• শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:০৭ অপরাহ্ন

কুরআনের কন্ঠে সালাম

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ৩২৬ Time View
Update : শনিবার, ৭ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ

{প্রথম ভাগ}

“কুরআনের আলোয় সালামের বিধি-বিধান”

একদিন বিকেলে, জামেয়া মসজিদের বারান্দায় বসে ছিলেন মাওলানা রফিকুল ইসলাম। কিছু ছাত্র তাকে ঘিরে রেখেছে। তাদের চোখে আগ্রহ, কিন্তু কানে শোনা কথাগুলো অনেকের কাছে নতুন।

তাদের মধ্যে একজন ছাত্র দাঁড়িয়ে জিজ্ঞেস করলো—
—“হুজুর, আমাদের গ্রামের হুজুররা বলেন, সালামের নিয়ম-কানুন হাদিস থেকে শিখতে হবে, আপনার মতো শুধু কুরআন থেকে নিলে হবে না। আপনি কেন বারবার বলেন যে কুরআন থেকেই সবকিছু শিখতে হবে? সালামের বিষয়টা তো খুব ছোট!”

রফিকুল ইসলাম গভীর নিশ্বাস ফেললেন। তার গাল বেয়ে লম্বা দাড়িগুলো যেন কেঁদে উঠলো, চোখের কোণ ভিজে উঠলো। তিনি বললেন— “বাবা, বিষয়টা ছোট নয়। সালাম হলো ইসলামের সবচেয়ে বড় সামাজিক চুক্তি। এটি শান্তি ছড়ায়, মনের হিংসা দূর করে, সম্পর্ক মজবুত করে। এজন্য এর শিকড় কোথায় গেঁথে আছে, সেটা জানা জরুরি।

রফিকুলঃ আমি তোমাদের একটি কথা বলি— কোনো এক রাতে, আমার ঘুম ভেঙে গিয়েছিল। মনে হচ্ছিল, কেউ যেন বলছে,
‘হে রফিকুল ইসলাম! তুমি কি কুরআনের দিকে ডাকছো, নাকি অন্য কোন কিছুর দিকে?’
সেই থেকে আমি প্রতিজ্ঞা করেছি, যা-ই শিখি, কুরআন থেকেই শিখব।”

তিনি আলতো করে নিজের পকেট থেকে কুরআন বের করলেন। তারপর তিনি ধীরে ধীরে পড়তে লাগলেন, যেন আকাশ থেকে কোনো বারতা টেনে আনছেন—
কুরআনের প্রথম দাওয়াত

“وَهَٰذَا كِتَٰبٌ أَنزَلْنَٰهُ مُبَارَكٌ فَٱتَّبِعُوهُ وَٱتَّقُوا۟ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ

আর এ কিতাব যা আমি অবতীর্ণ করলাম, তা বরকতময়; তোমরা তা মান্য করো, আল্লাহকে ভয় করো, যাতে তাঁর দয়া তোমাদের ওপর বর্ষিত হয়।” (সুরা আনআম ৬ঃ১৫৫)

তিনি বললেন— “দেখো বাবা, আল্লাহ বললেন এই কিতাব ‘মুবারাক’, অর্থাৎ বরকতময়, সমৃদ্ধ, পূর্ণাঙ্গ। আর আমাদের বলা হলো — এটাকে অনুসরণ করো, যাতে রহমত পাওয়া যায়। তাহলে এখন তোমরাই বলো, আমরা যদি সালামের নিয়ম অন্য কোথাও থেকে নেই, তাহলে কুরআনের এই নির্দেশের মানে কি হলো?”

সালামের মূল সোপান
ছাত্রদের চোখে বিস্ময়। রফিকুল ইসলাম আবার বললেন— “আরেকটা আয়াত শোনো, যা আমাকে বারবার কাঁদিয়ে ফেলে।

أَلَمْ تَرَ إِلَى ٱلَّذِينَ أُوتُوا۟ نَصِيبًا مِّنَ ٱلْكِتَٰبِ يُدْعَوْنَ إِلَىٰ كِتَٰبِ ٱللَّهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ يَتَوَلَّىٰ فَرِيقٌ مِّنْهُمْ وَهُم مُّعْرِضُونَ


“তুমি কি তাদেরকে দেখনি! যাদেরকে কিতাবের কিছু অংশ দেওয়া হয়েছিল? তাদেরকে ডাকা হয়েছিল আল্লাহর কিতাবের দিকে, যাতে তা তাদের মধ্যে মীমাংসা করে। কিন্তু তাদের একদল মুখ ফিরিয়ে নিল।” (আলে ইমরান ৩ঃ২৩)

বলতো আমার সোনামনিরা, আজ যারা বলে — ‘সালামের রীতি কুরআনে নেই, এটা হাদিস থেকে নিতে হবে’ — তারা কি এই আয়াতের আলোকে ভেবে দেখে না? যে আল্লাহ তার কিতাবের দিকে ডাকছেন, আর তারা কিতাব ছেড়ে অন্যদিকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে?”

আলী (রাঃ)-এর শপথ
রফিকুল ইসলাম এবার চোখ বন্ধ করে কিছুক্ষণ মধুর কণ্ঠে আরবি পড়লেন। তারপর বললেন— “সহীহ বুখারীর হাদিসে আলী (রাঃ)-কে জিজ্ঞেস করা হয়েছিল—

আপনাদের কাছে কুরআন ছাড়া আর কোনো লিখিত কিতাব আছে কি?’ তিনি বললেন— ‘আল্লাহর কসম! না। আল্লাহর কিতাব ব্যাতিত আমাদের নিকট আর কোন কিছুই লিখিত নেই।” (সহীহ বুখারীর হাঃ ১১১)

তিনি থামলেন। তার কণ্ঠে একটা কম্পন দেখা দিল। চোখ থেকে কয়েকফোঁটা অশ্রু ঝরল। তিনি বললেন— “দেখো, আলী (রাঃ) কত স্পষ্ট করে বললেন, কুরআনই একমাত্র মাপকাঠি। তবে আমরা কুরআন বাদে আর কোথায় খুজবো?

সালামের রীতি, শব্দ, মেজাজ — সবকিছু প্রথমে কুরআন থেকে নির্ধারিত হবে। তারপর যদি কোনো হাদিস কুরআনের সাথে মিলে যায়, তখন আমরা বলব হ্যাঁ, এটাই ঠিক। কিন্তু মূল হবে কুরআন।”

রাসুল (সা.)-এর দায়িত্ব কী?
এক ছাত্র এবার আরেকটা প্রশ্ন করলো— “হুজুর, তাহলে নবী কি শুধু কুরআনের বাণী পৌঁছে দিতেন? তিনি কি নিজের থেকে কোনো নতুন বিধান প্রণয়ন করতেন না?

মাওলানা রফিকুল ইসলাম গভীর এক হাসি দিলেন। তার চোখের কোণজুড়ে আনন্দের জল। তিনি বললেন— “আল্লাহর বার্তাবাহক সালামুন আলা মুহাম্মাদ একমাত্র কুরআনের মুবাল্লিগ ছিলেন। তিনি তার নিজের দায়িত্ব নিয়ে কুরআনেই বলছেন—

يَـٰٓأَيُّهَا ٱلرَّسُولُ بَلِّغْ مَآ أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَ


‘হে রাসুল! আপনার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যা নাজিল করা হয়েছে, আপনি শুধু তাই পৌঁছে দিন। (সুরা মায়েরা ৫ঃ৬৭)  আরো দেখো—

إِنْ أَتَّبِعُ إِلَّا مَا يُوحَىٰ إِلَيَّ

আমি তো শুধু সেই ওহীরই অনুসরণ করি, যা আমার প্রতি নাজিল করা হয়েছে।’ (সুরা আনআম ৬ঃ৫০)

তাহলে বলো তো, নবীকি নিজের থেকে কিছু প্রচার করতেন? না, তিনি কেবল ওহীর অনুসারী ছিলেন। তাঁর উপর নির্দেশ ছিল কুরআন পৌঁছে দেওয়া। সুতরাং সালামের বিধিবিধানও তিনিই কুরআন থেকে শিক্ষা দিয়েছেন।”
সালাম মানে শান্তি। যে আল্লাহর কিতাব থেকে শিখে সালাম করবে, তার মুখের সালামও হবে বরকতময়। ‘যে অন্যখান থেকে শিখে, তার মুখের সালাম হবে কেবল ঠোঁটের বুলি। তাতে হৃদয় থাকবে না, আল্লাহর বরকতও থাকবে না।” তারপর তিনি হাত তুললেন।

সন্ধ্যার আকাশে মাগরিবের আযান ভেসে এলো। ছাত্ররা একে একে উঠে দাঁড়াল। রফিকুল ইসলামের দিকে তাকিয়ে বললো— “হুজুর, আমরা প্রতিজ্ঞা করছি, সালামের বিধান, এমনকি সব বিধান প্রথমে কুরআন থেকে জানব। তারপরই অন্য কোথাও তাকাব।”


{দ্বিতীয় ভাগ}

“কোন সালাম? কুরআনের, না মানুষের বানানো?”

মাওলানা রফিকুল ইসলামের চোখে আজ একটু ক্লান্তির ছাপ। মসজিদের বারান্দায় ভাঙাচোরা প্লাস্টিকের চেয়ারে হেলান দিয়ে বসে ছিলেন তিনি।
মাগরিবের পর দুই তরুণ ছেলে ছুটে এলো তার কাছে। তাদের চেহারায় উদ্বেগ, চোখে কিছুটা দ্বিধা।

— “হুজুর, সালামুন আলাইকুম। আজকে আমাদের এক বন্ধুর সাথে তর্ক হলো। সে বলছে, ‘সালামুন আলাইকুম’ না বলে ‘আসসালামু আলাইকুম’ বলা উচিত। আবার কেউ বলছে, আসসালামু আলাইকুম না বলে সালামুন আলাইকুম বলো। আসলে কোনটা ঠিক? ইসলাম আমাদের কোনটা শিখিয়েছে?”

