লেখক: মাহাতাব আকন্দ
প্রকাশনা: Friends of Qur’an Foundation
إِنَّ اللّٰهَ لَا يَسْتَحْيِي أَن يَضْرِبَ مَثَلًا مَّا بَعُوضَةً فَمَا فَوْقَهَا ۚ فَأَمَّا الَّذِينَ آمَنُوا فَيَعْلَمُونَ أَنَّهُ الْحَقُّ مِن رَّبِّهِمْ ۖ وَأَمَّا الَّذِينَ كَفَرُوا فَيَقُولُونَ مَاذَا أَرَادَ اللّٰهُ بِهَٰذَا مَثَلًا ۘ يُضِلُّ بِهِ كَثِيرًا وَيَهْدِي بِهِ كَثِيرًا ۚ وَمَا يُضِلُّ بِهِ إِلَّا الْفَاسِقِينَ
আল্লাহ লজ্জা পান না কোনো উদাহরণ দেওয়ায়, এমনকি মশার মতো ছোট কিছুতেও। যারা বিশ্বাসী তারা জানে এটি সত্য। যারা কাফের তারা প্রশ্ন করে, “আল্লাহ এই উদাহারণ দিয়ে কী বোঝাতে চাইল?”—এটি অনেককে বিভ্রান্ত করে, অনেককে সঠিক পথে নিয়ে যায়; কেবল পাপীরাই বিভ্রান্ত হয়। (২ঃ২৬)
এই আয়াতটি কুরআনের দৃষ্টান্তভিত্তিক শিক্ষার একটি মৌলিক নীতিকে স্পষ্ট করে। আল্লাহ এখানে জানিয়ে দিচ্ছেন যে, তিনি কোনো কিছুকেই ছোট বা তুচ্ছ মনে করেন না—প্রয়োজন হলে একটি ক্ষুদ্রতম সৃষ্টিকেও উদাহরণ হিসেবে উপস্থাপন করেন, যাতে মানুষের সামনে সত্যকে স্পষ্ট করে তোলা যায়।
এখানে- “لَا يَسْتَحْيِي أَن يَضْرِبَ مَثَلًا” অংশটি বোঝায়, আল্লাহ দৃষ্টান্ত প্রদানে কোনো সংকোচ বোধ করেন না। মানুষের কাছে যা ছোট বা অপ্রাসঙ্গিক মনে হতে পারে, আল্লাহ তা দিয়েই গভীর সত্য প্রকাশ করেন। এখানে “مَّا بَعُوضَةً فَمَا فَوْقَهَا”—মশা বা তার চেয়েও ক্ষুদ্র বা বৃহৎ কিছু—এর মাধ্যমে বোঝানো হয়েছে, সত্য বোঝানোর জন্য যেকোনো উপমাই যথেষ্ট, যদি মানুষ তা উপলব্ধি করতে চায়।
এরপর মানুষের প্রতিক্রিয়া তুলে ধরা হয়েছে। “فَأَمَّا الَّذِينَ آمَنُوا” — যারা ঈমান এনেছে, তারা এই দৃষ্টান্তগুলোকে সত্য হিসেবে গ্রহণ করে। তারা বোঝে যে, এগুলো আল্লাহর পক্ষ থেকে এসেছে এবং এর মধ্যে গভীর অর্থ নিহিত আছে। তাদের দৃষ্টিভঙ্গি হলো অনুসন্ধানী, গ্রহণযোগ্য এবং সত্যমুখী।
অন্যদিকে—“وَأَمَّا الَّذِينَ كَفَرُوا” — যারা অস্বীকার করে, তারা প্রশ্ন তোলে—“মশা দিয়ে আবার কী বোঝানো হলো?” তাদের প্রশ্ন অনুসন্ধানের জন্য নয়; বরং বিদ্রূপ ও প্রত্যাখ্যানের মানসিকতা থেকে আসে। তারা দৃষ্টান্তের অন্তর্নিহিত অর্থ ধরতে চায় না, বরং বাহ্যিক দিক নিয়েই ব্যস্ত থাকে।
এরপর বলা হয়েছে—“يُضِلُّ بِهِ كَثِيرًا وَيَهْدِي بِهِ كَثِيرًا”—একই দৃষ্টান্ত অনেককে হিদায়াত দেয়, আবার অনেককে পথভ্রষ্ট করে। এর অর্থ এই নয় যে দৃষ্টান্ত নিজেই বিভ্রান্তিকর; বরং মানুষের মানসিকতা ও অবস্থানের উপর নির্ভর করে সে কী গ্রহণ করবে। যে সত্যের প্রতি উন্মুক্ত, সে হিদায়াত পায়; আর যে অহংকারী ও অবাধ্য, সে বিভ্রান্ত হয়।
শেষে বলা হয়েছে—“وَمَا يُضِلُّ بِهِ إِلَّا الْفَاسِقِينَ”—আল্লাহ এই দৃষ্টান্ত দ্বারা কেবল অবাধ্যদেরই পথভ্রষ্ট করেন। অর্থাৎ, যারা আগে থেকেই সত্যকে অস্বীকার করে এবং সীমালঙ্ঘন করে, তারাই এই দৃষ্টান্তগুলো থেকে উপকার পায় না।
এই আয়াত আমাদের শেখায়—কুরআনের দৃষ্টান্তগুলো কেবল জ্ঞান নয়; এগুলো মানুষের অন্তরের অবস্থাকে প্রকাশ করে। একই আয়াত একজনকে পথ দেখায়, আবার অন্যজনকে আরও দূরে সরিয়ে দেয়—এটি নির্ভর করে তার অন্তরের প্রস্তুতি, বিনয় এবং সত্য গ্রহণের ইচ্ছার উপর।
১. সত্য বোঝানোর জন্য কোনো উদাহরণই তুচ্ছ নয়।
২. মানুষের অন্তরের অবস্থাই নির্ধারণ করে সে হিদায়াত পাবে নাকি বিভ্রান্ত হবে।
৩. ঈমানদাররা দৃষ্টান্ত থেকে শিক্ষা নেয়, অস্বীকারকারীরা তা নিয়ে প্রশ্ন তোলে।
৪. অহংকার ও অবাধ্যতা মানুষকে সত্য থেকে দূরে সরিয়ে দেয়।
