আব্দুল কাদির আকন্দ (কবি ও সাহিত্যিক)
رَبِّ أَعُوذُ بِكَ مِنْ هَمَزَاتِ الشَّيَاطِينِ، وَأَعُوذُ بِكَ رَبِّ أَنْ يَحْضُرُونِ، الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ، وَسَلَامٌ عَلَى مَنِ اتَّبَعَ الْهُدَى، وَسَلَامٌ عَلَى مُحَمَّدٍ الَّذِي جَاءَ بِالْقُرْآنِ مُهَيْمِنًا
(অর্থ: হে আমার প্রতিপালক! আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাই শয়তানদের কুমন্ত্রণা থেকে। আর আমি তোমার কাছে আশ্রয় চাই, হে আমার প্রতিপালক, যাতে তারা আমার কাছে না আসে। সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর জন্য, যিনি বিশ্বজগতের প্রতিপালক। শান্তি তাদের উপর, যারা হেদায়েত অনুসরণ করে। এবং শান্তি মুহাম্মদের উপর, যিনি কোরআন নিয়ে এসেছিলেন, যা সবকিছুর উপরে নিয়ন্ত্রণকারী।)
আজ একটু দাড়াবো ইতিহাসের আঙিনায়। একজন মহান আলেমকে নিয়ে কথা বলবো যার নাম ইমাম আবু হানিফা রঃ।— আবু হানিফা (রহ.) ছিলেন শুধু একজন ফকিহ নন, তিনি ছিলেন সময়ের বিরুদ্ধে বিদ্রোহী এক কণ্ঠস্বর। তিনি ছিলেন এমন এক সাহসী মানুষ যিনি খলিফার সোনালী সিংহাসনের সামনে মাথা নত করতে অস্বীকৃতি জানান। তার সেই অস্বীকৃতি ছিল সিজদার প্রকৃত অর্থ— মেনে নেয়া শুধু আল্লাহকে, এবং আল্লাহর কিতাব কোরআনকে।
আপনাদের জানাতে চাই— ইমাম আবু হানিফা হানাফি মাযহাবের প্রতিষ্ঠাতা নন। তার নামে পর্বর্তীতে মাজহাব তৈরী করা হয়েছে। বরং তিনি ছিলেন সত্যিকার অর্থে একজন মুক্তচিন্তার আলেম। তিনি হাদিসের পাহাড় চাপিয়ে রাখা অন্ধ অনুকরণে বিশ্বাস করতেন না। ইতিহাস থেকে জানা যায় তিনি হাদিস সংগ্রহ করেছিলেন ৪০ হাজার। তিনি তা থেকে ১০০০ এর মত হাদিস ছাত্রদের শুনাতেন কিন্তু কখনো লিখে রাখতে দিতেননা। ইমাম আবু হানিফার মৃত্যুর পর তার ছাত্র ইমাম মুহাম্মদ তার নামে একটি হাদিসের বই রচনা করেন।
যার নাম কিতাবুল আছার। তিনি সর্বদা কোরআনকে প্রাধান্য দিতেন। তিনি যুক্তি ও বিচারশক্তিকে কোরআনের সাথে মিলিয়ে ব্যবহার করতেন। এজন্যই তার ফিকাহকে বলা হয়— আহলুর-রায়, অর্থাৎ মতামত-ভিত্তিক স্কুল।
কিন্তু এই স্বাধীনতা, এই মুক্তচিন্তা— শাসকগোষ্ঠীর পছন্দ হয়নি। কারণ শাসকগোষ্ঠী চেয়েছিল এমন এক ইসলাম, যা তাদের সিংহাসনকে বৈধতা দেবে। তারা চেয়েছিল এমন এক আলেমদের দল, যারা বলবে— “খলিফা আল্লাহর ছায়া”, “খলিফার বিরুদ্ধে কথা বলা হারাম”, “শাসকের যুলুম সহ্য করা ফরজ।” অথচ কোরআন গর্জে উঠেছে:
وَلَا تَرْكَنُوْا اِلَى الَّذِيْنَ ظَلَمُوْا فَتَمَسَّكُمُ النَّارُ
(তোমরা যালিমদের দিকে ঝুঁকো না, না হলে তোমাদের আগুন স্পর্শ করবে। সূরা হুদ ১১:১১৩)