রফিকুল ইসলাম মৃদু হেসে বললেন— “ও আল্লাহ! মানুষ যে কী নিয়ে বিতর্কে যায়। যেখানে স্রোত বইছে শান্তির দিকে, মানুষ সেখানে পাথর ফেলে ফেলে ঢেউ তুলতে চায়। ঠিক আছে বাবারা এসো, তোমাদের কুরআনের আলোকে শোনাই, সালামের মর্মকথা।”

সালামের ভাষা ও অর্থ
“দেখো বাবারা, ‘সালাম’ অর্থ শান্তি। সুতরাং যখন আমরা বলি ‘সালামুন আলাইকুম’, তখন তার মানে হয় — “তোমার ওপর শান্তি বর্ষিত হোক।”
ঠিক একই অর্থ হয় যখন বলি ‘আসসালামু আলাইকুম’। কারণ ‘আসসালামু’ মানে একইভাবে সেই শান্তি, কেবল আরবি ব্যাকরণে সামান্য পার্থক্য। যেমন,

  • ‘সালামুন’ শব্দটি নাকিরা (indefinite)।
  • ‘আসসালামু’ আলিফ-লাম (definite article) দ্বারা চিহ্নিত, অর্থাৎ বিশেষ সেই শান্তি।
    অর্থাৎ, দুটোতেই শান্তির কামনা। তুমি বলছ — ‘আমি তোমার জন্য শান্তি প্রার্থনা করছি।’”

“কিন্তু বাবারা তোমরা যদি প্রশ্ন করো, দুটোর মধ্যে  কোনটা উত্তম? আমি নিঃসংকোচে বলব — যা আল্লাহ আমাদের শিখিয়েছেন, সেটাই উত্তম। কারণ আল্লাহ নিজেই বলেছেন—

تِلْكَ ءَايَٰتُ ٱللَّهِ نَتْلُوهَا عَلَيْكَ بِٱلْحَقِّۖ فَبِأَىِّ حَدِيثٍۭ بَعْدَ ٱللَّهِ وَءَايَٰتِهِۦ يُؤْمِنُونَ

এগুলো আল্লাহর আয়াত, আমি তা যথাযথভাবে তোমার কাছে তিলাওয়াত করছি। তাহলে তারা আল্লাহ ও তাঁর আয়াতের পর আর কোন হাদিসে বিশ্বাস করবে?” (সুরা জাসিয়া ৪৫ঃ৬)

দেখলে! আল্লাহ আমাদের তাঁর কিতাবই দিচ্ছেন মানদণ্ড হিসেবে। তিনি অন্য কোন হাদিস বিশ্বাস করতে নিষেধ করছেন। তাহলে আমরা কিভাবে কুরআনের বাইরে থেকে নিব? বাবারা এজন্য আমাদের উচিৎ হবে কোরান থেকে সালামের পদ্ধতি নেয়া।”

সালামুন আলা মুহাম্মাদের সালামঃ
রফিকুল ইসলাম একটু থামলেন। তারপর তাসবিটি ডানহাত থেকে বাঁহাতে সরিয়ে বললেন— তোমরা কি সালামুন আলা মুহাম্মাদ এর খুতবা শোনোনি? তিনি মিম্বরে দাঁড়িয়ে বলতেন —

إِنَّ أَصْدَقَ الْحَدِيثِ كِتَابُ اللَّهِ

“নিশ্চয় সবচেয়ে সত্য বক্তব্য হলো আল্লাহর কিতাব।’ (সুদানে নাসার হাঃ ১৫৭৮)
তাহলে দেখ! সালামুন আলা মুহাম্মাদ নিজেই বলতেন যে, কুরআনই সর্বাধিক সত্য, একমাত্র সত্য। সুতরাং তোমরা যদি জানতে চাও, সত্য সালাম কোনটি? তাহলে জেনে রাখ কুরআনের সালামই সত্য।”

কুরআনের সালামের রূপ
তিনি এবার বুকের পার্শবর্তী পকেট থেকে এক ক্ষুদ্র কুরআন বের করলেন। তাদের হাতেল দিলেন খুলে পড়তে। সেখানে এই আয়াতটি পড়তে বললেন—

فَإِذَا دَخَلْتُم بُيُوتًا فَسَلِّمُوا۟ عَلَىٰٓ أَنفُسِكُمْ تَحِيَّةً مِّنْ عِندِ ٱللَّهِ مُبَٰرَكَةً طَيِّبَةًۚ كَذَٰلِكَ يُبَيِّنُ ٱللَّهُ لَكُمُ ٱلْءَايَٰتِ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ

“যখন তোমরা কোনো ঘরে প্রবেশ করবে তখন তোমরা নিজদের উপর সালাম করবে, এটি আল্লাহর পক্ষ থেকে একটি পবিত্র, বরকতময় অভিবাদন।” (সুরা নুর ২৪ঃ৬১)

রফিকুল ইসলাম বললেন— “আল্লাহ সালামকে স্বয়ং বলেছেন — ‘তাহিয়্যাতুম মিন’ ইন্দিল্লাহি মুবারাকাতান তায়্যিবাতান’ অর্থাৎ পবিত্র ও বরকতময় অভিবাদন।
তাহলে বলো তো, এই সালামের শব্দ কারা তৈরি করেছে? মানুষ? না, আল্লাহ?”

তারা অবাক হয়ে বলল— “আল্লাহইতো শিখিয়েছেন।”
রফিকুল ইসলাম হেসে বললেন— “ঠিক বলেছ। তাহলে মানুষ কেন আলাদা আলাদা মডেল বানাবে? কখনো বলবে ‘সালামুন আলাইকুম’ ঠিক না, ‘আসসালামু আলাইকুম’ ঠিক। আবার কখনো বলবে না, এভাবে বলো,  ওভাবে বলো। সবই তো শান্তির ভাষা। তবে উত্তম তো সেটাই, যেটা কুরআন ও রাসুল (সা.) আমাদের শিখিয়েছেন।”

মাওলানার ব্যথা
তার চোখে জল চলে এলো। তিনি বললেন— “আমি তো এভাবে চিন্তা করি বাবা। কুরআন থেকে দূরে গিয়ে যারা নিজেদের ভাষা দাঁড় করায়, তারা নিজেরাই নিজেদের মধ্যে বিরোধ সৃষ্টি করে।

এক দল বলে — ‘এভাবে বলবে।’ অন্য দল বলে — ‘ওভাবে বলবে।’ আল্লাহর কিতাব যদি আমাদের মূল হতো, তাহলে কারো মুখে এসব শোনা যেত না।
কারণ কুরআনের সালাম, কুরআনের শব্দ, কুরআনের অর্থে কোনো বিভ্রান্তি নেই। যা কিছু বিভ্রান্তি, সব কুরআন বাদ দিয়ে মানুষ যখন নতুন নতুন কথায় যায়, তখনই হয়।”

এক ছাত্রের প্রতিজ্ঞা
‘ছেলেগুলো চুপ করে শুনছিল। একজনের চোখে জল টলমল করে উঠল। ‘সে বলল— “হুজুর, আমরা আর এ নিয়ে তর্ক করবো না। আমরা শুধু কুরআন থেকে শিখবো। আপনার কাছ থেকে শিখব — কিভাবে সালাম করতে হয়, কিভাবে দাঁড়াতে হয়, কিভাবে হাসতে হয়, সবই কুরআনের আলোয়।”

রফিকুল ইসলাম তাকে বুকে টেনে নিলেন। তার চোখের পানি সেই ছেলের কাঁধে ঝরতে লাগল। তিনি ফিসফিস করে বললেন—

“হে আমার ছেলেরা, এটাই তো আমার স্বপ্ন। তোমরা যেন কুরআনের বান্দা হও, হাদিসের সত্য দিকের অনুসারী হও, কোনো মিথ্যা রেওয়ায়েতের নয়। যেন তোমাদের সালাম, তোমাদের মুচকি হাসিও হয় আল্লাহর বরকতপূর্ণ কালাম দিয়ে।


{তৃতীয় ভাগ}

“সালামের আসল রূপ — কুরআনের সালাম”

মাওলানা রফিকুল ইসলামের চোখে সেইদিন যেন অন্যরকম দীপ্তি ছিল। তার দাড়ি ভিজে গিয়েছিল অশ্রুতে। তিনি বারবার চেয়ে থাকছিলেন মসজিদের শানবাঁধানো বারান্দার দিকে। সেখানে দাঁড়িয়ে কিছু মানুষ হাত উঁচু করে তর্ক করছিল।
তাদের মুখে ছিল কঠিন যুক্তি, দল-মতের বর্মে মোড়াণো কথার বাণ। কেউ বলছে — “আসসালামু আলাইকুম বলাই সুন্নাত।” কেউ বলছে — “না, সালামুন আলাইকুম বলবে, তাতেই কুরআনের নির্দেশ এটাই সুন্নত।”

রফিকুল ইসলাম ধীরে ধীরে সেই দিকে এগিয়ে গেলেন। তিনি কাঁপা গলায় বললেন— “তোমরা কি জানতে চাও, আল্লাহ তায়ালা আমাদের কোন সালাম শিখিয়েছেন?
তাহলে এসো, কুরআনের কাছে যাই। আসো, আল্লাহর মুখ থেকে শুনি সেই পবিত্র ও বরকতপূর্ণ অভিবাদনের ভাষা।”

