• বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৫:৪৬ অপরাহ্ন

তাফসীর | সূরা ৬ : আয়াত ১৪১

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ১১২ Time View
Update : বুধবার, ২১ জানুয়ারি, ২০২৬


তাফসীর | সূরা আল-আন‘আম : আয়াত ১৪১

তাফসীর by, Friends of Quran Foundation


আরবি আয়াত

وَهُوَ الَّذِي أَنشَأَ جَنَّاتٍ مَّعْرُوشَاتٍ وَغَيْرَ مَعْرُوشَاتٍ وَالنَّخْلَ وَالزَّرْعَ مُخْتَلِفًا أُكُلُهُ وَالزَّيْتُونَ وَالرُّمَّانَ مُتَشَابِهًا وَغَيْرَ مُتَشَابِهٍ ۚ كُلُوا مِن ثَمَرِهِ إِذَا أَثْمَرَ وَآتُوا حَقَّهُ يَوْمَ حَصَادِهِ ۖ وَلَا تُسْرِفُوا ۚ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ


অনুবাদ (ভাবানুবাদ)

“তিনিই সৃষ্টি করেছেন বাগান—কিছু মাচানযুক্ত, কিছু মাচানবিহীন; খেজুরগাছ ও শস্য—যার ফল ভিন্ন ভিন্ন; জলপাই ও ডালিম—যেগুলো দেখতে মিল আছে, অথচ স্বাদে ভিন্ন। তোমরা এর ফল ভক্ষণ করো যখন তা ফলবান হয়; আর ফসল কাটার দিনই তার প্রাপ্য অধিকার আদায় করো। আর অপচয় কোরো না—নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।”


১. ভূমিকা: আয়াতটি কেন গুরুত্বপূর্ণ

সূরা আল-আন‘আম মূলত তাওহীদ ও শিরক–সংক্রান্ত ভ্রান্ত ধারণা ভাঙার সূরা। মানুষ কীভাবে আল্লাহর সৃষ্টি ব্যবহার করবে, কোথায় সীমা মানবে, আর কোথায় অন্যায় করবে—এই সূরায় সেসব খুব বাস্তব উদাহরণ দিয়ে দেখানো হয়েছে।

১৪১ নম্বর আয়াতটি এই সূরার অর্থনৈতিক নৈতিকতার কেন্দ্রবিন্দু। এখানে আল্লাহ মানুষের সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গায় কথা বলেন—
👉 খাদ্য,
👉 উৎপাদন,
👉 ভোগ,
👉 এবং মালিকানা।

এই আয়াত বুঝতে না পারলে মানুষ সহজেই মনে করে—“ফসল আমার, যা ইচ্ছা করব।”
কুরআন এই ধারণাটাই ভাঙে।


২. আয়াতের কাঠামো: তিনটি ধাপ

এই আয়াত তিনটি স্পষ্ট ধাপে কথা বলে—

  1. সৃষ্টির ঘোষণা
  2. ভোগের অনুমতি
  3. ভোগের সীমা ও সামাজিক দায়

এই তিন ধাপ একসাথে না বুঝলে আয়াতের মর্ম ধরা পড়ে না।


৩. সৃষ্টির ঘোষণা: মালিকানা কার?

আয়াত শুরুই হয়—

“তিনিই সৃষ্টি করেছেন…”

বাগান মাচানযুক্ত হোক বা না হোক,
ফসলের স্বাদ আলাদা হোক বা একই রকম দেখাক—
👉 সবকিছুর উৎস আল্লাহ।

এখানে আল্লাহ মানুষকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন—

  • উৎপাদনের কৃতিত্ব চাষির শ্রমে আছে,
  • কিন্তু সৃষ্টির মালিকানা আল্লাহর

এই ঘোষণার উদ্দেশ্য একটাই—
👉 মানুষ যেন নিজেকে একচ্ছত্র মালিক মনে না করে।


৪. ভোগের অনুমতি: কুরআন ভোগবিরোধী নয়

এরপর আল্লাহ বলেন—

“তোমরা এর ফল ভক্ষণ করো যখন তা ফলবান হয়”

এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
কুরআন কখনো বলে না—ভোগ কোরো না, খেয়ো না, উপভোগ কোরো না।

বরং বলে—

  • খাও
  • ব্যবহার করো
  • উপভোগ করো

কিন্তু এখানেই আয়াত থামে না।


৫. মূল কেন্দ্র: “ফসল কাটার দিনই তার হক দাও”

