তির, এর পদ্ধতি হবে নৈতিকতার, আর এর লক্ষ্য হবে আল্লাহর সন্তুষ্টি।


আজ যারা কুরআনের পথে একা হাঁটছেন, এই ঐক্য তাদের জন্য একটি আশার বার্তা। এটি বলছে—তুমি বিচ্ছিন্ন নও। তোমার মতো আরও মানুষ আছে, যারা প্রশ্ন করে, বোঝে এবং কুরআনের আলোয় চলতে চায়। হয়তো তারা ছড়িয়ে আছে, পরিচিত নয়, কিন্তু তারা অস্তিত্বশীল।
সমাজ হয়তো আজ এই আহ্বান পুরোপুরি বুঝবে না। ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়—সত্য সবসময়ই প্রথমে অল্পসংখ্যকের হাতে থাকে। কিন্তু কুরআন আশ্বাস দেয়—যারা সত্যনিষ্ঠ, সচেতন ও নীতিতে অটল, আল্লাহ তাদের সঙ্গে আছেন। এই সঙ্গই সবচেয়ে বড় শক্তি।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page