প্রথম আয়াত : মুমিনদের সাথে সালাম
তিনি কুরআন খুলে একটি জায়গা চিহ্ন ধরে বললেন— “আল্লাহ বলেন—

وَإِذَا جَآءَكَ ٱلَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِـَٔايَٰتِنَا فَقُلْ سَلَٰمٌ عَلَيْكُمْۖ

“আর যারা আমার আয়াতসমূহের উপর ঈমান আনে, তারা যখন তোমার কাছে আসে, তখন তুমি বল, সালামুন আলাইকুম (তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক।” (সুরা আনআম ৬ঃ৫৪)
তাহলে বলো, মুমিনদের জন্য সালামের পবিত্র শব্দ কোনটি? নিজের মুখে বলো।” লোকগুলো তখন ধীরে ধীরে বললো— “সালামুন আলাইকুম।”

রফিকুল ইসলাম বললেন— দেখো, যারা কুরআনের আয়াতে ঈমান আনে, তাদের জন্য সালামের বাক্য আল্লাহ নিজেই শিখিয়েছেন। সুতরাং তুমি হানাফি হও, শাফেয়ি হও, আহলে হাদিস হও, শিয়া হও, সুন্নি হও — তোমার সালাম আল্লাহর শিখানো হোক। কারণ তিনিই সর্বশ্রেষ্ঠ শিক্ষক।”

দ্বিতীয় আয়াত : ফেরেশতাদের সালাম
“ফেরেশতারা যখন পবিত্র অবস্থায় মৃত্যুবরণকারীদের জান্নাতে ডাকবে তখন কী বলবে? আল্লাহ বলেন—

ٱلَّذِينَ تَتَوَفَّىٰهُمُ ٱلْمَلَٰٓئِكَةُ طَيِّبِينَۙ يَقُولُونَ سَلَٰمٌ عَلَيْكُمُ ٱدْخُلُوا۟ ٱلْجَنَّةَ بِمَا كُنتُمْ تَعْمَلُونَ

“ফেরেশতা যাদের মৃত্যু ঘটায় পবিত্র অবস্থায়, তারা বলবে — সালামুন আলাইকুম, তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক। তোমরা জান্নাতে প্রবেশ কর, তোমরা যেসব কাজ করেছিলে তার ফলস্বরূপ।’ (সুরা নাহল ১৬ঃ৩২)

মাওলানা রফিকুল ইসলাম বললেন, তোমরা কি দেখছো? জান্নাতের রাস্তায় ফেরেশতারাও বলছে সালামুন আলাইকুম। তাহলে এটাই কি আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য অভিবাদন নয়?”

তৃতীয় আয়াত : জান্নাতের দরজায় সালাম
তিনি এবার খুবই মধুর কণ্ঠে একটি আয়াত তিলাওয়াত করলেন। তার গলার কম্পন যেন মসজিদের দেয়ালে দেয়ালে প্রতিধ্বনি তুললো।

وَسِيۡقَ الَّذِيۡنَ اتَّقَوۡا رَبَّهُمۡ اِلَى الۡجَـنَّةِ زُمَرًاؕ حَتّٰٓى اِذَا جَآءُوۡهَا وَفُتِحَتۡ اَبۡوَابُهَا وَقَالَ لَهُمۡ فَادۡخُلُوۡهَا خٰلِدِيۡنَ‏

“আর যারা তাদের রবকে ভয় করেছে, তাদেরকে দলে দলে জান্নাতের দিকে নিয়ে যাওয়া হবে। অবশেষে যখন তারা সেখানে পৌঁছাবে, এবং দরজাগুলো খুলে দেওয়া হবে, তখন জান্নাতের রক্ষীরা বলবে — সালামুন আলাইকুম তিবতুম, তোমাদের উপর শান্তি বর্ষিত হোক, তোমরা ভাল ছিলে, সুতরাং এখানে স্থায়ীভাবে প্রবেশ করো।” (সুরা যুমার ৩৯ঃ৭৩)

তিনি আবেগে বললেন— “এই সালাম তো জান্নাতের অভ্যর্থনা। সুতরাং আমাদের সালামও সেই জান্নাতের সালামের মতো হওয়া উচিত। ‘সালামুন আলাইকুম’ — এটাই কুরআনের স্বরলিপি।”

ইবরাহীম (আ.)-এর সালাম
তারপর তিনি বললেন— “ইবরাহীম (আ.) তার পিতা আজরকে কী বলেছিলেন জানো?

قَالَ سَلَٰمٌ عَلَيْكَۖ سَأَسْتَغْفِرُ لَكَ رَبِّىٓۖ إِنَّهُۥ كَانَ بِى حَفِيًّا

“ইবরাহীম বললেন — সালামুন আলাইকা (তোমার উপর শান্তি বর্ষিত হোক)। আমি আমার রবের কাছে তোমার জন্য ক্ষমা চাইব।” (সুরা মারিয়াম ১৯ঃ৪৭)

মাওলানা রফিকুল ইসলাম বললেন, তোমারা আয়াতের দিকে খেয়াল কর, এখানেও সেই একই শব্দ — সালামুন আলাইকা। সুতরাং নবীদের সালাম, জান্নাতের সালাম, ফেরেশতার সালাম, মুমিনদের সালাম — সব একই। ‘সালামুন আলাইকুম’।”

আরাফের সালাম
রফিকুল ইসলাম এবার বললেন— “আরাফের অধিবাসীরা জান্নাতবাসীদের দিকে ডাক দিয়ে কী বলবে তা কি জান?

وَنَادَوْا۟ أَصْحَٰبَ ٱلْجَنَّةِ أَن سَلَٰمٌ عَلَيْكُمْۚ

“তারা জান্নাতবাসীদেরকে ডেকে বলবে — সালামুন আলাইকুম।” (সুরা আরাফ ৭ঃ৪৬)

ফেরেশতারা দরজায় দরজায় সালাম দেবে
মাওলানা রফিকুল ইসলামের চোখ ভিজে এলো। তিনি বললেন— “আল্লাহ জান্নাতের দৃশ্য বর্ণনা করে বলছেন—

جَنّٰتُ عَدۡنٍ يَّدۡخُلُوۡنَهَا وَمَنۡ صَلَحَ مِنۡ اٰبَآٮِٕهِمۡ وَاَزۡوَاجِهِمۡ وَذُرِّيّٰتِهِمۡ وَالۡمَلٰٓٮِٕكَةُ يَدۡخُلُوۡنَ عَلَيۡهِمۡ مِّنۡ كُلِّ بَابٍۚ‏ — سَلٰمٌ عَلَيۡكُمۡ بِمَا صَبَرۡتُمۡ فَنِعۡمَ عُقۡبَى الدَّارِؕ‏

চিরস্থায়ী বসবাসের জান্নাত— যাতে তারা প্রবেশ করবে,
তাদের পিতা-মাতা, স্ত্রী ও সন্তানদের মধ্যে যারা সৎকর্মশীল — তাদেরসহ। আর ফেরেশতারা প্রত্যেক দরজা দিয়ে তাদের কাছে প্রবেশ করবে।

(এবং বলবে:) “সালামুন আলাইকুম” তোমরা ধৈর্য ধারণ করেছিলে— এর প্রতিদান হিসেবে (তোমাদের প্রতি শান্তি)। অতএব পরকালের এই আবাস কতই না উত্তম!” (সুরা রাদ ১৩ঃ২৩-২৪)

দেখো কত সুন্দর অভিবাদন! এমনকি আল্লাহ নিজেও জান্নাতবাসীদের বলবেন—

سَلَٰمٌ قَوْلًا مِّن رَّبٍّ رَّحِيمٍ

“দয়াময় প্রতিপালকের পক্ষ থেকে তাদের বলা হবে সালাম। (সুরা ইয়াসিন ৩৬ঃ৫৮)

তাহলে আমাদের মুখেও সেই সালামই উচ্চারিত হওয়া উচিত নয় কি? যে সালাম আল্লাহ শিখালেন?”

নিরর্থক কথার মাঝে সালাম
তিনি বললেন— “মুমিনরা যখন কোন অজ্ঞ লোকের থেকে নিরর্থক বাক্য শুনে, তখন তারা বিতর্কে না জড়িয় সালাম দিয়ে সরে যায়-

وَإِذَا سَمِعُوا۟ ٱللَّغْوَ أَعْرَضُوا۟ عَنْهُ وَقَالُوا۟ لَنَآ أَعْمَـٰلُنَا وَلَكُمْ أَعْمَـٰلُكُمْ سَلَـٰمٌ عَلَيْكُمْ لَا نَبْتَغِى ٱلْجَـٰهِلِينَ

আর যখন তারা অর্থহীন ও অসার কথা শোনে, তখন তারা তাথেকে মুখ ফিরিয়ে নেয় এবং বলে— “আমাদের জন্য আমাদের কাজ, আর তোমাদের জন্য তোমাদের কাজ। সালামুন আলাইকুম (তোমাদের প্রতি শান্তি)।
আমরা অজ্ঞদের সঙ্গ কামনা করি না।” (সুরা কাসাস ২৮ঃ৫৫)

“দেখো, এখানেও সেই একই সালাম, শান্তির সালাম, বিতর্কহীন। এরপরেও কি সালামের ভাষা কুরআনের  বদলে অন্য কিছু দিয়ে বানাতে চাও?”

