• বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ০৬:৩৬ পূর্বাহ্ন

তাফসীর | সূরা ৫৮ : আয়াত ২

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ২০৬ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

তাফসীর | সূরা আল-মুজাদালাহ : আয়াত ২

লেখক: মাহাতাব আকন্দ
প্রকাশনা: Friends of Quran Foundation


আরবি আয়াত

الَّذِينَ يُظَاهِرُونَ مِنكُم مِّن نِّسَائِهِم مَّا هُنَّ أُمَّهَاتِهِمْ ۖ إِنْ أُمَّهَاتُهُمْ إِلَّا اللَّائِي وَلَدْنَهُمْ ۚ وَإِنَّهُمْ لَيَقُولُونَ مُنكَرًا مِّنَ الْقَوْلِ وَزُورًا ۚ وَإِنَّ اللَّهَ لَعَفُوٌّ غَفُورٌ


বাংলা ভাবার্থ

তোমাদের মধ্যে যারা নিজেদের স্ত্রীদেরকে “যিহার” করে (অর্থাৎ বলে—তুমি আমার মায়ের পিঠের মতো), তারা তাদের মা হয়ে যায় না। তাদের মায়েরা তো কেবল তারা-ই যারা তাদের জন্ম দিয়েছে। নিশ্চয় তারা নিন্দনীয় ও মিথ্যা কথা বলে। আর নিশ্চয় আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম ক্ষমাকারী।


আয়াতের তাফসীর ও বিশদ ব্যাখ্যা

সূরা আল-মুজাদালাহর ২ নম্বর আয়াত একটি সামাজিক-নৈতিক সমস্যা সমাধানের প্রেক্ষাপটে নাযিল হয়েছে। এটি “যিহার” নামে পরিচিত এক জাহেলি প্রথা সম্পর্কে। জাহেলি যুগে কোনো পুরুষ যদি তার স্ত্রীকে বলত—“তুমি আমার মায়ের পিঠের মতো”—তাহলে সে স্ত্রী কার্যত ঝুলন্ত অবস্থায় পড়ে যেত। সে না সম্পূর্ণ তালাকপ্রাপ্ত, না বৈধ স্ত্রী হিসেবে গ্রহণযোগ্য। এতে নারীর প্রতি একধরনের অবিচার ও মানসিক নির্যাতন সৃষ্টি হতো। কুরআন এই অন্যায় প্রথার বিরুদ্ধে অবস্থান নিয়েছে।

আয়াত শুরু হয়েছে—
“الذين يظاهرون منكم من نسائهم”
তোমাদের মধ্যে যারা নিজেদের স্ত্রীদের যিহার করে।

“যুহার” শব্দটি “যাহর” (পিঠ) থেকে এসেছে। এটি এমন এক ঘোষণা, যা স্ত্রীকে মায়ের সাথে তুলনা করে—ফলে সম্পর্ক স্থায়ীভাবে হারাম হয়ে গেছে বলে দাবি করা হতো। কিন্তু কুরআন স্পষ্টভাবে বলছে—এটি বাস্তবতা নয়।

“ما هن أمهاتهم”
তারা তাদের মা হয়ে যায় না।

এখানে কুরআন একটি মৌলিক নীতি স্থাপন করছে—বাস্তব সম্পর্ক আল্লাহ নির্ধারণ করেন, মানুষের মুখের কথায় তা বদলায় না। মা হলো জন্মদাত্রী। সামাজিক বা আবেগিক তুলনা আইনি সম্পর্ক বদলায় না।

“إن أمهاتهم إلا اللائي ولدنهم”
তাদের মায়েরা তো কেবল তারা-ই যারা তাদের জন্ম দিয়েছে।

এটি একটি সরল কিন্তু গভীর ঘোষণা। রক্তসম্পর্ক, বংশ, মাতৃত্ব—এসব আল্লাহর নির্ধারিত বাস্তবতা। জাহেলি প্রথা সেই বাস্তবতাকে বিকৃত করতে পারে না।

এরপর আয়াত কঠোর ভাষায় বলছে—
“وإنهم ليقولون منكرا من القول وزورا”
নিশ্চয় তারা নিন্দনীয় ও মিথ্যা কথা বলে।

