কুরআন মানুষের চিন্তা, বিবেক ও বুদ্ধিকে ঈমানের ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠা করেছে। কুরআনের আহ্বান অন্ধ বিশ্বাস নয়; বরং উপলব্ধি, পর্যবেক্ষণ ও যুক্তির মাধ্যমে সত্যে পৌঁছানো। অথচ কিছু হাদিসে এমন সব অলৌকিক বর্ণনা পাওয়া যায়, যেগুলো সরলভাবে গ্রহণ করলে কুরআনের এই যুক্তিনির্ভর দৃষ্টিভঙ্গি প্রশ্নের মুখে পড়ে। তেমনই একটি বর্ণনা হলো—একটি গরু মানুষের সাথে কথা বলেছে।
এই প্রবন্ধে উক্ত হাদিসটি উপস্থাপন করা হবে, তারপর কুরআনের আলোকে এর পর্যালোচনা করা হবে এবং শেষ পর্যন্ত কুরআনকে সত্য–মিথ্যার মানদণ্ড হিসেবে প্রতিষ্ঠা করা হবে।
সহিহ বুখারীতে বর্ণিত হয়েছে—
حَدَّثَنَا أَبُو الْيَمَانِ، أَخْبَرَنَا شُعَيْبٌ، عَنِ الزُّهْرِيِّ، قَالَ: أَخْبَرَنِي أَبُو سَلَمَةَ بْنُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ، أَنَّ أَبَا هُرَيْرَةَ قَالَ: بَيْنَمَا رَجُلٌ يَسُوقُ بَقَرَةً إِذْ رَكِبَهَا فَقَالَتْ: إِنَّا لَمْ نُخْلَقْ لِهَذَا، إِنَّمَا خُلِقْنَا لِلْحِرَاثَةِ. فَقَالَ النَّاسُ: سُبْحَانَ اللَّهِ! بَقَرَةٌ تَتَكَلَّمُ؟ فَقَالَ النَّبِيُّ ﷺ: فَإِنِّي أُؤْمِنُ بِهَذَا، أَنَا وَأَبُو بَكْرٍ وَعُمَرُ.
বাংলা অনুবাদ:
আবু হুরাইরা (রা.) বলেন—
এক ব্যক্তি একটি গরু হাঁকাচ্ছিল। সে গরুটির পিঠে চড়ল। তখন গরুটি বলল, “আমাদের এ জন্য সৃষ্টি করা হয়নি; আমাদের সৃষ্টি করা হয়েছে চাষাবাদের জন্য।” লোকেরা বলল, “সুবহানাল্লাহ! গরু কথা বলে?” তখন নবী (সা.) বললেন, “আমি এতে ঈমান রাখি—আমি, আবু বকর ও উমর।”
তথ্যসূত্র:
সহিহ বুখারী, ৪র্থ খণ্ড, হাদিস ৬৭৭
এই হাদিসের সরল অর্থ দাঁড়ায়—একটি গরু মানুষের ভাষায় কথা বলেছে এবং মানুষ তা শুনেছে। এটি কোনো রূপক বা স্বপ্নের বর্ণনা নয়; বরং একটি প্রকাশ্য ঘটনার মতো উপস্থাপিত হয়েছে।
এখানেই প্রশ্ন ওঠে—
প্রাণী কি মানুষের ভাষায় কথা বলতে পারে?
এই দাবি কুরআনের প্রকৃতি, সৃষ্টিজগৎ ও যোগাযোগব্যবস্থার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না?