সকল দলমতের উর্ধ্বে কুরআনের সালাম
তিনি একটু জোরে বললেন— “হানাফি, শাফেয়ি, মালেকি, হাম্বলি, আহলে হাদিস, শিয়া, সুন্নি — তোমরা যা খুশি হও। কিন্তু একবার কুরআনকে জিজ্ঞেস করো, হে কুরআন! আমাদের সালাম কোনটি? তখন কুরআন বলবে — ‘সালামুন আলাইকুম’। এটাই ফেরেশতার সালাম, নবীর সালাম, জান্নাতের সালাম, আল্লাহর সালাম, বান্দার সালাম।”

ইতিহাসের সাক্ষী
তিনি বললেন— “মুসলিম শরীফ, তিরমিজি শরিফ, ইমাম হোসাইন (রাঃ)-এর সালাম — সবখানেই দেখতে পাবে  ‘সালামুন আলাইকুম’ বা ‘সালামুন আলাইকা’।
ইমাম হোসাইন (রাঃ) কুফাবাসীকে বলেছিলেন — ‘সালামুন আলাইকুম।’ সুতরাং তোমরা কি এবার ইতিহাসকেও অস্বীকার করবে?”

তার চোখ বেয়ে অশ্রু গড়িয়ে পড়লো। তিনি বললেন— “আমার প্রিয় সন্তানেরা, সালাম এমন একটি অভিবাদন, যা কেবল মুখের কথা নয়, এটি জান্নাতের দাওয়াত, আল্লাহর দেয়া শান্তির বার্তা।


{চতুর্থ ভাগ}

“সালামের উত্তম জবাব — আল্লাহ যেভাবে শিখিয়েছেন”

মাওলানা রফিকুল ইসলাম সেইদিন সকালেই মসজিদে এসে বসে পড়েছিলেন। চারপাশে একে একে তার ছাত্র, আশপাশের গ্রাম থেকে আসা লোকজন, এমনকি বাজারের দোকানদার পর্যন্ত বসে পড়লো। মাওলানা সাহেব বললেন, তোমরা কি আমাকে কিছু বলতে চাও?

পিছন থেকে হাশেম নামের একটি ছেলে, হাত তুলল। সে ভয়ে ভয়ে বললো— “মাওলানা সাহেব, আমরা তো কেউ সালাম দিলে ‘ওয়া আলাইকুম সালাম বলি’। গতকাল এক ভাই কুরআনের আলোকে সালামুন আলাইকুম বলেছে, কিন্তু আমি এর কোন জবাব দিতে পারিনাই। আপনি বিষয়টি জানালে আমরা উপকৃত হব।”

রফিকুল ইসলাম মুচকি হাসলেন। তার চোখে যেন হাশেমের জন্য অফুরন্ত মায়া ঝরে পড়লো। তিনি হাত তুলে বললেন— “তুমি খুব সুন্দর প্রশ্ন করেছো হাশেম।
আসো, আল্লাহর কাছে থেকে উত্তর শুনি। দেখো, আমাদের সালামের উত্তর কেমন হওয়া উচিত — তা আল্লাহ তায়ালা খুব স্পষ্ট করে আমাদের শিখিয়ে দিয়েছেন।”

সালামের উত্তর কিভাবে দিতে হবে?

তিনি ধীরে ধীরে তিলাওয়াত করলেন সেই আয়াত। তার গলার সুমিষ্ট তিলাওয়াতে মসজিদের ভেতর যেন কাঁপতে লাগলো।

وَإِذَا حُيِّيتُم بِتَحِيَّةٍ فَحَيُّوا۟ بِأَحْسَنَ مِنْهَآ أَوْ رُدُّوهَآۗ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَلَىٰ كُلِّ شَىْءٍ حَسِيبًا

“আর যখন তোমাদেরকে সালাম (অভিবাদন) দেওয়া হবে, তখন তোমরা তার চেয়ে উত্তম সালাম দেবে, অথবা সেই সালামের সমান জবাব দেবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ সব বিষয়ে হিসাব রাখেন। (সুরা নিসা ৪ঃ৮৬)

তিনি আরো বললেন— “এই আয়াতের মাধ্যমে আমাদের তিনটি শিক্ষা হলো—
১. কেউ তোমাকে সালাম দিলে তুমি চাইলে তার চেয়ে উত্তম উত্তর দিতে পারো।
২. না পারলে অন্তত সেই একই বাক্য ফিরিয়ে দাও।
৩. এবং মনে রেখো, আল্লাহ তোমার প্রতিটি উত্তরের হিসাব নেবেন।”

উত্তম উত্তর কেমন হবে?
এক বৃদ্ধ দাঁড়িয়ে বললেন— “মাওলানা, এই ‘উত্তম’ উত্তর মানে কী? কেউ যদি আমাকে বলে ‘সালামুন আলাইকুম’, আমি কী বলবো?”
মাওলানা হেসে বললেন— “দেখো চাচা, যদি কেউ তোমাকে বলে — ‘সালামুন আলাইকুম।’ তুমি বলো — ‘সালামুন আলাইকুম তিবতুম” এইভাবে তুমি তার চেয়ে সুন্দর, দীর্ঘ ও দোয়ার পরিপূর্ণ সালাম ফিরিয়ে দিলে। এতে আল্লাহ খুশি হন। কারণ তুমি তার সালামের চেয়ে উত্তম জবাব দিয়েছো।
আর যদি তাড়াহুড়ো হয়, বা মুখে আর বাক্য না আসে, তাহলে অন্তত বলো — ‘সালামুন আলাইকুম।’ এতে তার সমান উত্তর দিয়ে দিলে।”

সালামের উত্তরেও লুকানো রহমত
তিনি আবেগে বললেন— “দেখো, সালামের জবাব কোনো সাধারণ জবাব নয়। এতে আছে আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত ও বরকতের কামনা।
যখন তুমি বলবে — ‘সালামুন আলাইকুম রহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহ” (১১ঃ৭৩) তুমি যেন তার জন্য আল্লাহর অশেষ শান্তি, রহমত ও বরকত চাচ্ছো।

ভাবো তো, কেমন মহান আমাদের এই দ্বীন? যেখানে এমন এক ছোট বাক্যে তোমার ভাইয়ের জন্য চাওয়া হয় শান্তি, দয়া ও বরকত!”

গ্রামের একজনের গল্প
রফিকুল ইসলাম গ্রামের এক কাহিনী বললেন— তোমরা কি জানো, গত বছর আব্দুল গফুর যখন মারা গেলো, তার মুখে কি ছিল? যে লোক সারাজীবন মসজিদে আসতো না, অথচ মৃত্যুর সময় তার কানে কেউ বলেছিল — ‘সালামুন আলাইকুম।’ সে শেষ নিঃশ্বাসে বলেছিল — ‘সালামুন আলাইকুম।’ সেই সালাম ছিল তার জীবনের শেষ বাক্য। তুমি জানো, আল্লাহর রহমতে হয়তো সেই ছোট বাক্যই তার জন্য পরকালে নাযাতের বড় কারণ হয়ে গেছে। কেননা, কুরআন বলেছে —

إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَلَىٰ كُلِّ شَىْءٍ حَسِيبًا

“নিশ্চয়ই আল্লাহ সব কিছুর হিসাব নেন।”

তিনি সেই উত্তরেরও হিসাব নেবেন। হয়তো মাফ করে দিবেন তার জীবনের অন্য ভুল।”

রফিকুল ইসলামের মুখে তখন কষ্টের ছাপ ফুটে উঠলো। তিনি গভীর স্বরে বললেন— “হে ছানোয়ার, সালামের উত্তর না দেয়া এক প্রকার অন্যায়ের শামিল। কেননা আল্লাহ বলেছেন — ‘তোমাদেরকে যখন সালাম দেয়া হবে তখন তার চেয়ে উত্তম উত্তর দাও অথবা সমান উত্তর দাও।’

এখন তুমি যদি চুপ করে থাকো, তুমি আল্লাহর এই আদেশ মানলে না। আর যদি তুমি মুখ ফিরিয়ে নাও, মনে রেখো — অন্তরে অহংকার নিয়ে কারো সালামের উত্তর না দিলে কেয়ামতের দিন হয়তো সেই অহংকার তোমাকে জান্নাত থেকে দূরে সরিয়ে দিবে।”

সালামের শিক্ষা — দলমতের উর্ধ্বে
মাওলানা এবার সবার দিকে তাকিয়ে বললেন— “হানাফি, শাফেয়ি, আহলে হাদিস, সুন্নি, শিয়া — সবকিছু ভুলে গিয়ে কুরআনের কাছে শিখো। কেউ তোমাকে বললো — ‘সালামুন আলাইকুম।’ তুমি বলো — ‘সালামুন আলাইকুম।’ অথবা তার চেয়ে সুন্দর — ‘সালামুন আলাইকুম তিবতুম।(৩৯ঃ৭৩)’ অথবা আরো সুন্দর — ‘সালামুন আলাইকুম রহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহ।(১১ঃ৭৩) কারণ কুরআন বলেছে —

فَحَيُّوا۟ بِأَحْسَنَ مِنْهَآ أَوْ رُدُّوهَآ

“তার চেয়ে উত্তম উত্তর দাও, অথবা সমান ফিরিয়ে দাও।”(৪ঃ৮৬)

রফিকুল ইসলাম এবার মোনাজাতের মতো হাত তুললেন। তিনি চোখ বন্ধ করে বললেন— হে আল্লাহ! আমাদের মুখে সবসময় রাখো তোমার শিখানো সালাম। আমাদেরকে এমন করে দাও, যাতে কেউ সালাম দিলে আমরা তাড়াতাড়ি উত্তম দেই।


{পঞ্চম ভাগ}

“নবী প্রতি সালাম — কিভাবে দেবো?”

