• বুধবার, ০৫ অগাস্ট ২০২৬, ০৩:১৭ পূর্বাহ্ন

দাজ্জালের ডান চোখ অন্ধ, না বাম চোখ?

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ২২২ Time View
Update : সোমবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬


দাজ্জালের ডান চোখ অন্ধ, না বাম চোখ? — হাদিসের পারস্পরিক বিরোধ ও কুরআনের মানদণ্ড

ভূমিকা

ইসলামী আকীদার আলোচনায় দাজ্জাল একটি বহুল আলোচিত চরিত্র। দাজ্জাল সম্পর্কিত বিবরণগুলো মূলত হাদিসনির্ভর; কুরআনে দাজ্জালের নাম বা শারীরিক বর্ণনা কোথাও নেই। অথচ এই হাদিসগুলোকে কেন্দ্র করেই বহু ভীতিপ্রদ, কল্পনানির্ভর ও বিভ্রান্তিকর বয়ান সমাজে প্রচলিত। দাজ্জাল বিষয়ে সবচেয়ে পরিচিত দাবি হলো—তার এক চোখ অন্ধ হবে। কিন্তু প্রশ্ন হলো, কোন চোখ? ডান না বাম?

সহিহ মুসলিম ও অন্যান্য হাদিস গ্রন্থে এই প্রশ্নে এমন সব বর্ণনা পাওয়া যায়, যেগুলো পরস্পরের সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। এই প্রবন্ধে সেই হাদিসগুলো উপস্থাপন করা হবে, তারপর কুরআনের আলোকে এই বিরোধের প্রকৃতি বিশ্লেষণ করা হবে এবং শেষে কুরআনকে সত্য-মিথ্যার একমাত্র মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে।


দাজ্জালের ডান চোখ অন্ধ — এই সংক্রান্ত হাদিস

সহিহ মুসলিমে বর্ণিত হয়েছে—

إِنَّهُ أَعْوَرُ الْعَيْنِ الْيُمْنَى كَأَنَّ عَيْنَهُ عِنَبَةٌ طَافِيَةٌ

বাংলা অর্থ:
“নিশ্চয়ই দাজ্জাল ডান চোখে অন্ধ হবে। তার চোখটি হবে ফুলে থাকা আঙুরের মতো।”

তথ্যসূত্র:
সহিহ মুসলিম, হাদিস ০৩২৪
সহিহ মুসলিম, হাদিস ০৩২৫
সহিহ মুসলিম, হাদিস ৭০০৫

এই বর্ণনাগুলোতে স্পষ্টভাবে বলা হচ্ছে—দাজ্জালের ডান চোখ অন্ধ


দাজ্জালের বাম চোখ অন্ধ — এই সংক্রান্ত হাদিস

অন্যদিকে সহিহ মুসলিম ও ইবনে মাজাহতে ভিন্ন বক্তব্য পাওয়া যায়—

أَعْوَرُ الْعَيْنِ الْيُسْرَى عَلَيْهَا ظَفَرَةٌ غَلِيظَةٌ

বাংলা অর্থ:
“দাজ্জাল বাম চোখে অন্ধ হবে, তার চোখের ওপর থাকবে মোটা পর্দার মতো আবরণ।”

তথ্যসূত্র:
সহিহ মুসলিম, হাদিস ৭০১০
ইবনে মাজাহ, হাদিস ৪০৭১

এখানে স্পষ্টভাবে বলা হচ্ছে—দাজ্জালের বাম চোখ অন্ধ


বিরোধের প্রকৃতি

এই দুই ধরনের বর্ণনা একসাথে রাখলে একটি অনিবার্য প্রশ্ন সামনে আসে—
একই ব্যক্তির চোখ কীভাবে একসাথে ডানও অন্ধ, আবার বামও অন্ধ হতে পারে?

এটি ব্যাখ্যার বিষয় নয়, বরং সরাসরি বর্ণনাগত বিরোধ
কারণ—

  • কোনো বর্ণনায় ডান চোখ অন্ধ
  • আবার অন্য বর্ণনায় বাম চোখ অন্ধ

এখানে রূপক বা ভাষাগত ইঙ্গিতের সুযোগ নেই; চোখ একটি নির্দিষ্ট শারীরিক অঙ্গ। ফলে এই হাদিসগুলোকে একই সাথে আক্ষরিকভাবে সত্য ধরা সম্ভব নয়।


