তাফসীর by, Friends of Quran Foundation
لِلَّذِينَ يُؤْلُونَ مِن نِّسَائِهِمْ تَرَبُّصُ أَرْبَعَةِ أَشْهُرٍ ۖ فَإِن فَاءُوا فَإِنَّ اللَّهَ غَفُورٌ رَّحِيمٌ
“যারা তাদের স্ত্রীদের থেকে দূরে থাকার শপথ করে—তাদের জন্য চার মাস অপেক্ষার সময় আছে। এরপর যদি তারা ফিরে আসে, তবে নিশ্চয়ই আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।”
সূরা আল-বাকারার ২২৪, ২২৫ ও ২২৬ নম্বর আয়াত একসাথে পারিবারিক জীবনে শপথ, আবেগ, দায়িত্ব এবং আল্লাহর প্রতি জবাবদিহিতার একটি গভীর নৈতিক কাঠামো গড়ে তোলে। এই তিনটি আয়াত মূলত মানুষের মুখের কথাকে—বিশেষত শপথকে—নিয়ন্ত্রণ করার জন্য নাজিল হয়েছে, যেন আবেগের বশে বলা কথা পরিবার ধ্বংসের অস্ত্র হয়ে না ওঠে।
আরব সমাজে স্ত্রীদের সঙ্গে সম্পর্কচ্ছেদ বা দূরে থাকার শপথ (ইলা) ছিল এক ধরনের মানসিক নির্যাতনের হাতিয়ার। স্বামী স্ত্রীকে তালাকও দিত না, আবার দাম্পত্য জীবনও চালাত না—স্ত্রীকে ঝুলিয়ে রাখা হতো অনির্দিষ্ট সময়ের জন্য। এই প্রথা নারীকে সামাজিক ও মানসিকভাবে বন্দি করে রাখত। আল্লাহ এই আয়াতগুলোর মাধ্যমে সেই অন্যায় প্রথাকে শুদ্ধ ও মানবিক সীমার ভেতরে নিয়ে আসেন।
২২৪ ও ২২৫ নম্বর আয়াতে আল্লাহ শপথকে খেলনার মতো ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন এবং জানিয়ে দিয়েছেন—আল্লাহ মানুষের মুখের অসতর্ক কথার জন্য নয়, বরং অন্তরের নিয়তের জন্য জবাবদিহি করেন। ঠিক এই ধারাবাহিকতার মধ্যেই ২২৬ নম্বর আয়াতে এসে আল্লাহ দাম্পত্য শপথের একটি বাস্তব ও ন্যায়ভিত্তিক সীমা নির্ধারণ করে দেন।
উুএই আয়াত তাই কেবল দাম্পত্য আইনের আয়াত নয়; এটি করুণা, সংশোধন ও দায়িত্বশীলতার আয়াত।
এই আয়াতে আল্লাহ বলছেন—যেসব পুরুষ আবেগ, রাগ বা অহংকারের বশে তাদের স্ত্রীদের থেকে দূরে থাকার শপথ করে, তাদের জন্য এই অবস্থা অনির্দিষ্টকাল চলতে দেওয়া হবে না। তাদের সর্বোচ্চ চার মাস সময় দেওয়া হবে।
এই সময়ের ভেতরে তারা যদি ফিরে আসে—অর্থাৎ শপথ ভেঙে স্বাভাবিক দাম্পত্য সম্পর্কে ফিরে যায়—তবে আল্লাহ তাদের ক্ষমা করেন এবং দয়ার সঙ্গে গ্রহণ করেন। কারণ এখানে উদ্দেশ্য শাস্তি দেওয়া নয়; উদ্দেশ্য পরিবারকে ভেঙে যাওয়ার আগেই ফিরিয়ে আনা।
এই আয়াত বোঝায়—শপথ পরিবার ধ্বংসের লাইসেন্স নয়। শপথ যদি সংশোধনের পথে না যায়, তবে তাকে সীমাবদ্ধ করতে হবে।
২২৪ নম্বর আয়াতে আল্লাহ বলেন—তোমরা আল্লাহর নামকে তোমাদের শপথের অজুহাত বানিও না, যাতে ভালো কাজ, তাকওয়া ও মানুষের মধ্যে শান্তি প্রতিষ্ঠা থেকে বিরত থাকতে পারো।
২২৫ নম্বর আয়াতে বলা হয়—অনিচ্ছাকৃত শপথে আল্লাহ পাকড়াও করেন না; কিন্তু অন্তরের নিয়তপূর্ণ শপথের জন্য জবাবদিহি আছে।
এই দুই আয়াত শপথের নৈতিক ভিত্তি স্থাপন করার পর ২২৬ নম্বর আয়াত সেই নীতিকে বাস্তব জীবনের সবচেয়ে সংবেদনশীল ক্ষেত্রে প্রয়োগ করে—দাম্পত্য জীবনে।
এখানে আল্লাহ দেখিয়ে দেন—
এই ধারাবাহিকতা স্পষ্ট করে দেয়—ইসলাম পরিবারকে ঝুলিয়ে রাখার পক্ষে নয়; ইসলাম হয় সম্পর্ক টিকিয়ে রাখে, নয়তো স্পষ্ট ও ন্যায়সঙ্গত সমাধানের পথে নিয়ে যায়।
এই আয়াতের ভাষা সংক্ষিপ্ত হলেও অর্থে গভীর।
“ইউ’লূন”—শপথ করে দূরে থাকা—এটি কেবল শারীরিক দূরত্ব নয়; বরং দাম্পত্য দায়িত্ব থেকে সরে যাওয়ার ঘোষণা।
“তারাব্বুস”—অপেক্ষা—এটি স্ত্রীকে অনির্দিষ্টভাবে ঝুলিয়ে রাখার অবসান ঘটায়।
“আরবা‘আতু আশহুর”—চার মাস—এটি একটি বাস্তব ও মানবিক সময়সীমা, যেখানে আবেগ ঠান্ডা হয় এবং সিদ্ধান্ত পরিণত হয়।
