وَمَن يَعْشُ عَن ذِكْرِ الرَّحْمَٰنِ نُقَيِّضْ لَهُ شَيْطَانًا فَهُوَ لَهُ قَرِينٌ
“আর যে ব্যক্তি দয়াময়ের কুরআন (যিকর) থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, আমরা তার জন্য এক শয়তান নির্ধারণ করি—সে তার (ইচ্ছাকৃত) সঙ্গী হয়ে যায়।”
এই আয়াতটি কুরআনের একটি গভীর ও বাস্তবধর্মী সতর্কবার্তা। এখানে আল্লাহ তাআলা মানুষের বিভ্রান্তিকে কোনো হঠাৎ শাস্তি বা আকস্মিক পথভ্রষ্টতা হিসেবে উপস্থাপন করেননি; বরং একে কুরআন-বিমুখতার স্বাভাবিক পরিণতি হিসেবে দেখিয়েছেন। এই আয়াত আমাদের জানায়—মানুষ যখন সচেতনভাবে কুরআন থেকে দূরে সরে যায়, তখন তার জীবনে শূন্যতা সৃষ্টি হয়, আর সেই শূন্যতা কখনোই নিরপেক্ষ থাকে না।
এই আয়াতে ব্যবহৃত “যিকরুর রহমান” শব্দবন্ধকে কুরআনের আলোকে বোঝা জরুরি। কুরআন নিজেই বহু স্থানে নিজেকে “যিকর” বলে পরিচয় দিয়েছে। তাই এখানে “স্মরণ” কোনো সাধারণ জিকির বা আবেগগত অনুভূতি নয়; বরং আল্লাহর কুরআনিক নির্দেশনা, নৈতিক পথনির্দেশ ও চিন্তাগত কাঠামো।
এই আয়াতটি মূলত একটি নিয়ম (সুন্নাতুল্লাহ) ঘোষণা করছে—
যে কুরআনের আলো প্রত্যাখ্যান করে, তার জীবনে অন্ধকার কেবল অনুপস্থিতি নয়; বরং সক্রিয় বিভ্রান্তির রূপ নেয়।
এই আয়াতের বক্তব্য খুব সরল কিন্তু গভীর—
যে ব্যক্তি জেনে–বুঝে, অবহেলা করে বা গুরুত্বহীন মনে করে দয়াময়ের কুরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, আল্লাহ তাকে জোর করে পথভ্রষ্ট করেন না। বরং তার নিজের এই পছন্দের পরিণতিতে আল্লাহ তার জীবনে এক “শয়তান”কে স্থায়ী সঙ্গী হিসেবে কাজ করার সুযোগ দেন।
এই “শয়তান” কেবল জ্বিনজাত সত্তা নয়; বরং—
এসবই ধীরে ধীরে তার নিত্যসঙ্গী হয়ে যায়।
অর্থাৎ, কুরআনবিমুখতা মানুষের ভেতরে এমন একটি মানসিক পরিবেশ তৈরি করে, যেখানে ভুল আর ভুল বলে ধরা পড়ে না—বরং “স্বাভাবিক” মনে হয়।
সূরা যুখরুফে কুরআন বারবার মানুষের চিন্তাগত বিচ্যুতি, ঐতিহ্যপূজা এবং অহংকারের কথা তুলে ধরেছে। আগের আয়াতগুলোতে বলা হয়েছে—মানুষ পূর্বপুরুষদের অনুসরণকে সত্যের মানদণ্ড বানায়। ঠিক তার পরেই এই আয়াতটি আসে।
এর মাধ্যমে কুরআন স্পষ্ট করে দেয়—
যে ব্যক্তি কুরআনের পরিবর্তে সংস্কার, প্রবৃত্তি বা ব্যক্তিগত মতকে মানদণ্ড বানায়, সে কার্যত কুরআন থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়।
সিয়াক ও সিবাক অনুযায়ী, এই আয়াতটি কোনো বিচ্ছিন্ন শাস্তির ঘোষণা নয়; বরং চিন্তাগত বিচ্যুতির ধারাবাহিক ফলাফল।
কুরআনের অন্যান্য আয়াতে বলা হয়েছে—যারা আল্লাহর আয়াত উপেক্ষা করে, তাদের অন্তর ধীরে ধীরে মোহরবদ্ধ হয়ে যায়। আবার বলা হয়েছে—আল্লাহ কাউকে জুলুম করেন না; মানুষ নিজেই নিজের ওপর জুলুম করে।
এই আয়াতগুলো একত্রে প্রমাণ করে—
এই আয়াত সেই নীতির বাস্তব প্রকাশ।
এই আয়াত আমাদের শেখায়—
অতএব, কুরআনের সঙ্গে সম্পর্ক ছিন্ন করা মানে শুধু একটি গ্রন্থ বাদ দেওয়া নয়; বরং নিজের বিবেকের দিশা বন্ধ করে দেওয়া।
ভুল ধারণা: আল্লাহ ইচ্ছামতো শয়তান চাপিয়ে দেন।
সংশোধন: আয়াত বলছে—মানুষ যখন কুরআন প্রত্যাখ্যান করে, তখন তার জন্য শয়তান কার্যকর হয়ে ওঠে।
ভুল ধারণা: শয়তান মানে শুধু অতিপ্রাকৃত সত্তা।
সংশোধন: এখানে শয়তান হলো বিভ্রান্ত চিন্তা ও প্রবৃত্তির সক্রিয় রূপ।
ব্যক্তিগতভাবে:
সামাজিকভাবে:
এই আয়াত আমাদের সামনে এক নির্মম কিন্তু বাস্তব সত্য তুলে ধরে—
কুরআনকে বাদ দিলে মানুষ একা থাকে না; বরং বিভ্রান্তির সঙ্গী পেয়ে যায়।
শয়তান এখানে কোনো আকস্মিক শত্রু নয়; বরং কুরআনবিমুখ জীবনের স্বাভাবিক সঙ্গী। তাই এই আয়াত আমাদের সতর্ক করে—
কুরআনের দিকে ফিরে আসা মানে শুধু হিদায়াত পাওয়া নয়; বরং ভুল সঙ্গী থেকে মুক্তি পাওয়া।
