ইসলামের মৌলিক বিশ্বাসের একটি গুরুত্বপূর্ণ স্তম্ভ হলো কেয়ামত বা শেষ বিচার দিবস। কেয়ামত কখন সংঘটিত হবে—এই প্রশ্ন মানব ইতিহাস জুড়ে মানুষের কৌতূহল ও ভয়ের কেন্দ্রবিন্দু। কুরআন এই বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট নীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে: কেয়ামতের সময় আল্লাহ ব্যতীত কেউ জানে না। অথচ কিছু হাদিসে এমন বক্তব্য পাওয়া যায়, যা সরলভাবে গ্রহণ করলে কুরআনের এই মৌলিক নীতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে। তেমনই একটি হাদিস হলো—এক বালকের জীবদ্দশাতেই কেয়ামত সংঘটিত হবে—এই বক্তব্যসংবলিত বর্ণনা।
এই প্রবন্ধে উক্ত হাদিসটি পেশ করা হবে, তারপর কুরআনের আলোকে এর পর্যালোচনা করা হবে এবং শেষ পর্যন্ত কুরআনকে সত্য–মিথ্যার মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে।
সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে—
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ: أَتَى رَسُولَ اللَّهِ ﷺ غُلَامٌ مِنْ أَهْلِ الْمَدِينَةِ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ: إِنْ يَعِشْ هَذَا فَلَا يُدْرِكْهُ الْهَرَمُ حَتَّى تَقُومَ السَّاعَةُ
বাংলা অনুবাদ:
আনাস ইবন মালিক (রা.) বলেন—মদীনার এক বালক রাসূলুল্লাহ (সা.)-এর পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। তখন রাসূলুল্লাহ (সা.) বললেন: “এই বালক যদি বেঁচে থাকে, তবে বার্ধক্যে পৌঁছানোর আগেই কেয়ামত সংঘটিত হবে।”
তথ্যসূত্র:
সহিহ মুসলিম, হাদিস ৭০৫৩
এছাড়াও একই বক্তব্য এসেছে—সহিহ মুসলিম ৭০৫১ ও ৭০৫২
এই হাদিসের সরল ও প্রকাশ্য অর্থ দাঁড়ায়—উক্ত বালক জীবিত থাকাকালেই কেয়ামত সংঘটিত হওয়ার কথা ছিল। কিন্তু ইতিহাস সাক্ষ্য দেয়, সেই বালক বহু আগেই মৃত্যুবরণ করেছে, শত শত বছর পেরিয়ে গেছে, অথচ কেয়ামত এখনও সংঘটিত হয়নি।
এখানেই প্রশ্ন জাগে—
যদি এই বক্তব্য হুবহু সত্য হয়, তবে কেয়ামত তো বহু আগেই হয়ে যাওয়ার কথা।
আর যদি তা সত্য না হয়, তবে এই বর্ণনার অবস্থান কী?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের ফিরে যেতে হবে কুরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণার দিকে।
কুরআন একাধিক আয়াতে অত্যন্ত পরিষ্কার ভাষায় ঘোষণা করেছে—কেয়ামতের সময় আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।
আল্লাহ বলেন—
يَسْأَلُونَكَ عَنِ السَّاعَةِ أَيَّانَ مُرْسَاهَا ۖ قُلْ إِنَّمَا عِلْمُهَا عِنْدَ رَبِّي لَا يُجَلِّيهَا لِوَقْتِهَا إِلَّا هُوَ
বাংলা অর্থ:
