• বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:০৮ পূর্বাহ্ন

পশুর সাথে যৌনকর্মের কোনো শাস্তি নেই?

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ২২৯ Time View
Update : সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬


পশুর সাথে যৌনকর্মের কোনো শাস্তি নেই? — আবু দাউদের হাদিস বনাম কুরআনের নৈতিকতা

ভূমিকা

মানুষের নৈতিকতা, যৌনশুদ্ধতা ও সভ্যতার ভিত্তি সম্পর্কে কুরআনের অবস্থান অত্যন্ত স্পষ্ট। কুরআন মানুষকে “আহসানুত তাক্বওয়ীম”—সর্বোত্তম কাঠামোতে সৃষ্ট বলে ঘোষণা করে এবং তাকে পশুত্বের স্তরে নামতে কঠোরভাবে নিষেধ করে। অথচ কিছু হাদিস গ্রন্থে এমন বর্ণনা পাওয়া যায়, যা মানুষের বিবেক, নৈতিকতা ও কুরআনের ঘোষিত মানব-মর্যাদার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

পশুর সাথে যৌনকর্মের মতো জঘন্য ও বিকৃত আচরণ সম্পর্কে ইসলামের অবস্থান কী—এই প্রশ্নে একটি হাদিসে বলা হয়েছে, এর জন্য কোনো নির্দিষ্ট শাস্তি নেই। এই বক্তব্য কুরআনের নৈতিক কাঠামোর সঙ্গে আদৌ সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—সেটিই এই প্রবন্ধের আলোচ্য বিষয়।


হাদিসের আরবি পাঠ ও বাংলা অনুবাদ

সুনানে আবু দাউদে বর্ণিত হয়েছে—

عَنْ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ: مَنْ أَتَى بَهِيمَةً فَلَا حَدَّ عَلَيْهِ

বাংলা অনুবাদ:
ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত—
“যে ব্যক্তি কোনো পশুর সাথে যৌনকর্ম করে, তার উপর কোনো নির্দিষ্ট শাস্তি (হদ) নেই।”

তথ্যসূত্র:
সুনানে আবু দাউদ, হাদিস ৪৪৫০


হাদিসটির সরল অর্থ ও নৈতিক সংকট

এই হাদিসের সরল অর্থ দাঁড়ায়—
পশুর সাথে যৌনকর্মের মতো চরম বিকৃত, অমানবিক ও সভ্যতাবিরোধী অপরাধের জন্য ইসলামে কোনো নির্দিষ্ট শাস্তি নেই।

এই বক্তব্য শুধু বিবেকবিরোধী নয়, বরং কুরআনের পুরো নৈতিক দর্শনের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক। কারণ কুরআন মানুষের যৌনজীবনকে কঠোরভাবে নৈতিক সীমার মধ্যে আবদ্ধ করেছে এবং পশুত্বের পথে যাওয়াকে স্পষ্টভাবে নিন্দা করেছে।


কুরআনের দৃষ্টিতে মানুষের মর্যাদা ও নৈতিক সীমা

কুরআন ঘোষণা করে—

وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ

বাংলা অর্থ:
“নিশ্চয়ই আমি আদম সন্তানদের মর্যাদা দিয়েছি।”
(সূরা আল-ইসরা ১৭:৭০)

এই মর্যাদা মানে শুধু সম্মান নয়; বরং নৈতিক দায়িত্ব, আত্মসংযম ও পশুত্ব থেকে পৃথক অবস্থান।

যৌন বিকৃত আচরণ সম্পর্কে কুরআন আরও স্পষ্ট করে বলে—

إِنْ هُمْ إِلَّا كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ

বাংলা অর্থ:
“তারা তো পশুর মতো; বরং পশুর চেয়েও অধিক পথভ্রষ্ট।”
(সূরা আল-আরাফ ৭:১৭৯)

যে আচরণ মানুষকে পশুর স্তরে নামিয়ে দেয়—বরং পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট করে তোলে—তা কুরআনের দৃষ্টিতে চরম গোমরাহি ও নৈতিক অধঃপতন।


