লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ,
মুসলিম সমাজে একটি বহুল প্রচলিত বাক্য রয়েছে— “কিয়ামতের দিন সবার আগে নামাজের হিসাব হবে।” অধিকাংশ মানুষ এই কথাটিকে কুরআনের অবিচ্ছেদ্য অংশ হিসেবেই গ্রহণ করে থাকে। অথচ কুরআনের আলোকে বিষয়টি যাচাই করলে দেখা যায়, এই বক্তব্যটি সরাসরি কুরআননির্ভর নয়; বরং এটি একটি নির্দিষ্ট হাদিসের ওপর ভিত্তি করে গড়ে ওঠা একটি ধারণা। এই প্রবন্ধে কুরআনের আয়াত ও সংশ্লিষ্ট হাদিসগুলো আরবি ও বাংলা অনুবাদসহ বিশ্লেষণ করে দেখা হবে—এই ধারণাটি কুরআনের বিচার-দর্শনের সাথে কতটা সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সাধারণত যে হাদিসটি দিয়ে “প্রথমে নামাজের হিসাব” কথাটি বলা হয়, তা হলো—
أَوَّلُ مَا يُحَاسَبُ بِهِ الْعَبْدُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ الصَّلَاةُ
“কিয়ামতের দিন বান্দার আমলসমূহের মধ্যে সর্বপ্রথম যার হিসাব নেওয়া হবে, তা হলো সালাত।” (সুনান আত-তিরমিযি, হাদিস ৪১৩; অনুরূপ বর্ণনা আবু দাউদ ও নাসাঈ)
এই হাদিসের ওপর ভিত্তি করেই বলা হয়— নামাজ ঠিক থাকলে সব ঠিক, নামাজ নষ্ট হলে সব নষ্ট। এখন প্রশ্ন হলো, কুরআন কি এই কাঠামো সমর্থন করে?
কুরআন কিয়ামতের হিসাবকে কখনো একটি নির্দিষ্ট আমলে সীমাবদ্ধ করেনি। বরং কুরআনের ভাষা সর্বত্রই সার্বিক ও সমষ্টিগত। আল্লাহ বলেন—
فَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ خَيْرًا يَرَهُ وَمَن يَعْمَلْ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ شَرًّا يَرَهُ
“অতঃপর যে অণু পরিমাণ ভালো কাজ করেছে, সে তা দেখবে। আর যে অণু পরিমাণ মন্দ কাজ করেছে, সেও তা দেখবে।” (সূরা যিলযাল ৯৯:৭–৮)
এই আয়াতে কোনো একটি আমলকে ‘প্রথম’ বা ‘মূল’ বলে আলাদা করা হয়নি। বরং মানুষের প্রতিটি কাজ—ছোট হোক বা বড়—সবকিছুর হিসাবের কথা বলা হয়েছে।
কুরআন আরও স্পষ্ট করে দেয় যে কিয়ামতের বিচার হবে ন্যায়বিচারের দাঁড়িপাল্লার মাধ্যমে—
وَنَضَعُ الْمَوَازِينَ الْقِسْطَ لِيَوْمِ الْقِيَامَةِ فَلَا تُظْلَمُ نَفْسٌ شَيْئًا
“আমি কিয়ামতের দিনের জন্য ন্যায়বিচারের দাঁড়িপাল্লা স্থাপন করব। তখন কারও প্রতি কোনো যুলুম করা হবে না।” (সূরা আম্বিয়া ২১:৪৭)
দাঁড়িপাল্লা মানেই বহু আমল, বহু দায়িত্ব ও বহু আচরণের ওজন। যদি হিসাব সত্যিই একটি মাত্র আমল দিয়ে শুরু হতো, তাহলে কুরআনের এই দাঁড়িপাল্লার ধারণা অর্থহীন হয়ে পড়ত।
কুরআন সুস্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছে— সব আমলের ভিত্তি হলো ঈমান। ঈমান ছাড়া কোনো আমলই গ্রহণযোগ্য নয়—
