লেখক: মাহাতাব আকন্দ
প্রকাশনা: Friends of Qur’an Foundation
لَا تَجِدُ قَوْمًا يُؤْمِنُونَ بِاللّٰهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللّٰهَ وَرَسُولَهُ وَلَوْ كَانُوا آبَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَاءَهُمْ أَوْ إِخْوَانَهُمْ أَوْ عَشِيرَتَهُمْ ۚ أُولَٰئِكَ كَتَبَ فِي قُلُوبِهِمُ الْإِيمَانَ وَأَيَّدَهُم بِرُوحٍ مِّنْهُ ۖ وَيُدْخِلُهُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا ۚ رَضِيَ اللّٰهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ ۚ أُولَٰئِكَ حِزْبُ اللّٰهِ ۚ أَلَا إِنَّ حِزْبَ اللّٰهِ هُمُ الْمُفْلِحُونَ
“তুমি এমন কোনো সম্প্রদায় পাবে না যারা আল্লাহ ও পরকালে ঈমান রাখে—তারা তাদের সাথে অন্তরঙ্গ বন্ধুত্ব করে যারা আল্লাহ ও তাঁর রসূলের বিরোধিতা করে, যদিও তারা তাদের পিতা, পুত্র, ভাই বা আত্মীয়-স্বজনই হোক। এদের অন্তরে আল্লাহ ঈমান লিখে দিয়েছেন এবং তাঁর পক্ষ থেকে এক শক্তি দ্বারা তাদেরকে সাহায্য করেছেন। আর তিনি তাদেরকে এমন জান্নাতে প্রবেশ করাবেন যার নিচ দিয়ে নদী প্রবাহিত—তারা সেখানে স্থায়ীভাবে থাকবে। আল্লাহ তাদের প্রতি সন্তুষ্ট এবং তারাও তাঁর প্রতি সন্তুষ্ট। তারাই আল্লাহর দল। জেনে রাখ, আল্লাহর দলই সফলকাম।”
এই আয়াতটি ঈমানের একটি অত্যন্ত গভীর ও বাস্তব পরীক্ষাকে সামনে আনে—মানুষের অন্তরের আনুগত্য কাকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে? এখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, প্রকৃত ঈমানদার এমন হতে পারে না যে সে আল্লাহ ও আখিরাতে বিশ্বাস রাখে, অথচ একই সাথে এমন মানুষের সাথে অন্তরঙ্গ সম্পর্ক বজায় রাখে যারা আল্লাহর নির্দেশনার বিরোধিতা করে।
এখানে “لَا تَجِدُ قَوْمًا”—এটি একটি দৃঢ় ঘোষণা, যা বোঝায় এই দুই অবস্থা একসাথে সত্য হতে পারে না। অর্থাৎ, অন্তরের গভীরে ঈমান থাকলে তা মানুষের সম্পর্ক ও আনুগত্যের ক্ষেত্রেও প্রতিফলিত হবেই।
এখানে “يُوَادُّونَ مَنْ حَادَّ اللّٰهَ”—এখানে “ভালবাসা” বা ঘনিষ্ঠতা বলতে শুধু বাহ্যিক সম্পর্ক নয়; বরং এমন এক অন্তরঙ্গ সমর্থন, যেখানে মানুষের অবস্থান ও আদর্শ এক হয়ে যায়। যারা আল্লাহর নির্দেশনার বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়, তাদের সাথে এমন ঘনিষ্ঠতা ঈমানের সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এরপর আয়াতে সবচেয়ে কঠিন বাস্তবতা তুলে ধরা হয়েছে—“وَلَوْ كَانُوا آبَاءَهُمْ أَوْ أَبْنَاءَهُمْ…” অর্থাৎ, এই বিরোধিতা যদি নিজের নিকটতম আত্মীয়দের মধ্যেও থাকে, তবুও একজন সত্যিকারের মুমিন তার অন্তরের আনুগত্যকে সত্যের দিকেই স্থির রাখে। এটি সম্পর্ক ছিন্ন করার আহ্বান নয়; বরং আদর্শিক অবস্থানকে পরিষ্কার রাখার নির্দেশনা।
এরপর আল্লাহ বলেন—“كَتَبَ فِي قُلُوبِهِمُ الْإِيمَانَ”—এটি অত্যন্ত গভীর একটি আধ্যাত্মিক অবস্থা। ঈমান এখানে শুধু একটি ধারণা নয়; বরং এটি মানুষের অন্তরে স্থায়ীভাবে লিখিত, প্রতিষ্ঠিত এবং জীবন্ত একটি শক্তি।
এখানে “وَأَيَّدَهُم بِرُوحٍ مِّنْهُ”—আল্লাহ তাদেরকে তাঁর পক্ষ থেকে একটি শক্তি বা সমর্থন দ্বারা সাহায্য করেন। এটি এমন এক আধ্যাত্মিক শক্তি, যা মানুষকে সত্যের উপর অটল থাকতে সাহায্য করে, যদিও তার চারপাশের পরিবেশ বিপরীত হয়।
এরপর জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে—এটি শুধু পরকালের পুরস্কার নয়; বরং এটি সেই চূড়ান্ত সফলতার প্রতীক, যেখানে মানুষ তার বিশ্বাসের জন্য পরিপূর্ণ প্রতিদান পায়।
এখানে “رَضِيَ اللّٰهُ عَنْهُمْ وَرَضُوا عَنْهُ”—এই অংশটি ঈমানের সর্বোচ্চ অবস্থানকে নির্দেশ করে—আল্লাহ সন্তুষ্ট, আর বান্দাও সন্তুষ্ট। এটি এক ধরনের আধ্যাত্মিক পরিপূর্ণতা, যেখানে মানুষের অন্তর আল্লাহর সিদ্ধান্তের সাথে সম্পূর্ণভাবে একাত্ম হয়ে যায়।
শেষে বলা হয়েছে—“حِزْبُ اللّٰهِ”—আল্লাহর দল। এটি কোনো বাহ্যিক সংগঠন নয়; বরং এটি সেইসব মানুষের পরিচয়, যারা তাদের অন্তর, চিন্তা ও জীবনে আল্লাহর নির্দেশনাকে অগ্রাধিকার দেয়।
১. ঈমান মানুষের সম্পর্ক ও আনুগত্যের ধরণ নির্ধারণ করে।
২. সত্যের প্রতি অবস্থান কখনো কখনো ব্যক্তিগত সম্পর্কের সাথে সংঘর্ষে আসে।
৩. অন্তরে প্রতিষ্ঠিত ঈমান মানুষকে দৃঢ়তা ও স্থিরতা দেয়।
৪. আল্লাহর সন্তুষ্টিই চূড়ান্ত সফলতার মানদণ্ড।
