লিখক: মাহাতাব আকন্দ
ইসলামে ন্যায়বিচার কোনো আনুষ্ঠানিকতা নয়; এটি আল্লাহর অন্যতম মৌলিক গুণ। কুরআন বিচার, সিদ্ধান্ত ও কর্তৃত্বের প্রশ্নে এতটাই কঠোর যে, সেখানে সামান্য জুলুমও ক্ষমার তালিকায় পড়ে না। অথচ একটি বহুল প্রচলিত হাদিসে বলা হয়—একজন বিচারক সঠিক রায় দিলে দুই সওয়াব, আর ভুল রায় দিলেও এক সওয়াব পাবেন। এই বক্তব্যটি শুনতে উৎসাহব্যঞ্জক মনে হলেও, কুরআনের ন্যায়বিচার–নীতির আলোকে এটি গভীর প্রশ্নের জন্ম দেয়।
হাদিসটি হলো—
عَنْ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ قَالَ سَمِعْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَقُولُ:
«إِذَا حَكَمَ الْحَاكِمُ فَاجْتَهَدَ، ثُمَّ أَصَابَ، فَلَهُ أَجْرَانِ، وَإِذَا حَكَمَ فَاجْتَهَدَ، ثُمَّ أَخْطَأَ، فَلَهُ أَجْرٌ»
সূত্র:
সহিহ বুখারী, হাদিস নং ৭৩৫২
সহিহ মুসলিম, হাদিস নং ১৭১৬
বাংলা অর্থ:
আমর ইবনুল আস (রা.) বলেন—আমি রাসূলুল্লাহ সাঃ–কে বলতে শুনেছি:
“যখন কোনো বিচারক ইজতিহাদ করে বিচার করে এবং সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছে, তার জন্য রয়েছে দুইটি পুরস্কার। আর সে যখন ইজতিহাদ করে বিচার করতে গিয়ে ভুল করে, তবুও তার জন্য রয়েছে একটি পুরস্কার।”
এই হাদিসটি আক্ষরিকভাবে গ্রহণ করলে প্রথম যে প্রশ্নটি উঠে আসে তা হলো—
ভুল সিদ্ধান্তের জন্য পুরস্কার কীভাবে ন্যায়বিচারের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয়?
কুরআনের দৃষ্টিতে বিচার কোনো ব্যক্তিগত সাধনা নয়; এটি মানুষের অধিকার–সম্পর্কিত একটি গুরুতর আমানত। কুরআন বিচারকে সরাসরি জুলুম ও ইনসাফের সঙ্গে যুক্ত করেছে।
সূরা আন-নিসা ৪:৫৮
إِنَّ اللَّهَ يَأْمُرُكُمْ أَنْ تُؤَدُّوا الْأَمَانَاتِ إِلَىٰ أَهْلِهَا وَإِذَا حَكَمْتُمْ بَيْنَ النَّاسِ أَنْ تَحْكُمُوا بِالْعَدْلِ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন—আমানত তার প্রাপকের কাছে পৌঁছে দিতে এবং মানুষের মধ্যে বিচার করলে ন্যায়ের সঙ্গে বিচার করতে।”
এখানে কোথাও বলা হয়নি—“চেষ্টা করলেই যথেষ্ট”। বরং বলা হয়েছে—ন্যায়ের সঙ্গে বিচার করতে হবে। যদি বিচার ভুল হয় এবং তার ফলে কোনো মানুষ ক্ষতিগ্রস্ত হয়, তাহলে সেই ক্ষতির দায় কার?
কুরআন এই বিষয়ে আরও কঠোর—
সূরা আল-মায়েদা ৫:৪৫
وَمَنْ لَمْ يَحْكُمْ بِمَا أَنْزَلَ اللَّهُ فَأُولَٰئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ
“যারা আল্লাহ যা নাজিল করেছেন তার দ্বারা বিচার করে না—তারাই যালিম।”
এই আয়াত বিচারকের নিয়ত নয়, বিচারকের ফলাফল ও মানদণ্ড দেখছে। এখানে “ভুল হলেও সওয়াব”–এর কোনো অবকাশ নেই। ভুল বিচার যদি মানুষের হক নষ্ট করে, তবে তা কুরআনের ভাষায় জুলুম।
কুরআনের আরেকটি মৌলিক নীতি হলো—কেউ অন্যের ক্ষতির বিনিময়ে পুরস্কৃত হতে পারে না।
সূরা আন-নাজম ৫৩:৩৯
وَأَنْ لَيْسَ لِلْإِنْسَانِ إِلَّا مَا سَعَىٰ
“মানুষ তাই পায়, যা সে নিজে চেষ্টা করে।”
এখানে চেষ্টা ও ফলাফল আলাদা করা হয়নি। চেষ্টা যদি ভুল ফল দেয় এবং সেই ফলে অন্যায় ঘটে, তাহলে সেই চেষ্টার জন্য সওয়াব ঘোষণা করা কুরআনিক নীতির সঙ্গে খাপ খায় না।
আরও গুরুত্বপূর্ণ আয়াত—
সূরা আল-বাকারা ২:২৮৬
لَا تُجْزَوْنَ إِلَّا مَا كُنْتُمْ تَعْمَلُونَ
“তোমরা যা করতে, তারই প্রতিদান দেওয়া হবে।”
ভুল বিচারও একটি “কাজ”। যদি সেই কাজ অন্যায় হয়, তবে তার প্রতিদান কীভাবে পুরস্কার হতে পারে?
এখানে কেউ বলতে পারে—“ইজতিহাদ মানে সর্বোচ্চ চেষ্টা।” কিন্তু কুরআন কোথাও বলেনি—সর্বোচ্চ চেষ্টা করলেই ফলাফল গৌণ হয়ে যায়। বিশেষ করে বিচার ও শাসনের ক্ষেত্রে কুরআন ফলাফলকেই মূল বিবেচনায় আনে।
এই হাদিসটি আক্ষরিকভাবে গ্রহণ করলে একটি ভয়ংকর নৈতিক সমস্যা তৈরি হয়—
একজন বিচারক যদি ভুল রায় দিয়ে কারও জীবন, সম্পদ বা সম্মান নষ্ট করে, তবুও তিনি সওয়াব পাবেন—এমন ধারণা বিচারব্যবস্থাকে জবাবদিহিহীন করে তোলে। অথচ কুরআন বিচারকদের সবচেয়ে বেশি জবাবদিহির আওতায় এনেছে।
সূরা হূদ ১১:১৮
إِنَّهُ لَا يُفْلِحُ الظَّالِمُونَ
“নিশ্চয়ই যালিমরা সফল হয় না।”
ভুল বিচার যদি জুলুম হয়—and কুরআনের দৃষ্টিতে সেটাই—তাহলে সেই কাজের জন্য পুরস্কারের ঘোষণা কুরআনের এই ঘোষণার সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।
অতএব কুরআনের মানদণ্ডে দাঁড়িয়ে বিষয়টি স্পষ্ট—
এই হাদিসটি
কারণ কুরআনে বিচারকের দায়িত্ব—
চেষ্টা করা নয়,
ভালো ইচ্ছা দেখানো নয়,
বরং ন্যায় নিশ্চিত করা।
কুরআন কোথাও বলেনি—ভুলেরও সওয়াব আছে।
বরং বলেছে—ন্যায় থেকে বিচ্যুতি মানেই জুলুম।
কুরআনই মীযান।
আর যে বর্ণনা ন্যায়বিচারের সেই মীযানে টেকে না—
তা যতই প্রচলিত হোক,
তা দিয়ে আল্লাহর বিচারনীতি নির্ধারণ করা যায় না।
