লেখক: মাহাতাব আকন্দ
প্রকাশনা: Friends of Qur’an Foundation
وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَى
আর যে আমার স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার জন্য রয়েছে এক সংকীর্ণ জীবন, এবং কিয়ামতের দিন আমি তাকে অন্ধ অবস্থায় উঠাবো।
এই আয়াতটি মানুষের অন্তর্জগত ও পরিণতির একটি গভীর সত্য উন্মোচন করে। এখানে আল্লাহ এমন এক অবস্থার কথা বলছেন, যা বাহ্যিকভাবে সবসময় দৃশ্যমান না হলেও ভেতরে ভেতরে একজন মানুষকে ভেঙে দেয়—আর সেটি হলো তাঁর “যিকর” থেকে মুখ ফিরিয়ে নেওয়া।
আয়াতের শুরুতেই বলা হয়েছে—“وَمَنْ أَعْرَضَ عَنْ ذِكْرِي”। এখানে “أَعْرَضَ” শব্দটি খুবই তাৎপর্যপূর্ণ। এটি কেবল না জানা বা ভুলে যাওয়া বোঝায় না; বরং এটি এমন এক ইচ্ছাকৃত অবস্থাকে নির্দেশ করে, যেখানে মানুষ সত্যকে সামনে পেয়েও তা থেকে সরে যায়। “ذِكْرِي” বা আল্লাহর স্মরণ বলতে এখানে তাঁর নাজিলকৃত বার্তা—কুরআন, হিদায়াত, সত্যের আহ্বান—সবকিছু অন্তর্ভুক্ত। অর্থাৎ, মানুষ জানার সুযোগ পেয়েছিল, শুনেছিল, বুঝতেও পারত; কিন্তু সে নিজেই মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
এরপরই ফলাফল ঘোষণা করা হয়েছে—“فَإِنَّ لَهُ مَعِيشَةً ضَنكًا”। এখানে “মা‘ঈশাহ্ দাঙ্কা” বা সংকীর্ণ জীবন এমন কোনো বিষয় নয় যা কেবল দারিদ্র্য বা অর্থনৈতিক কষ্টের সাথে সীমাবদ্ধ। বরং এটি হৃদয়ের সংকীর্ণতা, অস্থিরতা, অশান্তি এবং ভিতরের শূন্যতার একটি চিত্র। একজন মানুষের বাহ্যিকভাবে সবকিছু থাকতে পারে—সম্পদ, অবস্থান, সফলতা—তবুও তার ভেতরে এক ধরনের চাপা অন্ধকার, অস্থিরতা এবং অশান্তি কাজ করতে পারে। এই আয়াত সেই অভ্যন্তরীণ সংকীর্ণতার দিকেই ইঙ্গিত করে।
এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় লক্ষ্য করার মতো—আল্লাহ এই সংকীর্ণতাকে সরাসরি “শাস্তি” হিসেবে না বলে “জীবন” হিসেবেই উল্লেখ করেছেন। অর্থাৎ, এটি কেবল ভবিষ্যতের কোনো শাস্তি নয়; বরং দুনিয়াতেই মানুষ তার ফল ভোগ করতে শুরু করে। যখন একজন মানুষ আল্লাহর যিকর থেকে দূরে সরে যায়, তখন তার জীবনের ভেতর থেকে প্রশান্তি ধীরে ধীরে হারিয়ে যায়।
আয়াতের শেষ অংশে বলা হয়েছে—“وَنَحْشُرُهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ أَعْمَى”। দুনিয়ায় সে সত্যকে উপেক্ষা করেছে, দেখতে চায়নি—তাই আখিরাতে তাকে বাস্তবিক অর্থেই অন্ধ অবস্থায় উঠানো হবে। এখানে দুনিয়ার অবস্থা এবং আখিরাতের পরিণতির মধ্যে একটি গভীর সম্পর্ক স্থাপন করা হয়েছে। মানুষ দুনিয়ায় যে মানসিকতা নিয়ে বাঁচে, আখিরাতে তার প্রতিফলনই প্রকাশ পায়।
এই আয়াতটি শুধু একটি সতর্কবার্তা নয়; বরং একটি আয়না, যেখানে আমরা নিজেদের দেখতে পারি। আমরা কি সত্যকে সামনে পেয়েও এড়িয়ে যাচ্ছি? আমরা কি আল্লাহর যিকরকে জীবনের কেন্দ্র না করে প্রান্তে ঠেলে দিচ্ছি? যদি তাই হয়, তবে সেই সংকীর্ণতা ইতিমধ্যেই আমাদের ভেতরে শুরু হয়ে গেছে—হয়তো আমরা এখনো তা পুরোপুরি অনুভব করছি না।
এই আয়াত মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা ও তার পরিণতির একটি বাস্তব চিত্র তুলে ধরে। আল্লাহ কাউকে জোর করে পথভ্রষ্ট করেন না; বরং মানুষ নিজেই যখন সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তখন সে তার ফল ভোগ করে। এখানে সংকীর্ণ জীবনের যে কথা বলা হয়েছে, তা আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়—শান্তি কেবল বাহ্যিক উপকরণে নয়, বরং আল্লাহর সাথে সংযোগে নিহিত।
এটি আমাদের আরও শেখায় যে, আখিরাতের শাস্তি হঠাৎ করে আসে না; বরং দুনিয়ার জীবনের ধারাবাহিকতারই একটি পরিণতি। যে ব্যক্তি দুনিয়ায় সত্যকে দেখতে চায় না, আখিরাতে তার সেই অন্ধত্বই প্রকাশ পাবে।
২০:১২৫ — আখিরাতে অন্ধ হওয়ার প্রশ্ন
২০:১২৬ — কেন এই পরিণতি হলো তার ব্যাখ্যা
৪৩:৩৬ — যিকর থেকে গাফিল হলে শয়তান সঙ্গী হয়
৪৩:৩৭ — পথভ্রষ্ট হয়েও নিজেকে সঠিক মনে করা
আমাদের জীবনে কুরআনকে শুধু পড়ার বিষয় না বানিয়ে, জীবনের কেন্দ্র হিসেবে গ্রহণ করা জরুরি। সত্যকে এড়িয়ে যাওয়ার প্রবণতা থেকে নিজেকে বাঁচাতে হবে। অন্তরের প্রশান্তি খুঁজতে হলে বাহ্যিক উপকরণের পেছনে নয়, বরং আল্লাহর যিকরের সাথে সম্পর্ক দৃঢ় করতে হবে।