ইমাম আবু হানিফা এই কোরআনের আয়াতকে বাস্তবে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। তিনি যালিম শাসকদের সাথে আপস করেননি। এজন্যই শাসকেরা তাকে নিপীড়ন করেছিল, তাকে কারাগারে নিক্ষেপ করেছিল। এবং ইতিহাস বলে— তাকে হয়তো বিষ প্রয়োগ করে হত্যা করা হয়েছিল, কিংবা কারাগারে নির্যাতনে মৃত্যু বরণ করেন। কিন্তু তার মৃত্যু আসলে এক শহীদের মৃত্যু ছিল— যিনি কোরআনের পক্ষে দাঁড়িয়েছিলেন।
আমরা যদি ইতিহাসের পাতা উল্টাই, দেখি— উমাইয়া খিলাফতের শেষ সময় আর আব্বাসীয় খিলাফতের শুরুর সময় ছিল রাজনৈতিক চক্রান্ত, ষড়যন্ত্র ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বে পূর্ণ। এই সময়েই আবু হানিফা বেঁচেছিলেন।
খলিফারা তাকে বিচারপতির (কাজি) পদে বসাতে চেয়েছিল। কেন? কারণ তারা জানতো— যদি আবু হানিফা তাদের হয়ে ফতোয়া দেন, তবে সাধারণ মানুষ বুঝবে— খলিফার সব সিদ্ধান্ত ইসলামের দৃষ্টিতে বৈধ। কিন্তু আবু হানিফা সেই প্রস্তাব সরাসরি প্রত্যাখ্যান করেছিলেন। তিনি বলেছিলেন— “আমি রাজনীতির চাকর নই, আমি আল্লাহর কিতাবের দাস।”
এই এক কথার কারণে তিনি শাসকের চক্ষুশূল হয়ে গেলেন। আবু হানিফার যুক্তি ছিল— ইসলামী আইন মানে কেবল কোরআন। কোনো শাসক নিজের ইচ্ছায় নতুন আইন তৈরি করতে পারবে না। অথচ শাসকেরা হাদিসকে ব্যবহার করে নিজেদের জন্য আইন বানাচ্ছিল।
উদাহরণ দেই—
কোরআন বলছে:
لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ
(ধর্মের ব্যাপারে কোনো জোরজবরদস্তি নেই। সূরা বাকারা ২:২৫৬)
কিন্তু শাসকগোষ্ঠীর দরবারে তৈরি হলো এমন হাদিস— “যে ধর্ম পরিবর্তন করবে তাকে হত্যা করো।”
কোরআন একদিকে স্বাধীনতা ঘোষণা করছে, অন্যদিকে শাসকের দরবার বানাচ্ছে সন্ত্রাসী আইন। আর আবু হানিফা এই দ্বিচারিতার বিরুদ্ধে ছিলেন।
শাসকেরা চাইত এমন আলেম, যারা বলবে— “দাড়ি রাখা ফরজ”, “টুপি ছাড়া নামাজ হবে না”, “মাজারে মানত মানলে বরকত হবে।” অথচ এসব কোরআনে নেই। এগুলো বানানো হয়েছিল শাসকের স্বার্থে, সমাজকে বিভক্ত করে রাখার জন্য। আবু হানিফা এসব কুসংস্কার প্রত্যাখ্যান করেছিলেন।
তিনি বলেছিলেন— “ইসলামের ভিত্তি হচ্ছে কোরআন, হাদিস নয়। হাদিসকে যাচাই করতে হবে কোরআনের আলোয়।”
এই কথাই ছিল তার আসল অপরাধ। কারণ শাসকেরা চাইত হাদিস-নির্ভর ইসলাম, যাতে তাদের ক্ষমতার বৈধতা লুকিয়ে রাখা যায়। আর আবু হানিফা চাইতেন কোরআন-নির্ভর ইসলাম।
ইতিহাসবিদরা লিখেছেন— খলিফা আল-মানসুর তাকে বিচারপতির পদ নিতে চাপ দিয়েছিলেন। আবু হানিফা রাজি হননি। তখন তাকে গ্রেপ্তার করা হয়, কারাগারে নির্যাতন করা হয়। কিছু বর্ণনায় আছে— তাকে বিষ খাইয়ে দেওয়া হয়েছিল।
তাহলে প্রশ্ন হলো— কেন একজন আলেমকে এভাবে হত্যা করা হলো?