সকাল সকাল মাওলানা রফিকুল ইসলাম মসজিদ প্রাঙ্গণের ছায়াতলে বসেছিলেন। হঠাৎ পেছন থেকে একদল যুবক এসে দাঁড়াল। এদের মধ্যে সবার সামনে ছিলেন যুবক হাশেম। সে বললো— “মাওলানা সাহেব! আমরা একটা কথা নিয়ে খুব দ্বিধায় পড়েছি। আপনি কি আমাদের বলবেন নবী রাসূলদের কীভাবে সালাম দিতে হবে?

তিনি বললেন— “আহারে আমার ছেলে হাশিম! তোমরা কি জানো, এই দেশে নবীদের সালাম বলার নামে কত বিভ্রান্তি ঢুকেছে?
কেউ বলে “ইয়া নাবী সালাম আলাইকা” কেউ আবার মিলাদে দাড়িয়ে হাজার কন্ঠে চিৎকার করে বলে — ‘ইয়া রাসুল সালাম আলাইকা’ আর তা দিয়েই এক নতুন ইবাদত বানিয়ে ফেলে।

কুরআনের পূর্ণতা কি নতুন কিছু সংযোজনে?
তিনি শ্বাস নিয়ে বললেন— “দেখো, আল্লাহর কুরআন পরিপূর্ণ। যা কিছু দরকার সব আল্লাহ তাতে দিয়েছেন। যেমন তিনি বলেন—

وَتَمَّتْ كَلِمَتُ رَبِّكَ صِدْقًا وَعَدْلًا ۚ لَّا مُبَدِّلَ لِكَلِمَـٰتِهِۦ ۚ وَهُوَ ٱلسَّمِيعُ ٱلْعَلِيمُ

আর তোমার রবের বাণী সত্য ও ন্যায়ের সাথে পূর্ণতা লাভ করেছে। তাঁর বাণীসমূহ পরিবর্তন করার কেউ নেই। আর তিনি সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ। (সুরা আনয়াম ৬ঃ১১৫)

“সুতরাং নতুন কিছু সংযোজনতো দুরের কথা আল্লাহর কুরআনের কোন শব্দের সামান্য পরিবর্তনও করার কারো অধীকার নেই। তুমি যদি কুরআন ছাড়া অন্য পথ ধরো, তবে যেন বলছো — আল্লাহ দীন সম্পূর্ণ করেননি, আমাদেরই এবার যোগ করতে হবে।’

কিন্তু শোনো, ইমাম মালেক বলেছিলেন— ‘যে ব্যক্তি দীনের মধ্যে নতুন কিছু সংযোজন করল আর তা ভাল মনে করল, সে মনে করল আল্লাহর রাসুল দীন প্রচারে খিয়ানত করেছেন।’ কেন? কারণ আল্লাহ তো বলে দিয়েছেন—


اَلْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِيْنَكُمْ…

“আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীন পূর্ণ করলাম,” তোমাদের প্রতি আমার অনুগ্রহ সম্পূর্ণ করলাম এবং ইসলামকে তোমাদের দীন মনোনীত করলাম।(সুরা মায়েদা ৫ঃ৩)

উমর (রাঃ)-এর ঘটনা
মাওলানা বললেন— “তোমরা শুনেছো সেই ইয়াহূদির কথা? সে একদিন উমর (রাঃ)-এর কাছে বলল — ‘আপনাদের কিতাবের এমন একটি আয়াত আছে, সেই আয়াত যদি আমাদের ওপর অবতীর্ণ হতো, আমরা সেই দিনটিকে ঈদ হিসেবে পালন করতাম।’

উমর (রাঃ) জিজ্ঞেস করলেন— ‘কোন আয়াত?’ সেই ইহুদি জবাবে বলল —
اَلْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِيْنَكُمْ…
উমর (রাঃ) হেসে বললেন — ‘আল্লাহর শপথ, আমি জানি কবে, কোন দিন, কোথায়, কখন এ আয়াত নাযিল হয়েছে। আরাফার ময়দানে, জুমার দিন বিকালে। সেদিন তো আমাদের জন্য ঈদের চেয়েও বড় আনন্দের দিন।’
সুতরাং দীন পূর্ণ, নতুন কিছু ভেবো না।”

নবীদের প্রতি সালাম কেমন হবে?
মাওলানা এবার হাতের কুরআনটা বুকের সাথে চেপে ধরলেন। তিনি বললেন— “এসো, এবার আল্লাহ আমাদের শিখিয়েছেন নবীদের কীভাবে সালাম দিতে হবে, আমরা তা কুরআন থেকে শিখি।

আল্লাহর ভাষায় নবীদের প্রতি সালাম
তার কণ্ঠ গম্ভীর হয়ে উঠলো। তিনি আয়াত পড়তে লাগলেন—

سُبْحَانَ رَبِّكَ رَبِّ الْعِزَّةِ عَمَّا يَصِفُوْنَ- وَسَلَامٌ عَلَي الْمُرْسَلِيْنَ – وَالْحَمْدُ لِلّٰهِ رَبِّ الْعٰلَمِيْنَ

“তোমার প্রতিপালক মহিমান্বিত, তারা যা বলে তা থেকে। সালাম বর্ষিত হোক রাসূলগণের প্রতি। আর সমস্ত প্রশংসা আল্লাহর।” (সুরা সাফ্ফাত ৩৭ঃ১৮০-১৮২)

سَلَٰمٌ عَلَىٰٓ إِلْ يَاسِينَ

সালামুন আলা ইলইয়াস। (সুরা সাফফাত ৩৭ঃ১৩০)

سَلَٰمٌ عَلَىٰ مُوسَىٰ وَهَٰرُونَ

মূসা ও হারূনের প্রতি সালাম। (সুরা সাফফাত ৩৭ঃ১২০)

سَلَٰمٌ عَلَىٰٓ إِبْرَٰهِيمَ

ইবরাহীমের প্রতি সালাম।’ (সুরা সাফফাত ৩৭ঃ১০৯)

وَسَلَٰمٌ عَلَى ٱلْمُرْسَلِينَ


‘সালাম সকল রাসূলদের প্রতি। (সুরা সাফফাত ৩৭ঃ১৮১)

মাওলানা রফিকুল বললেন— “দেখো, আল্লাহ যখন রাসূলদের প্রতি সালাম জানিয়েছেন, তিনি কোথাও সালামুন আলাইকুম ইয়া রাসুলুল্লাহ। বরং বলেছেন- সালামুন আলাল মুরসালিন।

তাহলে রাসূল মুহাম্মাদের নামের সময় বলবো — ‘সালামুন আলা মুহাম্মাদ।’ কারণ এভাবেই আল্লাহ আমাদের শিখিয়েছেন।”

কুরআনের শব্দ সবচেয়ে পবিত্র নয় কি?
যখন আল্লাহ নিজেই তার রাসূলগণের প্রতি সালামের সর্বোত্তম ভাষা শিখিয়েছেন। তোমরা কি মনে করো তোমার লেখা শব্দ আল্লাহর শব্দের চেয়ে পবিত্র?

আল্লাহ বলেন— ‘আজ তোমাদের জন্য তোমাদের দীন পূর্ণ করলাম।’ তাহলে আমাদের সালামও পূর্ণ। আমরা বলবো — ‘সালামুন আলা মুহাম্মাদ।’ আর এভাবে বললেই আল্লাহ সবচেয়ে খুশি হবেন। কারণ তুমি আল্লাহর শেখানো ভাষায় বলছো।”

মাওলানা বললেন— “দেখো, যদি তোমরা সত্যিই নবী সালামুন আলা মুহাম্মাদ-কে ভালোবাসো, তাহলে তার উপর এমনভাবে সালাম প্রেরণ করো, যেমনভাবে আল্লাহ শিখিয়েছেন।

এভাবে বলো — ‘সালামুন আলা মুহাম্মাদ।’ এই শব্দের ভিতরেই আছে বরকত, পবিত্রতা, আর আল্লাহর রাস্তা। কখনোই নতুন শব্দ, নতুন মিলাদ, নতুন রীতি দাঁড় করিও না। কারণ আল্লাহর দীন সম্পূর্ণ। নতুন কিছু লাগবে না।


{ষষ্ট ভাগ}

“নবী কি কুরআনের বাইরে কিছু শিখিয়েছেন?”

মাওলানা রফিকুল ইসলাম বসেছিলেন মসজিদের বারান্দায়। তাঁর সামনে শিষ্যরা সারি করে বসেছে। তাঁর হাতের মধ্যে কুরআন।

হঠাৎ নওফেল নামে এক উদ্দীপ্ত তরুণ উঠে দাঁড়ালো। তার কণ্ঠ কাঁপছিল। কাঁপা কন্ঠে বলছিলো “মাওলানা সাহেব! আমরা তো ছোটবেলা থেকে শুনে আসছি — হাদিসে রাসুল আমাদের ‘আসসালামু আলাইকুম’ শিখিয়েছেন। তাহলে আপনি বারবার কেন বলছেন ‘সালামুন আলাইকুম’?

