• শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:০৮ অপরাহ্ন

সূর্য অস্ত গেলে আল্লাহর আরশের নিচে সিজদা করে

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ১২৩ Time View
Update : শনিবার, ১০ জানুয়ারি, ২০২৬


সূর্য অস্ত গেলে আল্লাহর আরশের নিচে সিজদা করে—এই হাদিস কুরআনের মানদণ্ডে বিচার

লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ

ইসলামে মহাজাগতিক বাস্তবতা ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে কুরআন অত্যন্ত সংযত, সুনির্দিষ্ট এবং বাস্তবমুখী। সূর্য, চন্দ্র, গ্রহ–নক্ষত্র—সবকিছুকে কুরআন একটি সুসংবদ্ধ নিয়মের অধীন চলমান ব্যবস্থা হিসেবে উপস্থাপন করে। কিন্তু “সূর্য অস্ত গেলে আল্লাহর আরশের নিচে গিয়ে সিজদা করে”—এই হাদিসটি আক্ষরিকভাবে গ্রহণ করলে কুরআনের সেই সুসংহত মহাজাগতিক ধারণার সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষ সৃষ্টি হয়।

সহিহ গ্রন্থে বর্ণিত হাদিসটি হলো—

হাদিসের আরবি পাঠ:

عَنْ أَبِي ذَرٍّ قَالَ: قَالَ النَّبِيُّ ﷺ لِي حِينَ غَرَبَتِ الشَّمْسُ: «أَتَدْرِي أَيْنَ تَذْهَبُ؟» قُلْتُ: اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَعْلَمُ. قَالَ: «فَإِنَّهَا تَذْهَبُ حَتَّى تَسْجُدَ تَحْتَ الْعَرْشِ، فَتَسْتَأْذِنَ فَيُؤْذَنَ لَهَا…»

সূত্র:
সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৩১৯৯, ৭৪২৪
সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৫৯

বাংলা অর্থ:
আবু যার (রা.) থেকে বর্ণিত—নবী ﷺ আমাকে জিজ্ঞেস করলেন, যখন সূর্য অস্ত গেল,
“তুমি কি জানো সূর্য কোথায় যায়?”
আমি বললাম, আল্লাহ ও তাঁর রাসূলই ভালো জানেন।
তিনি বললেন,
“সূর্য যায় এবং আরশের নিচে গিয়ে সিজদা করে। তারপর অনুমতি চায়, আর তাকে অনুমতি দেওয়া হয়…”

এই হাদিসটি আক্ষরিকভাবে গ্রহণ করলে প্রথম যে প্রশ্নটি উঠে আসে তা হলো—
সূর্য কি একটি সচেতন সত্তা, যা পৃথিবীর দৃষ্টিসীমা ছাড়িয়ে ‘গিয়ে’ আরশের নিচে পৌঁছে, সিজদা করে, আবার ফিরে আসে?

কুরআনের মহাজাগতিক বর্ণনা এর সম্পূর্ণ বিপরীত চিত্র তুলে ধরে।

কুরআন ঘোষণা করে—সূর্য একটি নির্দিষ্ট কক্ষপথে চলমান জ্যোতিষ্ক।

সূরা ইয়াসিন ৩৬:৩৮

وَالشَّمْسُ تَجْرِي لِمُسْتَقَرٍّ لَّهَا

“সূর্য তার নির্ধারিত পথে চলমান।”

এখানে “তাজরী” (চলমান) শব্দটি ব্যবহৃত হয়েছে—যার অর্থ ধারাবাহিক গতি, নিয়মতান্ত্রিক চলাচল। কোথাও বলা হয়নি—সূর্য প্রতিদিন অস্ত গিয়ে অন্য কোথাও ‘চলে যায়’, তারপর আবার ফিরে আসে।

আরও স্পষ্টভাবে কুরআন জানিয়ে দেয়—দিন ও রাতের পরিবর্তন সূর্যের গমনাগমনের কারণে নয়, বরং পৃথিবীর ব্যবস্থার ফল।

সূরা ফাতির ৩৫:১৩

يُولِجُ اللَّيْلَ فِي النَّهَارِ وَيُولِجُ النَّهَارَ فِي اللَّيْلِ

“তিনি রাতকে দিনে প্রবেশ করান এবং দিনকে রাতে প্রবেশ করান।”