কুরআন মানুষের ভাষাকে একটি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হিসেবে চিহ্নিত করেছে। আল্লাহ বলেন—
الرَّحْمَٰنُ عَلَّمَ الْقُرْآنَ خَلَقَ الْإِنسَانَ عَلَّمَهُ الْبَيَانَ
বাংলা অর্থ:
“দয়াময় আল্লাহ—তিনি কুরআন শিক্ষা দিয়েছেন, মানুষ সৃষ্টি করেছেন এবং তাকে স্পষ্ট ভাষা শিক্ষা দিয়েছেন।”
(সূরা আর-রাহমান ৫৫:১–৪)
এই আয়াত অনুযায়ী “বায়ান”—স্পষ্ট ভাষা ও বক্তব্য—মানুষের একটি স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য। কুরআন কোথাও বলেনি যে গরু, ছাগল বা অন্য পশু মানুষের ভাষায় কথা বলে।
কুরআন পশুদের সম্পর্কে বলে—
وَاللَّهُ خَلَقَ كُلَّ دَابَّةٍ مِنْ مَاءٍ
বাংলা অর্থ:
“আল্লাহ প্রত্যেক প্রাণীকে পানি থেকে সৃষ্টি করেছেন।”
(সূরা আন-নূর ২৪:৪৫)
আরও বলেন—
إِنْ هُمْ إِلَّا كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ
বাংলা অর্থ:
“তারা তো পশুর মতো; বরং তার চেয়েও বেশি পথভ্রষ্ট।”
(সূরা আল-আরাফ ৭:১৭৯)
এখানে কুরআন পশু ও মানুষের মধ্যে স্পষ্ট পার্থক্য টেনে দিয়েছে—মানুষ বুদ্ধি, ভাষা ও দায়িত্বে পৃথক; পশুরা নয়।
কুরআনে কিছু অলৌকিক ঘটনার উল্লেখ আছে—যেমন মূসা (আ.)-এর লাঠি, ঈসা (আ.)-এর চিকিৎসা—কিন্তু সেগুলো সবই স্পষ্ট আয়াতে, নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যে এবং বার্তাবাহী হিসেবে এসেছে। কুরআন কোথাও সাধারণ পশুদের মানুষের ভাষায় কথা বলাকে কোনো আকীদাগত সত্য হিসেবে উপস্থাপন করেনি।
বরং কুরআন সতর্ক করে—
وَلَا تَقْفُ مَا لَيْسَ لَكَ بِهِ عِلْمٌ
বাংলা অর্থ:
“যে বিষয়ে তোমার জ্ঞান নেই, তার অনুসরণ করো না।”
(সূরা আল-ইসরা ১৭:৩৬)
এই হাদিসে বর্ণিত ঘটনা কুরআনের তিনটি মৌলিক নীতির সঙ্গে সাংঘর্ষিক—
প্রথমত, ভাষা মানুষের স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য।
দ্বিতীয়ত, পশুদের মানুষের মতো সচেতন বক্তব্য কুরআন সমর্থন করে না।
তৃতীয়ত, কুরআন অলৌকিক দাবিকে কঠোর প্রমাণ ও স্পষ্ট বার্তার সাথে যুক্ত করে—এ ধরনের বিচ্ছিন্ন বর্ণনায় নয়।
অতএব, এই বর্ণনাকে কুরআনের আলোকে নিশ্চিত সত্য হিসেবে গ্রহণ করা যায় না।
এই ধরনের বর্ণনা দেখিয়ে দেয়—যখন কুরআনের বাইরে গিয়ে বিশ্বাস নির্মাণ করা হয়, তখন ঈমান যুক্তির বদলে কৌতুকে পরিণত হয়। কুরআন মানুষকে ভাবতে শেখায়, আর এই ধরনের গল্প ভাবনার বদলে বিস্ময় উৎপাদন করে।
কুরআন তাই ঘোষণা করে—
وَمَا اخْتَلَفْتُمْ فِيهِ مِنْ شَيْءٍ فَحُكْمُهُ إِلَى اللَّهِ
বাংলা অর্থ:
“তোমরা যে বিষয়ে মতভেদ কর, তার ফয়সালা আল্লাহর কাছেই।”
(সূরা আশ-শূরা ৪২:১০)
আল্লাহর ফয়সালা সংরক্ষিত আছে কুরআনে।
গরু মানুষের সাথে কথা বলেছে—এই বর্ণনা সহিহ বুখারীতে থাকলেও তা কুরআনের যুক্তিনির্ভর বাস্তবতা, ভাষার নীতি ও সৃষ্টিগত কাঠামোর সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অতএব, একে আকীদার অংশ বানানো যায় না।
কুরআনই সত্য–মিথ্যার চূড়ান্ত মানদণ্ড।
কুরআনের সাথে মিললে গ্রহণ,
কুরআনের বিরোধী হলে—সহিহ বলা হলেও—বর্জন।
লেখক: মাহাতাব আকন্দ