“মুনকার” মানে নৈতিকভাবে ঘৃণ্য, অস্বীকৃত।
“যূর” মানে মিথ্যা ও বিকৃতি।

অর্থাৎ যিহার কেবল একটি আবেগপ্রসূত কথা নয়; এটি একটি নৈতিক বিকৃতি ও সামাজিক অন্যায়। ইসলাম নারীর মর্যাদা রক্ষায় এই প্রথাকে বাতিল করেছে।

আয়াতের শেষে একটি ভারসাম্যপূর্ণ উপসংহার—
“وإن الله لعفو غفور”
আল্লাহ অতিশয় ক্ষমাশীল, পরম ক্ষমাকারী।

অর্থাৎ যারা অজ্ঞতার কারণে এমন কথা বলেছে, তাদের জন্য তাওবার দরজা খোলা। তবে ক্ষমা মানে নিয়মহীনতা নয়; পরবর্তী আয়াতে (৫৮:৩–৪) এর কাফফারা নির্ধারণ করা হয়েছে—দাস মুক্ত করা, না পারলে ধারাবাহিক রোজা, না পারলে দরিদ্রকে খাদ্যদান। অর্থাৎ অন্যায়ের প্রায়শ্চিত্ত রয়েছে।


সামাজিক ন্যায় ও ইসলামের সংস্কার

এই আয়াত ইসলামের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য তুলে ধরে—সমাজসংস্কার। ইসলাম নারীর অধিকার রক্ষা করেছে। যিহার প্রথা নারীর জীবনকে অনিশ্চয়তায় ফেলত। কুরআন বলেছে—এটি মিথ্যা ও নিন্দনীয়।

এখানে দুটি বড় নীতি দেখা যায়:

১. সম্পর্কের বাস্তবতা আল্লাহ নির্ধারণ করেন।
২. আবেগপ্রসূত বা ক্ষতিকর শব্দ আইনি অবস্থান বদলায় না।

ইসলাম শব্দের দায়িত্বশীলতা শিখিয়েছে। মুখের কথা হালকা নয়। কুরআন অন্যত্র বলেছে—
“মানুষ যে কথা উচ্চারণ করে, তার কাছে এক পর্যবেক্ষক উপস্থিত থাকে।” (৫০:১৮)

অতএব কথার দায় আছে।


গভীর তাৎপর্য

এই আয়াত কেবল যিহার নয়; ভাষার অপব্যবহার ও পারিবারিক অবিচারের বিরুদ্ধে অবস্থান। এটি শেখায়—

  • পরিবারে দায়িত্বশীলতা।
  • আবেগের বশবর্তী হয়ে সম্পর্ক নষ্ট না করা।
  • নারীর মর্যাদা রক্ষা।
  • অন্যায় প্রথা সংস্কার।

এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভারসাম্য রয়েছে—অন্যায়কে “মুনকার” বলা হয়েছে, কিন্তু তাওবার সুযোগ রাখা হয়েছে।


সম্পর্কিত আয়াতসমূহ

  • ৫৮:১ — যে নারী অভিযোগ করেছিল, আল্লাহ তার কথা শুনেছেন
  • ৫৮:৩–৪ — যিহারের কাফফারা
  • ৪:১৯ — নারীদের সাথে সদ্ব্যবহার
  • ৫০:১৮ — কথার জবাবদিহি

সংক্ষেপে (করণীয়)

✔ মুখের কথা দায়িত্ব নিয়ে বলা
✔ পারিবারিক সম্পর্কে ন্যায় বজায় রাখা
✔ নারীর মর্যাদা রক্ষা
✔ ভুল করলে তাওবা ও প্রায়শ্চিত্ত
✔ আল্লাহর বিধান অনুযায়ী সম্পর্ক নির্ধারণ

আল্লাহ আমাদের জিহ্বাকে সংযত রাখার তাওফীক দিন, পারিবারিক জীবনে ন্যায় ও সম্মান প্রতিষ্ঠা করার শক্তি দিন, এবং ভুল থেকে ফিরে আসার আন্তরিকতা দান করুন। নিশ্চয় তিনি ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page