অর্থাৎ সূর্যের “অস্ত যাওয়া” একটি আপেক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গি—পৃথিবীর এক অংশে আলো না পড়ার নামই অস্ত। সূর্য বাস্তবে কোথাও যায় না।

আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—কুরআন “সিজদা” শব্দটি মহাজাগতিক বস্তুর জন্য ব্যবহার করলেও, তা কখনোই স্থানান্তর বা শারীরিক নত হওয়ার অর্থে নয়।

সূরা আর-রহমান ৫৫:৬

وَالنَّجْمُ وَالشَّجَرُ يَسْجُدَانِ

“নক্ষত্র ও বৃক্ষ সিজদা করে।”

এখানে বৃক্ষ কীভাবে সিজদা করে? মাথা নুইয়ে? স্থান পরিবর্তন করে? না—এটি তাদের সৃষ্টিগত নিয়ম মেনে চলার রূপক ভাষা। কুরআনের “সিজদা” মানে—আল্লাহ নির্ধারিত বিধানের প্রতি সম্পূর্ণ অনুগত থাকা।

কুরআন নিজেই এই বিষয়টি পরিষ্কার করে—

সূরা আল-হাজ্জ ২২:১৮

أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يَسْجُدُ لَهُ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ وَالشَّمْسُ وَالْقَمَرُ

“তুমি কি দেখ না—আসমান ও জমিনের সবাই, সূর্য ও চন্দ্র—আল্লাহর জন্য সিজদা করে?”

এই সিজদা কোনো দৃশ্যমান দৈহিক ক্রিয়া নয়; এটি অস্তিত্বগত আনুগত্য। সূর্য তার কক্ষপথ ভাঙে না—এটাই তার সিজদা।

অতএব “সূর্য আরশের নিচে গিয়ে সিজদা করে”—এই বক্তব্যটি যদি আক্ষরিক অর্থে নেওয়া হয়, তবে তা কুরআনের তিনটি মৌলিক নীতির সঙ্গে সংঘর্ষে যায়—

১) সূর্যের চলাচল নিয়মতান্ত্রিক ও অবিচ্ছিন্ন
২) দিন–রাত আপেক্ষিক বাস্তবতা
৩) মহাজাগতিক সিজদা রূপক, স্থানগত নয়

আরও বড় সমস্যা হলো—এই হাদিসটি আক্ষরিকভাবে গ্রহণ করলে একটি প্রাক-বৈজ্ঞানিক বিশ্বচিত্র তৈরি হয়, যেখানে সূর্য প্রতিদিন পৃথিবীর চারপাশে ঘোরে, অস্ত যায়, অন্য কোথাও যায়—যা কুরআনের ভাষার সঙ্গেও মেলে না।

কুরআন কখনো বলেনি—সূর্য যায়, দাঁড়ায়, অনুমতি নেয়, আবার ফিরে আসে। বরং কুরআন বলেছে—

সূরা আল-আম্বিয়া ২১:৩৩

كُلٌّ فِي فَلَكٍ يَسْبَحُونَ

“প্রত্যেকেই নিজ নিজ কক্ষপথে ভাসমান।”

এই আয়াতের পর “সূর্য গিয়ে আরশের নিচে থামে”—এমন ধারণা টিকতে পারে না।

অতএব কুরআনের মানদণ্ডে দাঁড়িয়ে সিদ্ধান্ত একটাই—

এই হাদিসটি

  • হয় রূপক ভাষায় বলা,
  • নয়তো শ্রোতার বোধগম্যতার স্তরে উপমামূলক ব্যাখ্যা,
  • কিন্তু আক্ষরিক মহাজাগতিক বাস্তবতা হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়

কারণ কুরআন সূর্যকে কখনোই “যাওয়া–আসা করা সচেতন বস্তু” হিসেবে উপস্থাপন করেনি, বরং একটি নিখুঁত নিয়মের অধীন সৃষ্টির অংশ হিসেবে তুলে ধরেছে।

কুরআনই মীযান।
সূর্যও তার নিয়মে সিজদায়— কিন্তু সে আরশের নিচে গিয়ে নয়, বরং তার কক্ষপথ অটুট রেখে।

আর যে বর্ণনা কুরআনের এই সামগ্রিক সত্যের সঙ্গে টেকে না— তা ধর্মের মানদণ্ড হতে পারে না।

Print this entry


আপনার মতামত লিখুন :
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x