وَإِذَا تَوَلَّىٰ سَعَىٰ فِي الْأَرْضِ لِيُفْسِدَ فِيهَا وَيُهْلِكَ الْحَرْثَ وَالنَّسْلَ ۗ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ الْفَسَادَ
“আর যখন সে ফিরে যায়, তখন সে পৃথিবীতে দুর্নীতি ছড়াতে তৎপর হয়—ফসল ও বংশধারা ধ্বংস করতে থাকে। আর আল্লাহ দুর্নীতি ভালোবাসেন না।”
সূরা আল-বাকারার এই আয়াতটি মানুষের একটি বিপজ্জনক চরিত্রচিত্র তুলে ধরে—যে ব্যক্তি কথায় আকর্ষণীয়, মুখে শান্তি ও কল্যাণের কথা বলে, কিন্তু ক্ষমতা বা সুযোগ হাতে পেলেই বাস্তবে ঠিক তার উল্টো কাজ করে। এই আয়াতটি কেবল কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির কথা নয়; বরং এটি একটি মানসিকতা ও প্রবণতার বিবরণ।
এই আয়াতটি আগের আয়াতের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে যুক্ত, যেখানে এমন এক ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে, যার বক্তব্য মানুষকে মুগ্ধ করে এবং যে আল্লাহকে সাক্ষী রেখে নিজের সদিচ্ছার দাবি করে। কিন্তু এখানেই কুরআন বাস্তবতা উন্মোচন করে—তার কথার আড়ালে লুকিয়ে থাকে ধ্বংসাত্মক উদ্দেশ্য।
এই আয়াতের গুরুত্ব এখানেই—এটি আমাদের শেখায়, মানুষের মূল্যায়ন মুখের কথা দিয়ে নয়, বরং ক্ষমতা পাওয়ার পর তার কার্যকলাপ দিয়ে করতে হয়। আল্লাহ এখানে স্পষ্ট করে দিচ্ছেন—যে আচরণ সমাজ, প্রকৃতি ও ভবিষ্যৎ প্রজন্ম ধ্বংস করে, তা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।
এই আয়াতের মূল বক্তব্য খুব পরিষ্কার।
একজন ব্যক্তি আছে, যে যখন মানুষের সামনে থাকে, তখন নিজেকে ভালো ও কল্যাণকামী হিসেবে উপস্থাপন করে। কিন্তু যখন সে সরে যায়—অর্থাৎ, ক্ষমতা পায়, প্রভাব বিস্তার করতে পারে বা নজরের বাইরে যায়—তখন সে পৃথিবীতে বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি করতে শুরু করে।
এই বিশৃঙ্খলার দুটি বড় রূপ এখানে উল্লেখ করা হয়েছে—
১) ফসল ধ্বংস করা
২) বংশধারা ধ্বংস করা
অর্থাৎ, সে কেবল বর্তমান সমাজকেই ক্ষতিগ্রস্ত করে না; বরং মানুষের জীবিকা ও ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও বিপন্ন করে তোলে। আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ স্পষ্ট ঘোষণা দিয়েছেন—তিনি এই ধরনের দুর্নীতি মোটেই ভালোবাসেন না।
এই আয়াতটি সূরা আল-বাকারার এমন এক অংশে এসেছে, যেখানে কুরআন সমাজের ভেতরের লুকানো বিপদ সম্পর্কে মানুষকে সতর্ক করছে। এর আগের আয়াতে এমন এক ব্যক্তির কথা বলা হয়েছে, যে নিজের কথাবার্তায় মানুষকে বিশ্বাস করিয়ে ফেলে।
সিয়াক ও সিবাক অনুযায়ী বোঝা যায়—এই আয়াতটি সেই ব্যক্তির আসল চেহারা উন্মোচন করছে। সে যতক্ষণ মানুষের সামনে থাকে, ততক্ষণ ধার্মিকতার মুখোশ পরে থাকে। কিন্তু যখন সে স্বাধীনভাবে কাজ করার সুযোগ পায়, তখন তার ভেতরের লালসা ও ক্ষমতালোভ প্রকাশ পায়।
এই ধারাবাহিকতা আমাদের শেখায়—কুরআন শুধু ব্যক্তিগত ইবাদতের কথা বলে না; বরং সমাজে ক্ষতিকর চরিত্রগুলো চিহ্নিত করেও সতর্ক করে।
কুরআনের বিভিন্ন আয়াতে আল্লাহ জানিয়েছেন—তিনি পৃথিবীতে ভারসাম্য সৃষ্টি করেছেন এবং মানুষকে দায়িত্বশীল খলিফা হিসেবে নিযুক্ত করেছেন। আবার অন্য আয়াতে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে—আল্লাহ ফাসাদকারীদের পছন্দ করেন না।
আরও আয়াতে এসেছে—যখন মানুষ ক্ষমতা পায়, তখন সে সীমালঙ্ঘন করে বসে। এই আয়াতের সঙ্গে সেগুলো মিলিয়ে দেখলে বোঝা যায়—ক্ষমতা নিজে সমস্যা নয়; সমস্যা হলো ক্ষমতার সঙ্গে তাকওয়ার অনুপস্থিতি।
এই আয়াত তাই ক্ষমতার অপব্যবহার সম্পর্কে একটি মৌলিক সতর্কতা।
এই আয়াত আমাদের কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ শিক্ষা দেয়—
আল্লাহ এখানে মানুষকে শেখাচ্ছেন—নৈতিকতা ও উন্নয়নের নামে কোনো ধ্বংস গ্রহণযোগ্য নয়।
ভুল বোঝাবুঝি: এটি কেবল অতীতের কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তিকে নির্দেশ করে।
সংশোধন: কুরআন চরিত্র ও প্রবণতা বর্ণনা করে, যেন সব যুগের মানুষ শিক্ষা নিতে পারে।
ভুল বোঝাবুঝি: ফসল ও বংশধারা ধ্বংস মানে শুধু যুদ্ধ বা আগুন।
সংশোধন: এটি সব ধরনের অর্থনৈতিক, পরিবেশগত ও নৈতিক ধ্বংসের অন্তর্ভুক্ত।
ব্যক্তিগতভাবে:
সামাজিকভাবে:
সূরা আল-বাকারার এই আয়াতটি মানুষের সামনে এক কঠিন কিন্তু প্রয়োজনীয় আয়না ধরে। আল্লাহ দেখিয়ে দিয়েছেন—মুখের মধুর কথা নয়, বরং মানুষের কাজই তার প্রকৃত পরিচয়।
যে ব্যক্তি ক্ষমতা পেয়ে ফসল ও বংশধারা ধ্বংস করে, সে কেবল সমাজের শত্রু নয়; বরং সে আল্লাহর অপছন্দের পাত্র। কারণ আল্লাহ জীবন, ভারসাম্য ও ভবিষ্যৎ রক্ষার পক্ষেই আছেন—ধ্বংসের পক্ষে নন।
এই আয়াত আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—যে কাজ আল্লাহ ভালোবাসেন না, তা কখনোই ন্যায়ের নাম হতে পারে না।
