লেখক: মাহাতাব আকন্দ
প্রকাশনা: Friends of Qur’an Foundation
أَنزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَسَالَتْ أَوْدِيَةٌ بِقَدَرِهَا فَاحْتَمَلَ السَّيْلُ زَبَدًا رَّابِيًا ۖ وَمِمَّا يُوقِدُونَ عَلَيْهِ فِي النَّارِ ابْتِغَاءَ حِلْيَةٍ أَوْ مَتَاعٍ زَبَدٌ مِّثْلُهُ ۚ كَذَٰلِكَ يَضْرِبُ اللَّهُ الْحَقَّ وَالْبَاطِلَ ۚ فَأَمَّا الزَّبَدُ فَيَذْهَبُ جُفَاءً ۖ وَأَمَّا مَا يَنفَعُ النَّاسَ فَيَمْكُثُ فِي الْأَرْضِ ۚ كَذَٰلِكَ يَضْرِبُ اللَّهُ الْأَمْثَالَ
“তিনি আকাশ থেকে পানি বর্ষণ করেন, ফলে উপত্যকাগুলো তাদের পরিমাণ অনুযায়ী প্রবাহিত হয় এবং স্রোত উপরে ফেনা বহন করে। আর যা তারা আগুনে গলায় অলংকার বা ব্যবহার্য বস্তু তৈরির জন্য, তাতেও এরূপ ফেনা ওঠে। এভাবেই আল্লাহ সত্য ও মিথ্যার উদাহরণ দেন। অতঃপর ফেনা বিলীন হয়ে যায়, আর যা মানুষের উপকারে আসে তা জমিনে স্থায়ী হয়। এভাবেই আল্লাহ দৃষ্টান্তসমূহ বর্ণনা করেন।”
এই আয়াতটি কুরআনের একটি গভীর ও জীবন্ত দৃষ্টান্ত, যেখানে সত্য ও অসত্যের প্রকৃতি অত্যন্ত চিত্রময়ভাবে তুলে ধরা হয়েছে। আল্লাহ এমন উদাহরণ ব্যবহার করেছেন, যা মানুষের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতার সাথে সম্পর্কিত, যাতে সে সহজেই বাস্তবতা উপলব্ধি করতে পারে।
আয়াতের প্রথম অংশে বলা হয়েছে—আকাশ থেকে পানি নেমে আসে এবং উপত্যকাগুলো তাদের নিজস্ব ধারণক্ষমতা অনুযায়ী তা ধারণ করে। এখানে বোঝানো হয়েছে, সত্য বা হিদায়াত সবার কাছে পৌঁছায়, কিন্তু প্রত্যেক ব্যক্তি তা নিজের সামর্থ্য, গ্রহণক্ষমতা এবং মানসিক অবস্থার ভিত্তিতে গ্রহণ করে।
এরপর বলা হয়েছে—সেই পানির স্রোতের উপর ফেনা ভেসে ওঠে। এই ফেনা দেখতে বড় ও চোখে পড়ার মতো হলেও, তা আসলে অস্থায়ী এবং ভেতরে কোনো উপকারিতা নেই। এটি অসত্য, মিথ্যা বা বাহ্যিক চাকচিক্যের প্রতীক।
একইভাবে, যখন মানুষ আগুনে ধাতু গলিয়ে অলংকার বা ব্যবহার্য বস্তু তৈরি করে, তখনও উপরে ফেনা বা আবর্জনা উঠে আসে। অর্থাৎ, যে কোনো প্রক্রিয়ায়—প্রাকৃতিক বা মানবিক—উপকারী জিনিসের সাথে কিছু অপ্রয়োজনীয় বা ক্ষণস্থায়ী উপাদান আলাদা হয়ে যায়।
এরপর আল্লাহ স্পষ্ট করে দেন—এভাবেই সত্য ও অসত্যের দৃষ্টান্ত দেওয়া হয়। “فَأَمَّا الزَّبَدُ فَيَذْهَبُ جُفَاءً”—ফেনা বা অপ্রয়োজনীয় অংশ বিলীন হয়ে যায়, টিকে থাকতে পারে না। এটি নির্দেশ করে যে, মিথ্যা বা অসত্য যতই বড় মনে হোক, তা স্থায়ী নয়।
“وَأَمَّا مَا يَنفَعُ النَّاسَ فَيَمْكُثُ فِي الْأَرْضِ”—অন্যদিকে, যা মানুষের উপকারে আসে, তা জমিনে স্থায়ী হয়ে থাকে। এটি সত্যের প্রকৃতি—তা হয়তো প্রথমে দৃশ্যমান বা আকর্ষণীয় না-ও হতে পারে, কিন্তু শেষ পর্যন্ত সেটিই টিকে থাকে এবং মানুষের জন্য কল্যাণ বয়ে আনে।
এই আয়াতের আধ্যাত্মিক অর্থ অত্যন্ত গভীর। মানুষের জীবনে অনেক চিন্তা, ধারণা ও প্রবণতা আসে—কিছু বাহ্যিকভাবে আকর্ষণীয়, কিন্তু ভিতরে শূন্য; আবার কিছু হয়তো নিঃশব্দ, কিন্তু গভীরভাবে উপকারী। কুরআন আমাদের শেখায়—টিকে থাকবে শুধু সেই সত্য, যা মানুষের উপকারে আসে এবং যা আল্লাহর নির্দেশনার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
১. সত্য স্থায়ী, আর মিথ্যা ক্ষণস্থায়ী।
২. বাহ্যিক চাকচিক্য সবসময় বাস্তব মূল্য বহন করে না।
৩. মানুষ তার গ্রহণক্ষমতা অনুযায়ী হিদায়াত গ্রহণ করে।
৪. আধ্যাত্মিকভাবে উপকারী জিনিসই শেষ পর্যন্ত টিকে থাকে।