“ফা-ইন ফা’উ”—যদি তারা ফিরে আসে—এখানে ‘ফিরে আসা’ মানে শুধু শারীরিক নয়; বরং দায়িত্বে ফিরে আসা।
“গফূর রাহীম”—ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু—এই গুণবাচক শব্দদ্বয় প্রমাণ করে, আল্লাহ এখানে সংশোধনের দরজা খোলা রেখেছেন।
এই আয়াতের বক্তব্য কুরআনের অন্যান্য আয়াতে সুস্পষ্টভাবে সমর্থিত।
শপথকে যেন অন্যায়ের হাতিয়ার বানানো না হয়—এই নীতি আগেই ঘোষণা করা হয়েছে।
সূরা আল-বাকারাহ (2) : আয়াত 224
وَلَا تَجْعَلُوا اللَّهَ عُرْضَةً لِّأَيْمَانِكُمْ أَن تَبَرُّوا وَتَتَّقُوا وَتُصْلِحُوا بَيْنَ النَّاسِ
“তোমরা আল্লাহর নামকে তোমাদের শপথের অজুহাত বানিও না—যাতে তোমরা ভালো কাজ, তাকওয়া ও মানুষের মধ্যে সংশোধন থেকে বিরত থাকো।”
এটি ২২৬ নম্বর আয়াতের নৈতিক ভিত্তি।
আবার শপথের জবাবদিহি সম্পর্কে বলা হয়েছে—
সূরা আল-বাকারাহ (2) : আয়াত 225
وَلَٰكِن يُؤَاخِذُكُم بِمَا كَسَبَتْ قُلُوبُكُمْ
“কিন্তু তোমাদের অন্তর যা উপার্জন করে, তার জন্য তিনি তোমাদের পাকড়াও করবেন।”
এটি বোঝায়—স্ত্রীকে কষ্ট দেওয়ার নিয়ত নিয়ে করা শপথ আল্লাহর কাছে গুরুত্বহীন নয়।
দাম্পত্য সম্পর্ককে কুরআন শান্তির স্থান হিসেবে তুলে ধরেছে—
সূরা আর-রূম (30) : আয়াত 21
لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا
“যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও।”
এই আয়াতের আলোকে বোঝা যায়—ইচ্ছাকৃত দূরত্ব দাম্পত্যের মূল উদ্দেশ্যের বিরোধী।
আর আল্লাহ সংশোধনের পথকে অগ্রাধিকার দেন—
সূরা আন-নিসা (4) : আয়াত 128
وَالصُّلْحُ خَيْرٌ
“মীমাংসাই উত্তম।”
২২৬ নম্বর আয়াতের চার মাস সময় মূলত এই মীমাংসার সুযোগই।
এই আয়াত আমাদের শেখায়—
দাম্পত্য সম্পর্ক আবেগের খেলনা নয়।
শপথ করে স্ত্রীকে ঝুলিয়ে রাখা জুলুম।
আল্লাহ পরিবার টিকিয়ে রাখতে চান, ধ্বংস করতে নয়।
সংশোধনের পথে ফিরে এলে আল্লাহ ক্ষমা ও দয়া দিয়ে গ্রহণ করেন।
এটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ বার্তা—না অযৌক্তিক কঠোরতা, না অনির্দিষ্ট ছাড়।
এই আয়াতকে কখনো কখনো পুরুষকেন্দ্রিক ক্ষমতার আয়াত হিসেবে দেখা হয়। বাস্তবে এটি পুরুষের ক্ষমতাকে সীমাবদ্ধ করেছে এবং নারীর অধিকার রক্ষা করেছে।
আরেকটি ভুল ধারণা হলো—শপথ মানেই চূড়ান্ত বিচ্ছেদ। অথচ এই আয়াত স্পষ্ট করে—শপথ সংশোধনের পথে ফিরলে তা ভাঙাই উত্তম।
ব্যক্তিগতভাবে এই আয়াত শেখায়—রাগের মাথায় বলা কথা জীবনব্যাপী ক্ষতির কারণ হতে পারে।
সামাজিকভাবে এটি পরিবারকে মানসিক নির্যাতন থেকে রক্ষা করার একটি নৈতিক আইন।
এটি মনে করিয়ে দেয়—ইসলাম সম্পর্ককে শাস্তির নয়, দায়িত্বের কাঠামোয় দেখে।
আমি কি শপথকে চাপ প্রয়োগের হাতিয়ার বানাচ্ছি?
আমি কি সংশোধনের দরজা খোলা রাখি?
আমার সিদ্ধান্ত কি আল্লাহর দয়ার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ?
সূরা আল-বাকারার ২২৪–২২৬ নম্বর আয়াত একসাথে একটি গভীর সত্য প্রতিষ্ঠা করে—আল্লাহ মানুষের কথাকে নয়, তার দায়িত্ববোধকে মূল্য দেন। তিনি শপথের নামে অন্যায় চলতে দেন না, আবার সংশোধনের পথ বন্ধও করেন না।
২২৬ নম্বর আয়াত আমাদের শেখায়—দাম্পত্য সম্পর্ক ভাঙার আগে থামার একটি সুযোগ থাকা চাই। সেই সুযোগের নাম চার মাসের অপেক্ষা। আর যদি সেই সময়ে মানুষ ফিরে আসে, তবে আল্লাহ ক্ষমাশীল ও পরম দয়ালু।
এই আয়াত তাই পরিবারকে ভাঙার নয়, ফিরে আসার আয়াত।