রফিকুল ইসলাম গম্ভীর কণ্ঠে বললেন— “বাছারা, আমি তোমাদের কোনো নতুন দীন শিখাতে আসিনি। বরং সেই দীনই ফিরিয়ে দিতে চাই, যা তোমাদের রব নাযিল করেছেন। তোমরা কি সত্যিই ভাবো, আল্লাহর রাসুল কুরআনের বাইরে কিছু শিক্ষা দিয়েছেন? যদি এমনটি ভাব তাহলে তো তোমাদের ইমান নিয়ে প্রশ্ন উঠবে। আর তুমি পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে।

মাওলানা এবার কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করলেন, তার গলা যেন এক অন্যরকম কম্পন তুলছিল।

يَٰٓأَيُّهَا ٱلرَّسُولُ بَلِّغْ مَآ أُنزِلَ إِلَيْكَ مِن رَّبِّكَۖ وَإِن لَّمْ تَفْعَلْ فَمَا بَلَّغْتَ رِسَالَتَهُۥۚ وَٱللَّهُ يَعْصِمُكَ مِنَ ٱلنَّاسِۗ إِنَّ ٱللَّهَ لَا يَهْدِى ٱلْقَوْمَ ٱلْكَٰفِرِينَ

“হে রাসূল! তোমার প্রতিপালক তোমার প্রতি যা নাযিল করেছেন, শুধু তাই পৌঁছে দাও। যদি না কর, তবে তুমি তাঁর বার্তা পৌঁছানোর দায়িত্বই পালন করলে না। মানুষের অনিষ্ট থেকে আল্লাহই তোমাকে রক্ষা করবেন। (সুরা মায়েদা ৫ঃ৬৭)

মাওলানা এবার শিষ্য নওফেলের দিকে হাত তুলে বললেন— “তুমি কি বিশ্বাস করো যে, আল্লাহর রাসুল আল্লাহর কিতাব ছাড়া অন্য কিছু প্রচার করেছেন? তাহলে কেমন করে তোমার কুরআনের আয়াতের প্রতি ইমান থাকবে?

দেখো, আয়েশা (রাঃ) কী বলেছিলেন?
তিনি বলেছিলেন — ‘রাসুলুল্লাহর জীবনটাই ছিল কুরআন।’ তাহলে বলো, রাসুল কি তার জীবদ্দশায় কুরআনের বাইরে কোনো নতুন সালাম শিখিয়েছিলেন?
আর যদি এমন কোনো কথা পেয়ে যাও যা কুরআনের বিপরীত, তাহলে তা রাসুলের কথা হতে পারে না। কেউ না কেউ বানিয়ে চালিয়েছে রাসুলের নামে।”

মাওলানা সাহেব কুরআন হাতে তুলে ধরে বললেন— “সুতরাং আল্লাহর কিতাবে দেখো — মহান আল্লাহ তো তার কিতাবে কোথাও ‘আসসালামু আলাইকুম’ শব্দই ব্যবহার করেননি।

তিনি বলেছেন — ‘সালামুন আলাইকুম’, ‘সালামুন আলাল মুরসালিন’, ‘সালামুন আলা ইবরাহিম’।
তাহলে আমরা কেন মানুষের বানানো ‘আস’ যোগ করে ‘আসসালামু আলাইকুম বলব?

শোন নওফেল তুমি যদি আল্লাহর আয়াতে ইমান এনে থাক অর্থাৎ ইমানদার হয়ে থাক, তাহলে শোন আল্লাহর কিতাবের কথা —

وَإِذَا جَآءَكَ ٱلَّذِينَ يُؤْمِنُونَ بِـَٔايَٰتِنَا فَقُلْ سَلَٰمٌ عَلَيْكُمْۖ

“যারা আমার আয়াতসমূহে বিশ্বাস রাখে, তারা যখন তোমার কাছে আসে, তখন বলো — সালামুন আলাইকুম। (৬ঃ৫৪)

তুমি যদি সত্যিই আল্লাহর আয়াত মানো, তোমার ঈমানের দায়িত্ব হলো, ঠিক আল্লাহর শেখানো ভাষাতেই সালাম দেওয়া।”

হাশেম নামের এক যুবক এবার বলল— “কিন্তু মাওলানা সাহেব! আমরা তো হাদিসে পড়েছি রাসুল বলেছেন ‘আসসালামু আলাইকুম’। এখন আমরা কী করব?”

মাওলানা তার হাতের কুরআন বুকের সাথে চেপে ধরে কাঁপা কণ্ঠে বললেন— “ওহে আমার সন্তান! তুমি কি কুরআনের আয়াতের উপরে হাদিসকে বসিয়ে দিচ্ছ?
অথচ আল্লাহ তো বলেছেন—

تِلْكَ ءَايَٰتُ ٱللَّهِ نَتْلُوهَا عَلَيْكَ بِٱلْحَقِّۖ فَبِأَىِّ حَدِيثٍۭ بَعْدَ ٱللَّهِ وَءَايَٰتِهِۦ يُؤْمِنُونَ

“এগুলো আল্লাহর আয়াত, আমি যথাযথ ভাবে তোমার কাছে তিলাওয়াত করছি। তাহলে তারা আল্লাহ ও তাঁর আয়াতের পর আর কোন হাদিসে বিশ্বাস করবে? (সুরা জাসিয়া ৪৫ঃ৬)

“দেখো, যদি কোনো কথিত হাদিস কুরআনের বিপরীত হয়, তাহলে তা রাসুলের কথা হতে পারে না। রাসুল তো আল্লাহরই শিখানো শব্দ প্রচার করেছেন। তার কাছে কুরআন ছাড়া আর কিছু ছিল না।”

মাওলানার চোখ এবার অশ্রুপ্লাবিত। তিনি বললেন— “দেখো, আজ যদি কেউ বলে রাসুল কুরআনের বাইরে থেকে কিছু শিখিয়েছেন, তাহলে সে রাসুলের উপর অপবাদ দিচ্ছে। আল্লাহর কিতাব থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। আমরা কি তা করতে পারি?

না! আমরা শুধু বলবো — ‘সালামুন আলাইকুম।’ কারণ এটাই কুরআনের পবিত্রতম শব্দ।”

তখন হাশেম, নওফেল, সাইদ সবাই উঠে এসে মাওলানার হাত ছুঁয়ে বললো— “মাওলানা সাহেব, আমরা আর কোনো বানানো কথা বলব না। আমরা শুধু বলব — ‘আল্লাহর শেখানো শব্দ।’

কারণ আমরা কুরআনের উপরই ইমান রেখেছি।”
মাওলানা তাদের মাথায় হাত রাখলেন। তার ঠোঁট কাঁপতে কাঁপতে বললো— “বাছারা! কুরআনই তোমাদের রক্ষা করবে। তোমাদের সালাম পৌঁছবে আরশের কাছে। তোমাদের জন্য রহমত নামবে। সত্যিই তোমরা ভাগ্যবান, যারা আল্লাহর শব্দকেই সম্মান করো।”

{সপ্তম ভাগ}

“অপরিচিত লোকের সালাম”

গভীর দুপুর। মসজিদের সামনে হাট বসেছে। রঙিন জামা পরা নানা মানুষে ভরে গেছে চারপাশ। মাওলানা রফিকুল ইসলাম দাঁড়িয়ে ছিলেন পুকুর পাড়ে। কিছু ভিখারি তার কাছে হাত পাতছিল। তিনি তাদের সাধ্যমতো দিচ্ছিলেন।
হঠাৎ এক অপরিচিত লোক, যার মুখে খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি, চোখে সানগ্লাস, গায়ের উপর পশ্চিমা ধরনের জামা — সরাসরি মাওলানার দিকে এগিয়ে এসে বলল— “সালামুন আলাইকুম।”

মাওলানা সালামের জবাব দিলেন। তিনি লোকটিকে চেনেন না তাই অবাক হলেন। কোনোদিন  দেখেননি। চারপাশের অনেকেই কানে কানে বলছিল— “হয়তো বিধর্মী… হয়তো মুনাফিক… তার সালামের উত্তর দেয়া কি ঠিক হবে?”

তার শিষ্য হাশেম এগিয়ে এসে কানে কানে বললো—
“মাওলানা সাহেব! আমিও তাকে চিনি না। তার চেহারায় মুমিনের চিহ্ন দেখি না। তার সালামের উত্তর দিলে কি আমাদের ঈমানের ক্ষতি হবেনা?

মাওলানার চেহারায় তীব্র কষ্টের ছাঁপ ফুটে উঠলো। তিনি ধীরে ধীরে শ্বাস নিলেন, তারপর বললেন—
“ওহে হাশেম! তুমি কি নিজের মনের ভিতরে আল্লাহকে  বসিয়ে রেখেছ? নাকি তুমিই নিজেকে অন্তর্যামী মনে করছ?  তুমি কি ঐ লোকের অন্তর চিরে দেখেছো যে সে সত্যিই মুমিন নয়।”

তিনি আবেগমাখা গলায় কুরআনের সেই আয়াত তিলাওয়াত করলেন—

يَٰٓأَيُّهَا ٱلَّذِينَ ءَامَنُوٓا۟ إِذَا ضَرَبْتُمْ فِى سَبِيلِ ٱللَّهِ فَتَبَيَّنُوا۟ وَلَا تَقُولُوا۟ لِمَنْ أَلْقَىٰٓ إِلَيْكُمُ ٱلسَّلَٰمَ لَسْتَ مُؤْمِنًا

“হে মুমিনগণ! যখন তোমরা আল্লাহর পথে বের হবে, তখন পরীক্ষা করবে। কেউ তোমাদেরকে সালাম দিলে, তাকে বলো না ‘তুমি মুমিন নও। (সুরা নিসা ৪ঃ৯৪)

তার কণ্ঠ যেন ভেঙে যাচ্ছিল। দেখো হাশেম! তুমি কীভাবে তার অন্তর জানবে? কে মুমিন, কে মুনাফিক — এ বিচার একমাত্র আল্লাহর। তুমি মানুষ হয়ে কীভাবে অন্যের ঈমানের ফয়সালা করবে?”