“তারা তোমাকে কেয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে—কখন তা সংঘটিত হবে। বলে দাও, এর জ্ঞান শুধু আমার প্রতিপালকের কাছেই রয়েছে। নির্ধারিত সময়ে তিনি ছাড়া কেউ একে প্রকাশ করতে পারে না।”
(সূরা আল-আরাফ ৭:১৮৭)
আরেক আয়াতে আল্লাহ বলেন—
إِنَّ اللَّهَ عِنْدَهُ عِلْمُ السَّاعَةِ
বাংলা অর্থ:
“নিশ্চয়ই কেয়ামতের জ্ঞান একমাত্র আল্লাহর কাছেই রয়েছে।”
(সূরা লুকমান ৩১:৩৪)
এখানে কুরআন কোনো ব্যতিক্রম রাখেনি—না নবী, না ফেরেশতা, না কোনো মানুষ—কেউ কেয়ামতের সময় জানে না।
কুরআন আরও স্পষ্ট করে দেয় যে রাসূল নিজেও গায়েবের জ্ঞান রাখতেন না।
আল্লাহ বলেন—
قُلْ لَا أَقُولُ لَكُمْ عِنْدِي خَزَائِنُ اللَّهِ وَلَا أَعْلَمُ الْغَيْبَ
বাংলা অর্থ:
“বলে দাও, আমি তোমাদের বলি না যে আমার কাছে আল্লাহর ভাণ্ডার আছে, আর আমি গায়েবও জানি না।”
(সূরা আল-আনআম ৬:৫০)
যখন কুরআন নিজেই ঘোষণা করছে যে নবী (সা.) গায়েব জানতেন না, তখন কোনো নির্দিষ্ট ব্যক্তির জীবদ্দশার সঙ্গে কেয়ামতকে যুক্ত করা বক্তব্য কুরআনের মৌলিক আকীদার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়ে পড়ে।
এই হাদিসটি যদি আক্ষরিক অর্থে গ্রহণ করা হয়, তবে তা তিনটি কুরআনিক সত্যকে অস্বীকার করে—
প্রথমত, কেয়ামতের সময় আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না।
দ্বিতীয়ত, নবী (সা.) নিজেও গায়েব জানতেন না।
তৃতীয়ত, কেয়ামতের সময় সম্পর্কে কোনো নির্দিষ্ট সময়সীমা বা ব্যক্তির জীবনকাল কুরআন কখনো নির্ধারণ করেনি।
অতএব, এই হাদিসটি কুরআনের স্পষ্ট ঘোষণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
যখন কোনো বর্ণনা কুরআনের সুস্পষ্ট, দ্ব্যর্থহীন আয়াতের বিরোধী হয়, তখন কুরআনের নির্দেশ অনুযায়ী সেটিকে গ্রহণ করা যায় না।
কুরআন নিজেই মানদণ্ড নির্ধারণ করে দিয়েছে—
فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْءٍ فَرُدُّوهُ إِلَى اللَّهِ وَالرَّسُولِ
বাংলা অর্থ:
“তোমরা কোনো বিষয়ে মতভেদে পড়লে তা আল্লাহ ও রাসূলের দিকে ফিরিয়ে দাও।”
(সূরা আন-নিসা ৪:৫৯)
এখানে “আল্লাহর দিকে ফিরিয়ে দেওয়া” মানে কুরআনের দিকে ফিরিয়ে দেওয়া। কারণ আল্লাহর কথা সংরক্ষিত আছে কেবল কুরআনে।
এক বালক বৃদ্ধ হবার আগেই কেয়ামত সংঘটিত হবে—এই বক্তব্য বাস্তবে সংঘটিত হয়নি এবং কুরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণার সঙ্গেও সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অতএব, এমন বর্ণনাকে আকীদার ভিত্তি বানানো যায় না।
কুরআন আমাদের শিখিয়েছে—অন্ধ অনুসরণ নয়, বরং যাচাই; কল্পনা নয়, বরং সত্য।
কুরআনই সত্য–মিথ্যার চূড়ান্ত মানদণ্ড।
কুরআনের সাথে মিললে গ্রহণ,
কুরআনের বিরোধী হলে—যতই সহিহ বলা হোক—বর্জন।
লেখক: মাহাতাব আকন্দ
