লেখক: মাহাতাব আকন্দ
প্রকাশনা: Friends of Qur’an Foundation
قَالَ رَبِّ لِمَ حَشَرْتَنِي أَعْمَىٰ وَقَدْ كُنتُ بَصِيرًا
সে বলবে: “হে আমার রব! কেন তুমি আমাকে অন্ধ অবস্থায় উঠালে, অথচ আমি তো (দুনিয়ায়) দেখতাম?”
এই আয়াতটি এমন এক মুহূর্তের চিত্র তুলে ধরে, যখন দুনিয়ার সমস্ত ভ্রম ভেঙে গিয়ে মানুষ বাস্তবতার সামনে দাঁড়িয়ে যায়। এটি কোনো সাধারণ প্রশ্ন নয়; বরং এটি সেই মানুষের প্রশ্ন, যে দুনিয়ায় সত্য থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিল, কিন্তু আখিরাতে এসে নিজের অবস্থার ভয়াবহতা উপলব্ধি করছে।
পূর্ববর্তী আয়াতে বলা হয়েছিল—যে আল্লাহর যিকর থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, তার জন্য সংকীর্ণ জীবন এবং আখিরাতে অন্ধ হয়ে উঠানো হবে। এই আয়াতে আমরা সেই ঘোষণার প্রতিক্রিয়া দেখতে পাই। মানুষ তখন প্রশ্ন করে—“لِمَ حَشَرْتَنِي أَعْمَىٰ”—কেন আমাকে অন্ধ অবস্থায় উঠানো হলো?
এখানে “حَشَرْتَنِي” শব্দটি সমবেত করা বা উঠানো বোঝায়—অর্থাৎ কিয়ামতের ময়দানে উপস্থিত করা। আর “أَعْمَىٰ” মানে অন্ধ। কিন্তু এই অন্ধত্ব শুধু শারীরিক নয়; এটি একটি গভীর প্রতীকী বাস্তবতা—দুনিয়ায় যে সত্যকে দেখতে চায়নি, আজ সে প্রকৃতপক্ষে অন্ধ হয়ে গেছে।
মানুষ তার প্রশ্নকে আরও জোরালো করে—“وَقَدْ كُنتُ بَصِيرًا”—আমি তো দেখতাম! এই বক্তব্যের মধ্যে এক ধরনের আত্মপ্রবঞ্চনা প্রকাশ পায়। সে দুনিয়ায় চোখে দেখত, চারপাশের জিনিস বুঝত, নিজেকে সচেতন মনে করত—কিন্তু আসল প্রশ্ন হলো, সে কি সত্যকে দেখেছিল?
কুরআনের ভাষায় “দেখা” শুধু চোখের দৃষ্টি নয়; বরং অন্তরের উপলব্ধি। মানুষ অনেক কিছুই দেখে, কিন্তু সবকিছু বোঝে না। সে সত্যের সামনে থেকেও তা অস্বীকার করতে পারে, উপেক্ষা করতে পারে, কিংবা গুরুত্বহীন মনে করতে পারে। তখন তার বাহ্যিক দৃষ্টি থাকলেও, অভ্যন্তরীণ দৃষ্টি অন্ধ হয়ে যায়।
এই আয়াতটি সেই বিভ্রান্তিকে উন্মোচন করে। মানুষ দুনিয়ায় নিজের অবস্থাকে সঠিক মনে করত, ভাবত সে ঠিকই চলছে। কিন্তু আখিরাতে এসে সে বুঝতে পারে—সে আসলে ভুল ছিল। তার “দেখা” ছিল সীমাবদ্ধ, বিকৃত, কিংবা ইচ্ছাকৃতভাবে উপেক্ষিত।
এই প্রশ্নের মধ্যে একটি গভীর শিক্ষা আছে—মানুষ অনেক সময় নিজের অবস্থাকে সঠিক মনে করে, অথচ বাস্তবে সে পথভ্রষ্ট হতে পারে। দুনিয়ার জীবন তাকে একটি ভ্রান্ত আত্মবিশ্বাস দেয়, যা আখিরাতে গিয়ে ভেঙে পড়ে।
এই আয়াত আমাদেরকে সেই আত্মপ্রবঞ্চনা থেকে সতর্ক করে। আমরা কি সত্যিই “দেখছি”, নাকি শুধু চোখ দিয়ে দেখার ভান করছি? আমরা কি আল্লাহর আয়াতগুলোকে উপলব্ধি করছি, নাকি সেগুলো আমাদের জীবনে কোনো প্রভাব ফেলছে না?
এই আয়াত মানুষের আত্মসমালোচনার একটি চূড়ান্ত মুহূর্তকে সামনে আনে। যখন আর কোনো অজুহাত কাজ করে না, তখন মানুষ নিজের অবস্থার ব্যাখ্যা খোঁজে। কিন্তু তখন সময় পেরিয়ে গেছে। এটি আমাদের শেখায়—বাস্তবতা বোঝার জন্য আখিরাত পর্যন্ত অপেক্ষা করা বুদ্ধিমানের কাজ নয়; বরং দুনিয়াতেই সত্যকে উপলব্ধি করতে হবে।
এটি আরও স্পষ্ট করে যে, দুনিয়ার দৃষ্টি যদি সত্যের সাথে সংযুক্ত না হয়, তাহলে তা কোনো কাজে আসে না। প্রকৃত দৃষ্টি হলো সেই দৃষ্টি, যা আল্লাহর হিদায়াতকে গ্রহণ করে।
২০:১২৪ — যিকর থেকে মুখ ফিরানোর ফল
২০:১২৬ — কেন অন্ধ করা হলো তার উত্তর
৪৩:৩৬ — যিকর থেকে গাফিল হলে শয়তান সঙ্গী হয়
৪৩:৩৭ — পথভ্রষ্ট হয়েও নিজেকে সঠিক মনে করা
আমাদের উচিত নিজেদের “দেখা” নিয়ে প্রশ্ন করা—আমরা কি সত্যিই বুঝে দেখছি, নাকি শুধু বাহ্যিকভাবে দেখছি? কুরআনের সাথে সম্পর্ককে গভীর করতে হবে, যাতে আমাদের অন্তরের দৃষ্টি জাগ্রত হয়। আখিরাতের আগে দুনিয়াতেই নিজের অবস্থান যাচাই করা জরুরি, কারণ সেখানে প্রশ্ন থাকবে, কিন্তু সুযোগ থাকবে না।