মাওলানা এবার শিষ্যদের দিকে তাকিয়ে বললেন— “তোমরা কি জানো এই আয়াত কিসে নাযিল হয়েছিল? ইবনু আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, একদা সাহাবিরা বানী সুলাইম গোত্রের এক লোককে দেখেছিলেন। সে তাদের দেখে সালাম দিয়েছিল।
কিন্তু সাহাবিরা ভেবেছিলেন — ‘সে তো কেবল আমাদের হাত থেকে বাঁচতে সালাম দিচ্ছে।’ তারা তাকে হত্যা করে তার ছাগলগুলো নিয়ে রাসুলের কাছে চলে এল। তখন আল্লাহ এ আয়াত নাজিল করলেন—
وَلَا تَقُولُوا۟ لِمَنْ أَلْقَىٰٓ إِلَيْكُمُ ٱلسَّلَٰمَ لَسْتَ مُؤْمِنًا
‘যারা তোমাদেরকে সালাম দেবে, তাদেরকে বলো না — তুমি মুমিন নও। (তিরমিজি ৩০৩০)

মাওলানার চোখে জল। তিনি বললেন— “আমরা যদি কারো সালাম শুনে তার ঈমান নিয়ে সন্দেহ করি, তার জবাব না দিই, তাহলে আমরা কি সাহাবিদের সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি করছি না?” তার কণ্ঠ কেঁপে উঠলো— “আমরা যদি কারো সালাম ফিরিয়ে দিই, তাহলে তার অন্তর আহত হবে। আর হয়তো সে ফিরে যাবে কুফরের পথে, আমাদের কারণেই।

তিনি এবার আকাশের দিকে তাকিয়ে বললেন— “সালাম কেবল একটি শুভেচ্ছা নয়। এটি শান্তি, নিরাপত্তা, ভালোবাসার ঘোষণা। যে ব্যক্তি ‘সালামুন আলাইকুম’ বললো, সে তোমার কাছে শান্তি ও নিরাপত্তা প্রার্থনা করলো। তুমি কীভাবে তার সালাম ফিরিয়ে দিতে পারো?”

তাদের মধ্যে এক তরুণ রেদওয়ান জোরে জোরে মাথা নাড়তে লাগলো। “মাওলানা, এবার বুঝেছি। আমরা তাকে মুমিন নাকি কাফের তা বলার অধিকারী নই। যদি সে সালাম দেয়, আমরা কুরআনের নির্দেশে তার উত্তম জবাব দেব। আর আল্লাহই তার অন্তর জানেন।”

রফিকুল ইসলাম এবার তার কাঁধে হাত রাখলেন। তোমরা যারা কুরআন মেনে চলো, তোমাদের মধ্যে অহংকার থাকতে পারে না। তোমরা যখন কাউকে অপরিচিত মনে করে সালাম এড়িয়ে যেতে চাও, মনে রেখো — আল্লাহ তোমাদের অন্তর জানেন। তিনি সবকিছুর হিসাব নেন।”
তারপর কুরআনের আয়াত তিলাওয়াত করলেন—

وَإِذَا حُيِّيتُم بِتَحِيَّةٍ فَحَيُّوا۟ بِأَحْسَنَ مِنْهَآ أَوْ رُدُّوهَآۗ إِنَّ ٱللَّهَ كَانَ عَلَىٰ كُلِّ شَىْءٍ حَسِيبًا

“যখন তোমাদের সালাম দেওয়া হবে, তোমরা তার চেয়ে উত্তম সালাম দেবে অথবা একইভাবে জবাব দেবে। নিশ্চয় আল্লাহ সবকিছুর হিসাবকারী।”(৪ঃ৮৬)

সেই অপরিচিত লোকটি তখনো দাঁড়িয়ে ছিল। মাওলানা এগিয়ে গিয়ে তার দিকে তাকিয়ে বললেন— “সালামুন আলাইকুম।” লোকটি বিস্ময়ে বলল— “ওয়ালাইকুমুস সালাম। আপনারা তো খুবই ভালো মানুষ ও সদয়। আমি সত্যি মুগ্ধ হলাম।”


{অষ্টম ভাগ}

“সালামের হুকুম ও তার গুরুত্ব”

গভীর রাত। আকাশে তারারা যেন ফিসফিস করে কিছু বলছে। মাওলানা রফিকুল ইসলামের চোখে আজ ঘুম নেই। তার বুকের ভেতর যেন কেউ ঘুষি মারছে বারবার।
তিনি বারান্দায় হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। কুরআনের একটি আয়াত যেন সারাক্ষণ তার কানে বাজছে—

وَإِذَا جَآءُوكَ حَيَّوْكَ بِمَا لَمْ يُحَيِّكَ بِهِ ٱللَّهُ وَيَقُولُونَ فِىٓ أَنفُسِهِمْ لَوْلَا يُعَذِّبُنَا ٱللَّهُ بِمَا نَقُولُ ۚ حَسْبُهُمْ جَهَنَّمُ يَصْلَوْنَهَا ۖ فَبِئْسَ ٱلْمَصِيرُ

হঠাৎ ভিতর থেকে তার জামাই মো. আজগর আলী ডাক দিল, —“আব্বা, আজ আপনাকে খুব ভাবনায় দেখাচ্ছে! কিছু হয়েছে নাকি?”
মাওলানা ধীরে ঘুরে দাঁড়ালেন। তার কপালে গভীর ভাঁজ।
—“জামাই, তুমি কি জানো সালামের হুকুম কী?”
আজগড় একটু চমকে উঠে বলল, —“মানে? সালাম তো সুন্নত… তাই না? আসসালামু আলাইকুম বললেই তো হয়!”

মাওলানা চোখ বন্ধ করে এক দীর্ঘশ্বাস ছাড়লেন।
—“এই যে বললে ‘আসসালামু আলাইকুম’, তুমি জানো কি, মহান আল্লাহ কি আমাদের এভাবে সালাম শিখিয়েছেন?”

আজগড় ভয়ে ভয়ে বলল, —“কিন্তু আব্বা, সবাই তো এভাবেই বলে! আপনি কি মনে করেন, এভাবে বললে কি কোন পাপ হবে?”

মাওলানা রফিকুল ইসলাম হঠাৎ পকেট থেকে ছেঁড়া কাগজ বের করে পড়তে শুরু করলেন। যেন সেই কাগজেই লেখা আছে তার সমস্ত চিন্তা। —“শোনো জামাই, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা আমাদের শিখিয়েছেন সালাম দিতে হবে তার শেখানো শব্দে। যেমন,

“আর যখন তারা তোমার কাছে আসে, তখন তারা তোমাকে এমনভাবে অভিবাদন জানায়, যেভাবে আল্লাহ তোমাকে অভিবাদন জানাননি। আর তারা নিজেদের মনে বলে, “আমরা যা বলি তার জন্য আল্লাহ আমাদের শাস্তি দেন না কেন?” — তাদের জন্য জাহান্নামই যথেষ্ট; তারা তাতেই প্রবেশ করবে। আর তা কতই না নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল! (সুরা মুজাদালা ৫৮ঃ৮)

তিনি একটু থেমে আজগড়ের দিকে তাকালেন। আল্লাহ আমাদেরকে শিখিয়েছেন ‘সালামুন আলাইকুম’।(৬ঃ৫৪, ৩৯ঃ৭৩) ফেরেশতারাও বলেন, জান্নাতের রক্ষকও বলেন, এমনকি কিয়ামতের দিন মহান রব নিজেই বলবেন—
سَلَامٌ قَوْلًا مِّن رَّبٍّ رَّحِيمٍ
‘দয়াময় রবের পক্ষ থেকে তাদেরকে সালাম বলা হবে।’ (৩৬ঃ৫৮)

আজগড় মাথা নিচু করে বলল, —“তাহলে আব্বা, আমরা কি এতদিন ভুল করে আসছিলাম? সালাম কি ফরজ?”

মাওলানা বললেন, —“সালাম বলা প্রায় ফরজ পর্যায়ের। কালেমা, সালাত, রোজা, হজ, যাকাত যেমন ফরজ, তেমনি সালামও ফরজ না হলেও এর গুরুত্ব কোন অংশে কম নয়। এটা আল্লাহর কিতাবের স্পষ্ট হুকুম।
আজগড়ের গলা শুকিয়ে এল। —“আব্বা, যদি আমরা কুরআনের শিখানো নিয়মে সালাম না দিই, বা উত্তর না দিই?”

মাওলানার চোখ লাল হয়ে উঠল। তিনি গলা ঝাড়লেন।
—“জামাই, তখন দুটো ভয়াবহ অবস্থা হবে।

প্রথমত, তুমি আল্লাহর হুকুমকে অস্বীকার করলে। যারা আল্লাহর বিধান অবজ্ঞা করে, তাদের ঈমান থাকে না।
দ্বিতীয়ত, কুরআন অবজ্ঞাকারীদের বিরুদ্ধে কিয়ামতের মাঠে সালামুন আলা মুহাম্মাদ নিজেই মামলা করবেন।
আল্লাহ বলেন,
وَقَالَ ٱلرَّسُولُ يَـٰرَبِّ إِنَّ قَوْمِى ٱتَّخَذُوا۟ هَـٰذَا ٱلْقُرْءَانَ مَهْجُورًا
‘রাসুল বলবেন: হে আমার রব! আমার কওম এই কুরআনকে পরিত্যাগ করেছিল।’ (সুরা ফুরকান ২৫ঃ৩০)

—“আব্বা! এরপর?” আজগড়ের চোখে জল।
মাওলানা —“এরপর তাদের জন্য রয়েছে ভয়াবহ শাস্তি। কুরআনে আছে,
وَإِذَا جَآءُوكَ حَيَّوْكَ بِمَا لَمْ يُحَيِّكَ بِهِ ٱللَّهُ وَيَقُولُونَ فِىٓ أَنفُسِهِمْ لَوْلَا يُعَذِّبُنَا ٱللَّهُ بِمَا نَقُولُ ۚ حَسْبُهُمْ جَهَنَّمُ يَصْلَوْنَهَا ۖ فَبِئْسَ ٱلْمَصِيرُ
‘“আর যখন তারা তোমার কাছে আসে, তখন তারা তোমাকে এমনভাবে অভিবাদন জানায়, যেভাবে আল্লাহ তোমাকে অভিবাদন জানাননি। আর তারা নিজেদের মনে বলে, “আমরা যা বলি তার জন্য আল্লাহ আমাদের শাস্তি দেন না কেন?” — তাদের জন্য জাহান্নামই যথেষ্ট; তারা তাতেই প্রবেশ করবে। আর তা কতই না নিকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল! (সুরা মুজাদালা ৫৮ঃ৮)

মাওলানা সাহেব আজগড়ের হাত ধরে বললেন,
—‘দেখো বাপ, আমরা যদি আল্লাহর শিখানো শব্দ ‘সালামুন আলাইকুম’ ব্যবহার না করি, তাহলে কেবল সমাজের রেওয়াজ মেনে চলা হবে, আল্লাহর হুকুম মানা নয়। ভাবো, আল্লাহর হুকুম না মানলে শুধু নামে মুসলিম থেকে কি লাভ?”

