লিখক: মাহাতাব আকন্দ
“তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা ও সন্তানাদির চেয়ে অধিক প্রিয় হই”—এই বক্তব্যটি মুসলিম সমাজে ঈমান নির্ণয়ের এক অলিখিত মানদণ্ডে পরিণত হয়েছে। বহু মানুষ এই বাণীকে এমনভাবে গ্রহণ করেছে যেন কুরআন নিজেই ঈমানের সংজ্ঞা বদলে দিয়েছে। অথচ প্রশ্নটা আবেগের নয়, প্রশ্নটা হলো—কুরআন কি সত্যিই ঈমানকে এমন আবেগগত শর্তের সঙ্গে বেঁধে দিয়েছে?
এই বক্তব্যটি হাদিসে এভাবে এসেছে—
হাদিসের আরবি বর্ণনা:
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ
«وَالَّذِي نَفْسِي بِيَدِهِ، لَا يُؤْمِنُ أَحَدُكُمْ حَتَّىٰ أَكُونَ أَحَبَّ إِلَيْهِ مِنْ وَالِدِهِ وَوَلَدِهِ وَالنَّاسِ أَجْمَعِينَ»
আনাস ইবন মালিক (রা.) থেকে বর্ণিত—আল্লাহর রাসূল সাঃ বলেছেন: “সেই সত্তার শপথ, যাঁর হাতে আমার প্রাণ—তোমাদের কেউ প্রকৃত মুমিন হতে পারবে না, যতক্ষণ না আমি তার কাছে তার পিতা, সন্তান এবং সমস্ত মানুষের চেয়ে অধিক প্রিয় হই।” (বুখারী হাঃ ১৫, মুসলিম হাঃ ৪৪)
এই হাদিসটি আক্ষরিকভাবে গ্রহণ করলে ঈমানের একটি নতুন সংজ্ঞা দাঁড়িয়ে যায়—ঈমান নির্ভর করবে একজন মানুষের প্রতি অন্তরের ভালোবাসার মাত্রার ওপর। কিন্তু কুরআন ঈমানকে কি কখনো মানুষের প্রতি ভালোবাসার প্রতিযোগিতায় পরিণত করেছে?
কুরআনের উত্তর স্পষ্ট—না।
কুরআন ঈমানের ভালোবাসার কেন্দ্র নির্ধারণ করে দিয়েছে আল্লাহকে।
وَالَّذِينَ آمَنُوا أَشَدُّ حُبًّا لِلَّهِ
“আর যারা ঈমান এনেছে, তারা আল্লাহকে সর্বাধিক ভালোবাসে।” (সূরা আল-বাকারা ২:১৬৫)
এখানে ঈমানের ভালোবাসা আল্লাহমুখী—রাসূল, পিতা, সন্তান বা কোনো মানুষের দিকে নয়। কুরআন কখনো বলেনি—যে ব্যক্তি রাসূলকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসে, সে-ই মুমিন। বরং কুরআন ঈমানকে যুক্ত করেছে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস ও আনুগত্যের সঙ্গে।
রাসূলের অবস্থানও কুরআন নিজেই নির্ধারণ করেছে—
مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّهَ
“যে রাসূলের আনুগত্য করে, সে আল্লাহরই আনুগত্য করে।” (সূরা আন-নিসা ৪:৮০)
লক্ষ্য করুন—এখানে ভালোবাসা নয়, আনুগত্য শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে। রাসূলকে মানে আল্লাহর নির্দেশ পৌঁছে দেওয়া বাহক। তাঁর প্রতি আনুগত্য মানে—তিনি যে কিতাব নিয়ে এসেছেন, অর্থাৎ কুরআন—তার অনুসরণ।
আরও স্পষ্টভাবে—
وَأَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ
“আল্লাহর আনুগত্য করো এবং রাসূলের আনুগত্য করো।” (সূরা আল-মায়িদা ৫:৯২)
কুরআনের কোথাও বলা হয়নি—“রাসূলকে সবচেয়ে বেশি ভালোবাসা ঈমানের শর্ত।” বরং বলা হয়েছে—আনুগত্য করো।
এই হাদিসটিকে আক্ষরিক ঈমান-সংজ্ঞা বানালে একটি গুরুতর সমস্যা তৈরি হয়। ভালোবাসা একটি অন্তর্গত অনুভূতি—এটি পরিমাপযোগ্য নয়, নিয়ন্ত্রণযোগ্য নয়। তাহলে ঈমান কি এমন কিছুর ওপর নির্ভর করবে, যা মানুষের ইচ্ছাধীনই নয়?
কুরআন কখনো ঈমানকে এমন অনির্ধার্য অনুভূতির ওপর দাঁড় করায় না। বরং বলে—
وَلَٰكِنَّ اللَّهَ حَبَّبَ إِلَيْكُمُ الْإِيمَانَ
“বরং আল্লাহ তোমাদের কাছে ঈমানকে প্রিয় করে দিয়েছেন।” (সূরা আল-হুজুরাত ৪৯:৭)
অর্থাৎ ঈমানের ভালোবাসা আল্লাহর পক্ষ থেকে আসে; এটি কোনো ব্যক্তিকে ভালোবাসার শর্তে আবদ্ধ নয়।
কুরআন আরও সতর্ক করে দেয়—পরিবার, মানুষ এমনকি রাসূলও—কেউ আল্লাহর জায়গা নিতে পারে না।
قُلْ إِنْ كَانَ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ… وَرَسُولُهُ أَحَبَّ إِلَيْكُمْ مِنَ اللَّهِ وَجِهَادٍ فِي سَبِيلِهِ فَتَرَبَّصُوا
“বলুন—যদি তোমাদের পিতা, সন্তান, সম্পদ, ব্যবসা এবং আল্লাহ ও তাঁর পথে সংগ্রামের চেয়ে প্রিয় হয়ে ওঠে—তবে অপেক্ষা করো।” (সূরা আত-তাওবা ৯:২৪)
এখানে রাসূলের নাম এসেছে, কিন্তু ভালোবাসার কেন্দ্র হিসেবে নয়; বরং আল্লাহর পথে থাকার অংশ হিসেবে। চূড়ান্ত ভালোবাসার স্থান কেবল আল্লাহর।
সুতরাং বাস্তবতা হলো—এই হাদিসটি একটি প্রেক্ষিতভিত্তিক, উপদেশমূলক বক্তব্য। রাসূল সাঃ তাঁর বার্তার গুরুত্ব বোঝাতে আবেগী ভাষা ব্যবহার করেছেন। কিন্তু এটিকে ঈমানের চূড়ান্ত সংজ্ঞা বানানো কুরআনের ভারসাম্যের বিরুদ্ধে যায়।
কুরআনের দৃষ্টিতে—
ঈমান মানে আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস,
ইসলাম মানে আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ,
আর রাসূলের মর্যাদা মানে—তিনি যে কুরআন নিয়ে এসেছেন, সেটাকে প্রাধান্য দেওয়া।
রাসূলকে ভালোবাসা ঈমানের ফল হতে পারে,
কিন্তু ঈমানের শর্ত নয়।
শর্ত একটাই—
কুরআনই মীযান।
যে ব্যাখ্যা ঈমানকে আবেগের পরীক্ষায় নামিয়ে আনে,
যে ব্যাখ্যা মানুষকে মানুষের সঙ্গে তুলনায় দাঁড় করায়—
তা কুরআনের মানদণ্ডে চূড়ান্ত হতে পারে না,
যতই তা প্রচলিত বা আবেগঘন হোক।
