হাত ও মুখের নিরাপত্তা: মুসলিমদের জন্য, নাকি সমগ্র মানবতার জন্য?”
লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ
“সেই ব্যক্তি প্রকৃত মুসলিম যার হাত ও মুখ হতে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে”—এই বাক্যটি সাধারণভাবে সহিহ বুখারি ও মুসলিমে বর্ণিত একটি হাদিস হিসেবে পরিচিত। হাদিসের আরবি পাঠ হলো—
الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُونَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ
“মুসলিম সেই ব্যক্তি, যার জিহ্বা ও হাত থেকে অন্য মুসলিমরা নিরাপদ থাকে।” (বুখরী ও মুসলিম)
শুনতে এই বক্তব্য অত্যন্ত সুন্দর, নৈতিক এবং গ্রহণযোগ্য মনে হয়। কিন্তু কুরআনের আলোকে গভীরভাবে চিন্তা করলে এখানে একটি গুরুতর প্রশ্ন উঠে আসে—কুরআন কি নিরাপত্তাকে শুধু ‘মুসলিম’-এর মধ্যে সীমাবদ্ধ করেছে, নাকি সমস্ত মানুষের জন্য এটিকে একটি সার্বজনিক নীতি হিসেবে ঘোষণা করেছে?
কুরআন নিজেকে ঘোষণা করেছে সমগ্র মানবজাতির জন্য হেদায়াত হিসেবে, কেবল মুসলিমদের জন্য নয়। আল্লাহ বলেন—
هُدًى لِلنَّاسِ
“এটি মানুষের জন্য হেদায়াত।” (সূরা আল-বাকারা ২:১৮৫)
যখন কুরআন মানুষের কথা বলে, তখন সেখানে “মুসলিম–অমুসলিম” ভাগ নেই। বরং কুরআনের নৈতিকতা সর্বজনীন। এই জায়গা থেকেই প্রশ্ন জাগে—যদি একজন মুসলিম কেবল অন্য মুসলিমের কাছেই নিরাপদ হলেই ‘প্রকৃত মুসলিম’ হয়, তাহলে অমুসলিমের প্রতি জুলুম, গালি, প্রতারণা বা নির্যাতনের জায়গাটা কোথায় দাঁড়ায়?
কুরআন এই সীমাবদ্ধ নৈতিকতাকে সমর্থন করে না। বরং কুরআন স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে—
وَلَا يَجْرِمَنَّكُمْ شَنَآنُ قَوْمٍ عَلَىٰ أَلَّا تَعْدِلُوا ۚ اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَىٰ
“কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি বিদ্বেষ যেন তোমাদের ন্যায়বিচার থেকে বিরত না করে। ন্যায়বিচার করো—এটাই তাকওয়ার কাছাকাছি।” (সূরা আল-মায়েদা ৫:৮)
এখানে আল্লাহ স্পষ্ট করে দিয়েছেন—শত্রু হলেও, ভিন্ন বিশ্বাসের হলেও, মানুষের প্রতি ন্যায়বিচার করতে হবে। অর্থাৎ ইসলামে নিরাপত্তা ও নৈতিকতা দলভিত্তিক নয়, মানবভিত্তিক।
আরেকটি মৌলিক আয়াতে আল্লাহ বলেন—
مَنْ قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا
“যে একজন মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে, সে যেন পুরো মানবজাতিকেই হত্যা করল।” (সূরা আল-মায়েদা ৫:৩২)
লক্ষ করুন—এখানে ‘মুসলিম’ বলা হয়নি, বলা হয়েছে নাফসান—একজন মানুষ। অর্থাৎ মানুষের জীবন, সম্মান ও নিরাপত্তা—বিশ্বাসের পরিচয়ে বিভক্ত নয়।
কুরআন আরও বলে—
لَا إِكْرَاهَ فِي الدِّينِ
“দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই।” (সূরা আল-বাকারা ২:২৫৬)
এই আয়াত শুধু ধর্ম গ্রহণের স্বাধীনতা নয়, বরং নিরাপদ সহাবস্থানের ঘোষণা। যেখানে জবরদস্তি নেই, সেখানে ভয় দেখানো, গালি দেওয়া, নির্যাতন করারও কোনো বৈধতা নেই—সে মুসলিম হোক বা অমুসলিম।
এখন প্রশ্ন আসে—তাহলে উক্ত হাদিসটি কীভাবে বুঝতে হবে?
কুরআনের মাপকাঠিতে দাঁড়িয়ে বললে, এই হাদিসটি যদি ‘নৈতিক উপদেশ’ হিসেবে বোঝানো হয়—অর্থাৎ একজন মুসলিমের আচরণ যেন তার সমাজের মুসলিমদের জন্য নিরাপদ হয়—তাহলে সেটি গ্রহণযোগ্য। কিন্তু যদি এটিকে এমনভাবে উপস্থাপন করা হয় যে, মুসলিম হওয়ার শর্ত কেবল মুসলিমদের প্রতি নিরাপদ হওয়া, আর অমুসলিমদের প্রতি আচরণ আলাদা হতে পারে—তাহলে তা কুরআনের সার্বজনিক ন্যায়ের সঙ্গে সংঘর্ষে যায়।
কারণ কুরআনের মতে, একজন মু’মিনের পরিচয় হলো—
وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ
“আমি আপনাকে প্রেরণ করেছি সমগ্র জগতের জন্য রহমত হিসেবে।” (সূরা আল-আম্বিয়া ২১:১০৭)
যে নবী পুরো জগতের জন্য রহমত, তার উম্মত কীভাবে কেবল একটি দলের জন্য নিরাপদ হবে?
অতএব কুরআনিক দৃষ্টিতে সঠিক উপলব্ধি হলো—প্রকৃত মুসলিম সে-ই, যার হাত ও মুখ থেকে মানুষ নিরাপদ থাকে। মুসলিম হওয়া মানে দলীয় নিরাপত্তা নয়, মানবিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। কুরআন মানুষকে শেখায়—দায়িত্ব অন্যের ওপর চাপাতে নয়, নিজের চরিত্রে ইসলামকে দৃশ্যমান করতে।
সুতরাং কুরআনের আলোকে বলা যায়—যে বর্ণনা ইসলামের নৈতিকতাকে সংকুচিত করে, সেটিকে কুরআনের বিস্তৃত ন্যায়ের অধীনে নতুন করে বুঝতে হবে। কারণ শেষ বিচারে কুরআনই ফুরকান, আর সব কথা তারই মীযানে ওজন করা হবে।