উত্তর স্পষ্ট: কারণ তিনি যালিম শাসকের বিরুদ্ধে মাথা নত করেননি। কারণ তিনি কোরআনের পক্ষে ছিলেন, আর কোরআন যুলুমের বিরুদ্ধে গর্জে উঠে।
কোরআন বলছে:
وَقَاتِلُوهُمْ حَتَّى لَا تَكُوْنَ فِتْنَةٌ وَيَكُوْنَ الدِّينُ لِلّٰهِ
(তাদের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করো, যতক্ষণ না ফিতনা দূর হয় এবং দ্বীন শুধু আল্লাহর জন্য প্রতিষ্ঠিত হয়। সূরা বাকারা ২:১৯৩)
আবু হানিফা এই আয়াতকে বাস্তব করে তুলেছিলেন। তিনি যুলুমের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করেছিলেন, যদিও সেটা তার জীবনের বিনিময়ে হয়েছিল।
আজকের মুসলিম সমাজে আমরা দেখি— আবু হানিফার নামে যে মাযহাব প্রচলিত, তার ভেতরে অনেক আইন কোরআনের বিপরীতে চলে গেছে। অথচ প্রকৃত আবু হানিফা কোরআনের আলোয় দাঁড়িয়েছিলেন।
তিনি কখনো বলতেন না— “টুপি ছাড়া নামাজ হবে না।”
তিনি কখনো বলতেন না— “মাজারে গিয়ে মানত মানা বৈধ।”
তিনি কখনো বলতেন না— “শাসকের যুলুম সহ্য করা ফরজ।”
এসব বানানো হয়েছিল পরে, শাসকের স্বার্থে, ধর্মব্যবসায়ীদের চাপে। আবু হানিফার সত্যিকার শিক্ষাকে চাপা দিয়ে দেওয়া হয়েছিল।
ইমাম আবু হানিফার মৃত্যু আসলে আমাদের জন্য এক শিক্ষা। তিনি শিখিয়েছেন— ইসলামের আসল শক্তি কোরআনে, কোনো শাসকের সিংহাসনে নয়। তিনি শিখিয়েছেন— সত্যিকারের সিজদা মানে আল্লাহকে মেনে নেওয়া, আল্লাহর কিতাবকে মানা।
আজ আমাদের মুসলিম সমাজকে নতুন করে প্রশ্ন করতে হবে— আমরা কি আবু হানিফার পথ অনুসরণ করছি, নাকি শাসকের বানানো ইসলাম অনুসরণ করছি?
কোরআন বলছে:
وَاتَّبِعُوْا مَآ أُنْزِلَ إِلَيْكُمْ مِّنْ رَّبِّكُمْ وَلَا تَتَّبِعُوْا مِنْ دُوْنِهٖٓ أَوْلِيَآءَ ۗ قَلِيْلًا مَّا تَذَكَّرُوْنَ
(তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যা অবতীর্ণ হয়েছে, তার অনুসরণ করো। তার বাইরে কোনো অভিভাবকের অনুসরণ করো না। তোমরা খুবই অল্প উপদেশ গ্রহণ করো। সূরা আ’রাফ ৭:৩)
আজ সময় এসেছে কোরআনের দিকে ফিরে আসার। সময় এসেছে আবু হানিফার মত সাহসী হওয়ার। শাসকগোষ্ঠীর ধর্ম নয়, আল্লাহর কিতাব— এটিই আমাদের মুক্তির একমাত্র পথ।
তথ্যসূত্র (সংক্ষিপ্ত):
১. আল-খতিব আল-বাগদাদি, তারিখ বাগদাদ
২. ইবনে খাল্লিকান, ওফায়াতুল আ’ইয়ান
৩. শাহ ওয়ালীউল্লাহ দেহলভী, ইযালাতুল খিফা
৪. কোরআনুল কারিম (বিভিন্ন আয়াত উদ্ধৃত)
