লেখক: মাহাতাব আকন্দ
প্রকাশনা: Friends of Quran Foundation
ثُمَّ أَوْرَثْنَا الْكِتَابَ الَّذِينَ اصْطَفَيْنَا مِنْ عِبَادِنَا ۖ فَمِنْهُمْ ظَالِمٌ لِّنَفْسِهِ وَمِنْهُمْ مُقْتَصِدٌ وَمِنْهُمْ سَابِقٌ بِالْخَيْرَاتِ بِإِذْنِ اللَّهِ ۚ ذَٰلِكَ هُوَ الْفَضْلُ الْكَبِيرُ
তারপর আমরা কিতাবের উত্তরাধিকারী বানিয়েছি আমাদের বান্দাদের মধ্যে যাদেরকে আমরা নির্বাচিত করেছি। অতঃপর তাদের মধ্যে কেউ নিজের উপর জুলুমকারী, কেউ মধ্যপন্থী, আর কেউ আল্লাহর অনুমতিতে সৎকর্মে অগ্রগামী। এটাই মহা অনুগ্রহ।
এই আয়াত কুরআনের একটি অত্যন্ত গভীর আয়াত। এখানে “কিতাবের উত্তরাধিকার” এবং “নির্বাচিত বান্দা” — এই দুটি ধারণা একত্রে এসেছে। তারপর সেই নির্বাচিতদের মধ্যেই তিন শ্রেণির মানুষ বর্ণনা করা হয়েছে। অর্থাৎ কুরআনের উত্তরাধিকারী হওয়া মানেই সবাই সমান স্তরে নয়।
“আওরাছনা” মানে উত্তরাধিকার দেওয়া।
অর্থাৎ আল্লাহ কিতাবকে (কুরআনকে) এক প্রজন্ম থেকে অন্য প্রজন্মে আমানত হিসেবে দিয়েছেন।
এটি কেবল পাঠের দায়িত্ব নয়;
এটি বোঝা, মানা, বাস্তবায়ন করার দায়িত্ব।
সূরা বাকারায় (২:১২১) বলা হয়েছে—
যারা কিতাবকে যথাযথভাবে তিলাওয়াত করে, তারাই প্রকৃত ঈমানদার।
অতএব “কিতাবের উত্তরাধিকারী” মানে—কুরআনের বাহক উম্মাহ।
“ইস্তাফাইনা” মানে বাছাই করা, নির্বাচন করা।
এখানে একটি বড় মর্যাদা দেওয়া হয়েছে—এই উম্মাহ নির্বাচিত।
সূরা হাজ্জ (২২:৭৮)-এ বলা হয়েছে—
“তিনি তোমাদেরকে নির্বাচন করেছেন।”
কিন্তু নির্বাচন মানে দায়িত্ব।
নির্বাচিত হওয়া মানে পরীক্ষা।
এখানে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অংশ—
এরা কুরআনের উত্তরাধিকারী হলেও নিজেদের উপর জুলুম করে।
জুলুম এখানে মানে—
তারা কিতাবের উম্মাহ, কিন্তু পূর্ণ অনুসারী নয়।
“মুকতাসিদ” মানে সংযত, ভারসাম্যপূর্ণ।
এরা ফরজ পালন করে, হারাম বর্জন করে।
কিন্তু অতিরিক্ত অগ্রসর নয়।
এরা নিরাপদ অবস্থানে থাকে।
“সাবিক” মানে এগিয়ে যাওয়া।
এরা শুধু ফরজ নয়, নফল, সেবা, দাওয়াহ, ত্যাগ—সবকিছুতে অগ্রগামী।
কিন্তু লক্ষ্য করুন—
“بإذن الله” — আল্লাহর অনুমতিতে।
অর্থাৎ অগ্রগামিতা অহংকার নয়; তাওফীক।
আল্লাহ বলেন—এটাই বড় অনুগ্রহ।
অর্থাৎ কুরআনের উত্তরাধিকারী হওয়াই বিশাল ফজিলত।
যদিও তিন স্তর আছে, তবুও তারা নির্বাচিত উম্মাহ।
এটি আশাবাদও দেয়—
নিজের উপর জুলুমকারীও উম্মাহর অংশ।
কিন্তু লক্ষ্য হবে—সাবিক হওয়া।
এই আয়াতের গভীর দিক হলো—
জুলুমকারীকে প্রথমে উল্লেখ করা হয়েছে।
এতে বোঝা যায়—
উম্মাহর বড় অংশ দুর্বল হতে পারে।
তবুও তারা কিতাবের উত্তরাধিকারী।
কিন্তু লক্ষ্য—অগ্রগামী হওয়া।
আমরা নিজেদেরকে কোন স্তরে দেখি?
এই আয়াত আত্মমূল্যায়নের আয়াত।
এখানে দুটি চরমপন্থা ভেঙে দেওয়া হয়েছে—
১. সবাই সমান নয়।
২. আবার কেউ কিতাব থেকে সম্পূর্ণ বিচ্ছিন্নও নয় (যদি ঈমান থাকে)।
এটি আশা ও সতর্কতার সমন্বয়।
এই আয়াত আমাদের পরিচয় নির্ধারণ করে—
আমরা কুরআনের উত্তরাধিকারী।
কিন্তু উত্তরাধিকার মানে দায়িত্ব।
তিন স্তরের মধ্যে আমাদের অবস্থান নির্ধারণ করতে হবে।
লক্ষ্য হবে—
নিজের উপর জুলুমকারী থেকে মুকতাসিদ,
আর মুকতাসিদ থেকে সাবিক হওয়া।
✔ কুরআনের দায়িত্ব উপলব্ধি
✔ আত্মমূল্যায়ন করা
✔ ফরজে দৃঢ় থাকা
✔ সৎকর্মে অগ্রগামী হওয়ার চেষ্টা
✔ অহংকার নয়, আল্লাহর তাওফীকের উপর নির্ভর
আল্লাহ আমাদেরকে কুরআনের প্রকৃত উত্তরাধিকারী বানান—যারা কেবল নামমাত্র নয়, বরং সৎকর্মে অগ্রগামী। নিশ্চয় সেটাই মহা অনুগ্রহ।