আজগড় চুপ করে গলা দিয়ে শব্দ করল, —“না আব্বা।”
মাওলানা সাহেব—“তাহলে আজ থেকে ঠিক করে নাও। কুরআন আমাদের যে শব্দ শিখিয়েছে, সেই শব্দেই সালাম বলবে। আর উত্তরও সেই শব্দেই দেবে। এ যেন আল্লাহর কিতাবের প্রতি আমাদের ভালোবাসা আর আনুগত্যের প্রকাশ।”


{নবম ভাগ}

“সালামের নেকির বাগান”

মাওলানা রফিকুল ইসলামের আজ মনে এক ধরনের প্রশান্তি কাজ করছে। বারান্দায় বসে থাকা আজগড় আলী বুঝতে পারছিল, মাওলানা সাহেব যেন কেমন ফুরফুরে মেজাজে আছেন।
—“আব্বা, একটা প্রশ্ন করি? কাল রাতে বলছিলেন কুরআনের শিখানো সালাম বলতে হবে, না বললে ঈমানই থাকবে না। কিন্তু এভাবে ‘সালামুন আলাইকুম’ বলে যদি সালাম আদান-প্রদান করি, আমরা এতে কোন নেকি বা সওয়াব পাবো কি?”

তিনি হাতের লাঠিটা হালকা করে মাটিতে ঠুক দিলেন। —“দেখো বাপ, এর উত্তরে আমি তোমাকে দুইটা কথা বলব। একটা কুরআন থেকে, আরেকটা হাদিস থেকে। শুনো মন দিয়ে।”

“মহান আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তায়ালা বলেন—
مَن جَآءَ بِٱلْحَسَنَةِ فَلَهُۥ عَشْرُ أَمْثَالِهَا
‘যে ব্যক্তি কোন সৎকর্ম করবে তার জন্য আছে দশ গুণ পুরস্কার।’ সুরা আনয়াম ৬ঃ১৬০)

অতএব, যখন তুমি সালাম বলবে — আল্লাহর শেখানো সেই ‘সালামুন আলাইকুম’ — তখনও তুমি দশ গুণ নেকি পাবে। আল্লাহর প্রতিটি হুকুম মানাই হলো সৎকাজ, আর সৎকাজের জন্য আল্লাহ কমপক্ষে দশগুণ দিয়ে থাকেন।”

মাওলানা এবার কণ্ঠ নরম করলেন। হাশেমের কাঁধে হাত রাখলেন। ‘কেবল তাই নয়। রাসূল ‘সালামুন আলা মুহাম্মাদ এ বিষয়ে স্পষ্ট হাদিসও বলেছেন। হযরত আবু হুরায়রা (রাদিয়াল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত —
أنَّ رجُلًا مرَّ على رسولِ اللهِ ﷺ وهو في مجلسٍ فقال: سلامٌ عليكم فقال: (عشرُ حسناتٍ)
‘এক ব্যক্তি ‘সালামুন আলা মুহাম্মাদ-এর পাশ দিয়ে অতিক্রম করল এবং বলল সালামুন আলাইকুম। তখন রাসূল বললেন, দশটি নেকি।’ তারপর আরেকজন এল।
ثمَّ مرَّ رجُلٌ آخَرُ فقال: سلامٌ عليكم ورحمةُ اللهِ فقال: (عشرونَ حسنةً)
‘সে বলল সালামুন আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহ। তখন রাসূল বললেন, বিশটি নেকি।’ এরপর আরেকজন এল।
فمرَّ رجُلٌ آخَرُ فقال: سلامٌ عليكم ورحمةُ اللهِ وبركاتُه فقال: (ثلاثونَ حسنةً)
‘সে বলল সালামুন আলাইকুম ওয়া রহমাতুল্লাহি ওয়া বারকাতুহ। তখন রাসূল বললেন, ত্রিশটি নেকি।’ (সহীহ ইবনে হিববান হাঃ ৪৯৩)

‘দেখলে? নবীজীও ‘সালামুন আলাইকুম’ এর কথাই বলেছেন। এটাই কুরআনের সালাম, নবীর সালাম। তুমি যদি এই শব্দ ব্যবহার করো, তুমি সরাসরি কুরআনের পথ বা নবীর পথেরই অনুসরণ করলে।

আজগড় আস্তে বলল— “আব্বা, তাহলেতো যে হাদিসে ‘আসসালামু আলাইকুম’ শব্দ আছে, সেগুলো কুরআন বিরোধী? সেটা তো কুরআনের বিরুদ্ধে দাঁড়াল, আমরা সেটা মানবো কেন?।”

মাওলানা নরম কণ্ঠে বললেন— শোনো বাপ, ইসলাম শিখতে হলে প্রথমে কুরআন। নবীজীর কোনো হাদিস কুরআনের বিপরীত হবে না। যদি বিপরিত হয়, তাহলে সেটা নবীজীর কথা নয়। কারণ নবীজী বলেছেন:

“জাবের (রা) কর্তৃক বর্ণিত; রাসুল (সা:) বলেছেনঃ ‘আমার কথা আল্লাহ্‌র কিতাবকে মানসুখ বা বাতিল করে না; বরং আল্লাহর কিতাব আমার কথাকে মানসুখ বা রহিত করে।”
নবীজি আরো বলেছেন – মানুষের কি হয়েছে? তারা এমন সব শর্তারোপ করছে যা আল্লাহর কিতাবে নেই। আল্লাহর কিতাবে নাই এমন কথা একশটি থাকলেও তা বাতিল।” (মিশকাত হাঃ ১৯৫)

সুতরাং, হাদিসে যদি কখনো ‘আসসালামু আলাইকুম’ লেখা পাওয়া যায়, তা তখন বাতিল হয়ে যাবে কুরআনের মোকাবেলায়। কারণ আল্লাহর কিতাব সর্বোচ্চ। হাদিস কুরআনেরই ব্যাখ্যা — কুরআনের বিপরীত হলে তা গ্রহণযোগ্য নয়।”

মাওলানা এবার আরও গভীর হয়ে বললেন— শোন জামাই, ইবনু ‘আব্বাস (রাঃ) বলেছেন: “যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের শিক্ষা গ্রহণ করে এবং তার মধ্যে যা আছে তা অনুসরণ করে, আল্লাহ তাকে পৃথিবীতে পথভ্রষ্টতা থেকে বাঁচিয়ে রাখবেন এবং কিয়ামতের দিনে নিকৃষ্ট হিসাবের কষ্ট থেকে রক্ষা করবেন। (বুখারী ২০০৯)

অন্য বর্ণনায় আছে: যে আমার হিদায়াত গ্রহণ করবে, সে দুনিয়ায় পথভ্রষ্ট হবে না এবং পরকালেও ভাগ্যাহত হবে না।
মাওলানার চোখে পানি চলে এল—“জামাই, ভয় কর আল্লাহকে। কুরআন অবজ্ঞা করা খুব ভয়ানক বিষয়। আল্লাহ বলেছেন:
وَقَالَ ٱلرَّسُولُ يَـٰرَبِّ إِنَّ قَوْمِى ٱتَّخَذُوا هَـٰذَا ٱلْقُرْءَانَ مَهْجُورًا
‘রাসূল বলবেন, হে আমার প্রতিপালক! আমার কওম এই কুরআনকে ত্যাগ করেছিল। (ফুরকান ৩০)

কিয়ামতের দিন যদি সালামুন আলা মুহাম্মাদ আমাদের নামে মামলা করে দেন যে আমরা কুরআনের শিখানো সালাম বাদ দিয়েছিলাম, তখন আমাদের অবস্থা কেমন হবে?”

আজগড়ের গলা ভারি হয়ে এলো। সে বলল —“আব্বা, আমি প্রতিজ্ঞা করছি, এখন থেকে কেবল ‘কুরআনের পথেই চলব। আর কাউকে এর বিপরীত শিখালে তাকে কুরআনের আয়াত দেখিয়ে বুঝিয়ে দিব।”
মাওলানার চোখে আনন্দের জল। তিনি মাথায় হাত রেখে বললেন— “বাপ, আমি তোমার জন্য দোয়া করি। আল্লাহ যেন তোমাকে কুরআনের পথেই রাখেন।”

(সমাপ্ত)

Print this entry


আপনার মতামত লিখুন :
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x