• বৃহস্পতিবার, ০৬ অগাস্ট ২০২৬, ০৭:৩২ পূর্বাহ্ন

তাফসীর | সূরা ৫৮ : আয়াত ৩

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ২১৮ Time View
Update : মঙ্গলবার, ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

তাফসীর | সূরা আল-মুজাদালাহ : আয়াত ৩

লেখক: মাহাতাব আকন্দ
প্রকাশনা: Friends of Quran Foundation


আরবি আয়াত

وَالَّذِينَ يُظَاهِرُونَ مِن نِّسَائِهِمْ ثُمَّ يَعُودُونَ لِمَا قَالُوا فَتَحْرِيرُ رَقَبَةٍ مِّن قَبْلِ أَن يَتَمَاسَّا ۚ ذَٰلِكُمْ تُوعَظُونَ بِهِ ۚ وَاللَّهُ بِمَا تَعْمَلُونَ خَبِيرٌ


বাংলা ভাবার্থ

আর যারা নিজেদের স্ত্রীদের যিহার করে, তারপর তারা যা বলেছিল তা প্রত্যাহার করতে চায়—তবে তাদের জন্য রয়েছে, তারা পরস্পর স্পর্শ করার আগে একটি দাসমুক্ত করা। এ দ্বারা তোমাদের উপদেশ দেওয়া হচ্ছে। আর তোমরা যা করো, আল্লাহ সে বিষয়ে পূর্ণ অবগত।


আয়াতের তাফসীর ও বিশদ ব্যাখ্যা

সূরা আল-মুজাদালাহর ৩ নম্বর আয়াত পূর্ববর্তী আয়াতের (৫৮:২) ধারাবাহিকতা। আগের আয়াতে যিহার প্রথাকে “মুনকার” ও “যূর” বলা হয়েছে—অর্থাৎ নিন্দনীয় ও মিথ্যা ঘোষণা। এখন এখানে সেই ভুল উচ্চারণের পরিণতি ও সংশোধনের পথ নির্ধারণ করা হয়েছে।

১. “والذين يظاهرون من نسائهم” — যিহারের পুনরুল্লেখ

এখানে আবার যিহারের প্রসঙ্গ এসেছে। এটি দেখায়—কুরআন কেবল অন্যায় চিহ্নিত করেই থেমে যায় না; বরং সংশোধনের প্রক্রিয়াও নির্ধারণ করে।

২. “ثم يعودون لما قالوا” — কথার পরিণতি থেকে ফিরে আসা

“তারা যা বলেছিল তা প্রত্যাহার করতে চায়”—অর্থাৎ তারা বুঝেছে যে এই ঘোষণা ভুল ছিল এবং তারা দাম্পত্য সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করতে চায়। ইসলাম ভুল স্বীকার ও সংশোধনের পথ খোলা রাখে।

৩. কাফফারা: দাসমুক্ত করা

“فتحرير رقبة من قبل أن يتماسا”
পরস্পর স্পর্শের আগে একটি দাসমুক্ত করা।

এখানে তিনটি গভীর তাৎপর্য রয়েছে:

১. অন্যায়ের প্রায়শ্চিত্ত প্রয়োজন। মুখের কথা হালকা নয়।
২. দাম্পত্য সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের আগে সংশোধন জরুরি।
৩. দাসমুক্তি—সমাজসংস্কারের অংশ।

ইসলাম দাসপ্রথা হঠাৎ বিলোপ করেনি; বরং বিভিন্ন প্রায়শ্চিত্তের মাধ্যমে মুক্তির পথ প্রসারিত করেছে। যিহারের কাফফারা হিসেবে দাসমুক্তির নির্দেশ সেই মানবিক সংস্কারের অংশ।

৪. “ذلكم توعظون به” — এটি উপদেশ

এই বিধান কেবল শাস্তি নয়; শিক্ষা। মানুষ যেন বুঝে—আবেগপ্রসূত বা অবিবেচক শব্দের পরিণতি আছে।

৫. “والله بما تعملون خبير” — আল্লাহ সব জানেন

আল্লাহ তোমাদের কাজ সম্পর্কে অবগত। কেউ বাহ্যিকভাবে কাফফারা দিলেও অন্তরে অবজ্ঞা রাখলে আল্লাহ তা জানেন। এখানে বাহ্যিক সংশোধনের পাশাপাশি অন্তরের সংশোধনও জরুরি।


ইসলামী ন্যায়বিচারের কাঠামো

এই আয়াত থেকে কয়েকটি মৌলিক নীতি উঠে আসে:

১. অন্যায় প্রথা বাতিল।
২. ভুলের পর প্রায়শ্চিত্ত নির্ধারণ।
৩. পরিবার রক্ষায় শৃঙ্খলা।
৪. সামাজিক সংস্কার—দাসমুক্তির মাধ্যমে।

পরবর্তী আয়াতে (৫৮:৪) বলা হয়েছে—যদি দাসমুক্তির সামর্থ্য না থাকে, তবে ধারাবাহিক দুই মাস সিয়াম; তাও না পারলে ষাটজন দরিদ্রকে খাদ্যদান। অর্থাৎ প্রায়শ্চিত্তের ধাপ রয়েছে, কিন্তু কোনো না কোনোভাবে দায়িত্ব পালন করতেই হবে।


গভীর তাৎপর্য

এই আয়াত ভাষার দায়বদ্ধতা শেখায়। সম্পর্ক নিয়ে খেলা নয়। মুখের একটি ঘোষণা একটি নারীর জীবনকে অনিশ্চয়তায় ফেলতে পারে—তাই ইসলাম বলেছে, কথা বলার আগে ভাবো।

এটি পরিবারকেন্দ্রিক সমাজের সুরক্ষা। বিবাহ কেবল আবেগ নয়; দায়িত্ব। আর ভুল হলে তার সংশোধন আছে—কিন্তু শাস্তি ছাড়াই নয়।


সম্পর্কিত আয়াতসমূহ

  • ৫৮:২ — যিহার নিন্দনীয় ও মিথ্যা
  • ৫৮:৪ — কাফফারার বিকল্প ধাপ
  • ৪:১৯ — নারীদের সাথে সদ্ব্যবহার
  • ৫০:১৮ — কথার জবাবদিহি

সংক্ষেপে (করণীয়)

✔ আবেগে সম্পর্ক নষ্টকারী কথা না বলা
✔ ভুল হলে দায়িত্ব নিয়ে সংশোধন
✔ দাম্পত্য সম্পর্ককে সম্মান করা
✔ প্রায়শ্চিত্তকে গুরুত্ব দেওয়া
✔ আল্লাহর জ্ঞানের প্রতি সচেতন থাকা

আল্লাহ আমাদের জিহ্বাকে সংযত রাখুন, পরিবারকে ন্যায় ও সম্মানের উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন, এবং ভুল করলে আন্তরিকভাবে সংশোধনের তাওফীক দিন। নিশ্চয় তিনি সবকিছু সম্পর্কে পূর্ণ অবগত।


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page