এখানেই আয়াতের আসল কথা—

وَآتُوا حَقَّهُ يَوْمَ حَصَادِهِ

এখানে তিনটি শব্দ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—

(ক) حَقَّهُ (হক)

হক মানে দান নয়, দয়া নয়, সদকা নয়।
হক মানে—
👉 এমন অধিকার, যা আদায় না করলে অন্যায় হয়।

কুরআন অন্যত্র বলে—

“তাদের সম্পদের মধ্যে দরিদ্র ও বঞ্চিতের একটি অধিকার রয়েছে।”
(যারিয়াত ৫১:১৯)

অতএব ফসলের মধ্যে অন্যের অংশ আগে থেকেই আছে


(খ) آتُوا (দাও)

এটি ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতি নয়,
এটি তাৎক্ষণিক কাজের নির্দেশ।


(গ) يَوْمَ حَصَادِهِ (ফসল কাটার দিনই)

এখানে কুরআন সময় বেঁধে দিয়েছে।

কেন?

কারণ—

  • ক্ষুধা আজকের
  • শ্রম আজকের
  • প্রয়োজন আজকের

অতএব অধিকারও আজকের।

এই আয়াত গুদামদারি, দেরি করা, পরে দেব—এই মানসিকতাকে বাতিল করে


৬. এই “হক” কাদের?

কুরআন নাম ধরে বলেনি, কিন্তু কুরআনের সামগ্রিক নির্দেশনায় পরিষ্কার—

  1. দরিদ্র ও খাদ্য-অসুরক্ষিত মানুষ
  2. শ্রমিক ও অংশগ্রহণকারীরা
  3. স্থানীয় সমাজ—যাদের জীবনে এই ফসল খাদ্য

এটা দয়া নয়, এটা খাদ্য-ন্যায়বিচার


৭. এখানে উশর বা এক-দশমাংশ কেন নেই?

কারণ কুরআন এখানে সংখ্যা দিচ্ছে না,
নীতি দিচ্ছে।

  • কত দেব—তা নির্ভর করবে
    • ফসলের পরিমাণ
    • আশপাশের প্রয়োজন
    • বাস্তব পরিস্থিতির ওপর

উশর (১/১০) বা অন্য হারগুলো
👉 পরবর্তী ফিকহি প্রয়োগ,
👉 কুরআনের আয়াত নয়

কুরআন ইচ্ছা করলে সংখ্যা দিত—কিন্তু দেয়নি।
কারণ ক্ষুধা সব জায়গায় একরকম নয়।


৮. “অপচয় কোরো না”—এর প্রকৃত অর্থ

শেষে বলা হয়েছে—

“অপচয় কোরো না”

এখানে অপচয় মানে শুধু খাবার ফেলা নয়।

কুরআনের ভাষায় অপচয় হলো—

  • অন্যের হক আটকে রেখে নিজের ভোগ বাড়ানো
  • ফসল জমিয়ে রেখে দাম বাড়ানো
  • সমাজে অভাব রেখে ব্যক্তিগত প্রাচুর্য

এই কারণেই আল্লাহ বলেন—
তিনি অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।


৯. আয়াতের সারকথা (সংক্ষেপে)

সূরা ৬:১৪১ আমাদের বলে—

  • ফসল আল্লাহর দান
  • ভোগ বৈধ
  • কিন্তু ফসলের মধ্যে অন্যের অধিকার আছে
  • সেই অধিকার ফসল কাটার দিনই দিতে হবে
  • দেরি, গুদামদারি ও লোভ—সবই অপচয়

১০. উপসংহার

এই আয়াত কোনো উপদেশমূলক কথা নয়—
এটি খাদ্য ও সম্পদের ন্যায়বিচারের আইন

যে সমাজ এই আয়াত মানে—

  • সেখানে ক্ষুধা লুকিয়ে থাকে না
  • খাদ্য পচে না
  • সম্পদ কুক্ষিগত হয় না

আর যে সমাজ এটি মানে না—

সে সমাজ যত ধর্মীয়ই দেখাক,
কুরআনের চোখে সে সমাজ অন্যায়ভিত্তিক

এটাই সূরা আল-আন‘আম : ১৪১–এর পূর্ণ, কেন্দ্রীয় তাফসীর।

Print this entry


আপনার মতামত লিখুন :
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x