وَمَن يَكْفُرْ بِالْإِيمَانِ فَقَدْ حَبِطَ عَمَلُهُ
“যে ব্যক্তি ঈমান অস্বীকার করে, তার সমস্ত আমলই নষ্ট হয়ে যায়।” (সূরা মায়িদা ৫:৫)
এই আয়াতের আলোকে বোঝা যায়, ঈমানই যদি মূল শর্ত হয়, তাহলে ‘প্রথমে নামাজের হিসাব’—এই ধারণা কুরআনিক কাঠামোর সাথে খাপ খায় না। ঈমান ছাড়া নামাজের হিসাব আগে না পরে—এই প্রশ্নই তখন অপ্রাসঙ্গিক।
কুরআন কিয়ামতের জিজ্ঞাসার বিষয়বস্তু সম্পর্কেও ইঙ্গিত দিয়েছে—
وَقِفُوهُمْ إِنَّهُم مَّسْئُولُونَ
“তাদের থামাও, নিশ্চয় তাদের জিজ্ঞাসা করা হবে।” (সূরা সাফফাত ৩৭:২৪)
কুরআনের অন্যান্য আয়াত বিশ্লেষণ করলে বোঝা যায়, এই প্রশ্নগুলো ঘুরে ফিরে আল্লাহকে অস্বীকার, যুলুম, অন্যায় ও দায়িত্বহীনতার বিষয়েই আবর্তিত। কোথাও বলা হয়নি— প্রথম প্রশ্ন হবে নামাজের সংখ্যা বা রাকাত নিয়ে।
কুরআন সালাতকে কখনোই কেবল একটি আনুষ্ঠানিক রিচুয়াল হিসেবে উপস্থাপন করেনি। বরং তার নৈতিক প্রভাবকে মুখ্য করেছে—
إِنَّ الصَّلَاةَ تَنْهَىٰ عَنِ الْفَحْشَاءِ وَالْمُنكَرِ
“নিশ্চয় সালাত মানুষকে অশ্লীলতা ও অন্যায় কাজ থেকে বিরত রাখে।” (সূরা আনকাবূত ২৯:৪৫)
অতএব কিয়ামতের প্রশ্ন হবে— সালাত কি সত্যিই মানুষকে অন্যায় থেকে বিরত রেখেছিল, নাকি তা কেবল একটি বাহ্যিক অভ্যাসে পরিণত হয়েছিল?
সবচেয়ে বিস্ময়কর সতর্কতা এসেছে সূরা মাউন-এ—
فَوَيْلٌ لِّلْمُصَلِّينَ الَّذِينَ هُمْ عَن صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ
“ধ্বংস সেই সমস্ত মুসল্লিদের জন্য, যারা তাদের সালাতের ব্যাপারে উদাসীন।” (সূরা মাউন ১০৭:৪–৫)
লক্ষ করার বিষয় হলো— এখানে সতর্কতা এসেছে সালাত না পড়াদের জন্য নয়, বরং সালাত আদায়কারীদের জন্য। এটি প্রমাণ করে যে সালাত থাকলেই হিসাব সহজ—এই ধারণা কুরআন সমর্থন করে না।
কুরআনের আলোকে স্পষ্টভাবে বলা যায়— “কিয়ামতের দিন সবার আগে নামাজের হিসাব হবে”—এই বক্তব্যটি কুরআনিক নয়। কুরআন মানুষের বিশ্বাস, ন্যায়বোধ, কথা ও কাজের সমষ্টিগত হিসাবের কথা বলে। সালাত অবশ্যই গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তা হিসাবের সূচনা নয়; বরং নৈতিক মূল্যায়নের একটি অংশ। কুরআনের বিচার-দর্শনে ঈমানই ভিত্তি, ন্যায়ই মানদণ্ড, আর মানুষের পুরো জীবনই হিসাবের বিষয়।
সারকথা:
কুরআন যেখানে মানুষের পূর্ণ জীবনের হিসাবের কথা বলে, সেখানে একটি নির্দিষ্ট আমলকে “প্রথম প্রশ্ন” বানানো কুরআনের সামগ্রিক বিচার-পদ্ধতির সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