কুরআনের দৃষ্টিতে গায়েব ও ভবিষ্যদ্বাণী

কুরআন ভবিষ্যৎ, অদৃশ্য ও গায়েব সম্পর্কিত বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট নীতি নির্ধারণ করে দিয়েছে। আল্লাহ বলেন—

قُلْ لَا أَعْلَمُ الْغَيْبَ

বাংলা অর্থ:
“বলে দাও, আমি গায়েব জানি না।”
(সূরা আল-আনআম ৬:৫০)

আরও বলেন—

عَالِمُ الْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلَىٰ غَيْبِهِ أَحَدًا

বাংলা অর্থ:
“তিনি গায়েবের জ্ঞানী; তিনি তাঁর গায়েব কাউকে প্রকাশ করেন না।”
(সূরা আল-জিন ৭২:২৬)

কুরআনের এই ঘোষণাগুলোর আলোকে দেখা যায়—ভবিষ্যতের কোনো চরিত্রের শারীরিক গঠন, চোখের অবস্থা, আকৃতি ইত্যাদি বিষয়ে নিশ্চিত ও বিশদ বিবরণ দেওয়া কুরআনিক নীতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।


কুরআনে দাজ্জালের অনুপস্থিতি

একটি গুরুত্বপূর্ণ বাস্তবতা হলো—কুরআনে কোথাও “দাজ্জাল” নামটি নেই।
না তার চোখের বর্ণনা,
না তার চেহারা,
না তার আগমনের সময়সূচি।

অথচ কুরআন দাবি করে—

مَا فَرَّطْنَا فِي الْكِتَابِ مِنْ شَيْءٍ

বাংলা অর্থ:
“আমি এই কিতাবে কোনো কিছুই বাদ দিইনি।”
(সূরা আল-আনআম ৬:৩৮)

যদি দাজ্জাল মানবজাতির জন্য এমন চূড়ান্ত ও ভয়াবহ ফিতনা হতো, যার চোখের দিকনির্দেশ পর্যন্ত জানা ঈমানের অংশ—তবে কুরআনে তার ন্যূনতম উল্লেখ থাকা স্বাভাবিক ছিল। কিন্তু বাস্তবে তা নেই।


হাদিসনির্ভর আকীদার ঝুঁকি

এই পরস্পরবিরোধী হাদিসগুলো দেখিয়ে দেয়—হাদিসকে আকীদার চূড়ান্ত উৎস বানালে বিশ্বাস বিভ্রান্তির দিকে যায়। এক হাদিস আরেক হাদিসকে খণ্ডন করছে, অথচ উভয়কেই “সহিহ” বলা হচ্ছে।

কুরআন এই পরিস্থিতির আগেই সতর্ক করে দিয়েছে—

وَمَا اخْتَلَفْتُمْ فِيهِ مِنْ شَيْءٍ فَحُكْمُهُ إِلَى اللَّهِ

বাংলা অর্থ:
“তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ কর, তার ফয়সালা আল্লাহর কাছেই।”
(সূরা আশ-শূরা ৪২:১০)

আল্লাহর ফয়সালা সংরক্ষিত আছে কুরআনে—হাদিস গ্রন্থে নয়।


সঠিক অবস্থান

দাজ্জাল ডান চোখে অন্ধ না বাম চোখে—এই বিতর্কের বাস্তব অর্থ হলো:
এই বর্ণনাগুলো নিশ্চিত জ্ঞানের স্তরে পড়ে না।

কুরআনের সাথে যেগুলো মিলছে না,
কুরআনের মৌলিক নীতির বাইরে যাচ্ছে,
এবং নিজের মধ্যেই পরস্পরবিরোধী—
সেগুলোকে আকীদার ভিত্তি বানানো যায় না।


উপসংহার

দাজ্জালের চোখ সংক্রান্ত হাদিসগুলো পরস্পরের সাথে সাংঘর্ষিক। একটি বলে ডান চোখ অন্ধ, আরেকটি বলে বাম চোখ অন্ধ। কুরআন এ ধরনের শারীরিক ভবিষ্যদ্বাণী সমর্থন করে না এবং নবীকে গায়েব জানার ক্ষমতাও দেয় না।

অতএব, এই বর্ণনাগুলো কুরআনের মানদণ্ডে যাচাই করলে গ্রহণযোগ্য হয় না।


চূড়ান্ত শ্লোগান

কুরআনই সত্য-মিথ্যার চূড়ান্ত মানদণ্ড।
কুরআনের সাথে মিললে গ্রহণ,
কুরআনের বিরোধী হলে—সহিহ বলা হলেও—বর্জন।


লেখক: মাহাতাব আকন্দ


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page