যৌন সীমালঙ্ঘন সম্পর্কে কুরআনের অবস্থান

কুরআন যৌন সম্পর্কের বৈধ পরিসর নির্ধারণ করে দিয়েছে—

وَالَّذِينَ هُمْ لِفُرُوجِهِمْ حَافِظُونَ ۝ إِلَّا عَلَىٰ أَزْوَاجِهِمْ أَوْ مَا مَلَكَتْ أَيْمَانُهُمْ فَإِنَّهُمْ غَيْرُ مَلُومِينَ ۝ فَمَنِ ابْتَغَىٰ وَرَاءَ ذَٰلِكَ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الْعَادُونَ

বাংলা অর্থ:
“আর তারা নিজেদের লজ্জাস্থান সংরক্ষণ করে—তাদের স্ত্রী বা অধিকারভুক্তদের ছাড়া; এতে তারা নিন্দিত নয়। কিন্তু এর বাইরে যারা কিছু কামনা করে, তারাই সীমালঙ্ঘনকারী।”
(সূরা আল-মুমিনূন ২৩:৫–৭)

এই আয়াতের আলোকে স্পষ্ট—
যৌন সম্পর্কের বৈধতা কেবল মানুষের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। এর বাইরে যেকোনো পথ হলো সীমালঙ্ঘন ও অপরাধ।

পশুর সাথে যৌনকর্ম এই সীমালঙ্ঘনের সবচেয়ে চরম রূপ।


“শাস্তি নেই” — এই ধারণা কেন কুরআনবিরোধী

কুরআন অপরাধ ও ফাসাদের বিষয়ে একটি সাধারণ নীতি দিয়েছে—

وَلَا تُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ بَعْدَ إِصْلَاحِهَا

বাংলা অর্থ:
“পৃথিবীতে সংশোধনের পর তোমরা ফাসাদ সৃষ্টি করো না।”
(সূরা আল-আরাফ ৭:৫৬)

পশুর সাথে যৌনকর্ম শুধু ব্যক্তিগত পাপ নয়; এটি সামাজিক, নৈতিক ও মানসিক ফাসাদ। এমন কাজকে শাস্তির বাইরে রাখার ধারণা কুরআনের ন্যায়বিচার ও নৈতিক শুদ্ধতার ধারণার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।


হাদিসনির্ভর ফিকহ বনাম কুরআনিক ন্যায়বোধ

এই হাদিসটি দেখিয়ে দেয়—
হাদিসনির্ভর ফিকহ অনেক সময় এমন সিদ্ধান্তে পৌঁছে, যা কুরআনের নৈতিক কাঠামোকে দুর্বল করে দেয়।

যেখানে কুরআন মানুষকে পশুত্ব থেকে উত্তরণে আহ্বান জানায়,
সেখানে “পশুর সাথে যৌনকর্মের শাস্তি নেই”—এই বক্তব্য মানুষের নৈতিক অবক্ষয়কে বৈধতার কাছাকাছি নিয়ে যায়।

কুরআন আগেই সতর্ক করেছে—

وَمَا اخْتَلَفْتُمْ فِيهِ مِنْ شَيْءٍ فَحُكْمُهُ إِلَى اللَّهِ

বাংলা অর্থ:
“তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ কর, তার ফয়সালা আল্লাহর কাছেই।”
(সূরা আশ-শূরা ৪২:১০)

আল্লাহর ফয়সালা সংরক্ষিত আছে কুরআনে—যেখানে এই ধরনের বিকৃত আচরণের কোনো বৈধতা নেই।


উপসংহার

আবু দাউদের হাদিসে বলা হয়েছে—পশুর সাথে যৌনকর্মের জন্য কোনো শাস্তি নেই। কিন্তু এই বক্তব্য কুরআনের ঘোষিত মানব-মর্যাদা, যৌন নৈতিকতা ও ফাসাদবিরোধী নীতির সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

অতএব, এই বর্ণনাকে কুরআনের আলোকে গ্রহণযোগ্য বলা যায় না।


চূড়ান্ত শ্লোগান

কুরআনই সত্য ও মিথ্যার চূড়ান্ত মানদণ্ড।
কুরআনের সাথে মিললে গ্রহণ,
কুরআনের বিরোধী হলে—সহিহ বলা হলেও—বর্জন।


লেখক: মাহাতাব আকন্দ


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page