তাফসীর by, Friends of Quran Foundation
وَهُوَ الَّذِي أَنشَأَ جَنَّاتٍ مَّعْرُوشَاتٍ وَغَيْرَ مَعْرُوشَاتٍ وَالنَّخْلَ وَالزَّرْعَ مُخْتَلِفًا أُكُلُهُ وَالزَّيْتُونَ وَالرُّمَّانَ مُتَشَابِهًا وَغَيْرَ مُتَشَابِهٍ ۚ كُلُوا مِن ثَمَرِهِ إِذَا أَثْمَرَ وَآتُوا حَقَّهُ يَوْمَ حَصَادِهِ ۖ وَلَا تُسْرِفُوا ۚ إِنَّهُ لَا يُحِبُّ الْمُسْرِفِينَ
“তিনিই সৃষ্টি করেছেন বাগান—কিছু মাচানযুক্ত, কিছু মাচানবিহীন; খেজুরগাছ ও শস্য—যার ফল ভিন্ন ভিন্ন; জলপাই ও ডালিম—যেগুলো দেখতে মিল আছে, অথচ স্বাদে ভিন্ন। তোমরা এর ফল ভক্ষণ করো যখন তা ফলবান হয়; আর ফসল কাটার দিনই তার প্রাপ্য অধিকার আদায় করো। আর অপচয় কোরো না—নিশ্চয়ই তিনি অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।”
সূরা আল-আন‘আম মূলত তাওহীদ ও শিরক–সংক্রান্ত ভ্রান্ত ধারণা ভাঙার সূরা। মানুষ কীভাবে আল্লাহর সৃষ্টি ব্যবহার করবে, কোথায় সীমা মানবে, আর কোথায় অন্যায় করবে—এই সূরায় সেসব খুব বাস্তব উদাহরণ দিয়ে দেখানো হয়েছে।
১৪১ নম্বর আয়াতটি এই সূরার অর্থনৈতিক নৈতিকতার কেন্দ্রবিন্দু। এখানে আল্লাহ মানুষের সবচেয়ে স্পর্শকাতর জায়গায় কথা বলেন—
👉 খাদ্য,
👉 উৎপাদন,
👉 ভোগ,
👉 এবং মালিকানা।
এই আয়াত বুঝতে না পারলে মানুষ সহজেই মনে করে—“ফসল আমার, যা ইচ্ছা করব।”
কুরআন এই ধারণাটাই ভাঙে।
এই আয়াত তিনটি স্পষ্ট ধাপে কথা বলে—
এই তিন ধাপ একসাথে না বুঝলে আয়াতের মর্ম ধরা পড়ে না।
আয়াত শুরুই হয়—
“তিনিই সৃষ্টি করেছেন…”
বাগান মাচানযুক্ত হোক বা না হোক,
ফসলের স্বাদ আলাদা হোক বা একই রকম দেখাক—
👉 সবকিছুর উৎস আল্লাহ।
এখানে আল্লাহ মানুষকে মনে করিয়ে দিচ্ছেন—
এই ঘোষণার উদ্দেশ্য একটাই—
👉 মানুষ যেন নিজেকে একচ্ছত্র মালিক মনে না করে।
এরপর আল্লাহ বলেন—
“তোমরা এর ফল ভক্ষণ করো যখন তা ফলবান হয়”
এটা খুব গুরুত্বপূর্ণ।
কুরআন কখনো বলে না—ভোগ কোরো না, খেয়ো না, উপভোগ কোরো না।
বরং বলে—
কিন্তু এখানেই আয়াত থামে না।
এখানেই আয়াতের আসল কথা—
وَآتُوا حَقَّهُ يَوْمَ حَصَادِهِ
এখানে তিনটি শব্দ অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ—
হক মানে দান নয়, দয়া নয়, সদকা নয়।
হক মানে—
👉 এমন অধিকার, যা আদায় না করলে অন্যায় হয়।
কুরআন অন্যত্র বলে—
“তাদের সম্পদের মধ্যে দরিদ্র ও বঞ্চিতের একটি অধিকার রয়েছে।”
(যারিয়াত ৫১:১৯)
অতএব ফসলের মধ্যে অন্যের অংশ আগে থেকেই আছে।
এটি ভবিষ্যৎ প্রতিশ্রুতি নয়,
এটি তাৎক্ষণিক কাজের নির্দেশ।
এখানে কুরআন সময় বেঁধে দিয়েছে।
কেন?
কারণ—
অতএব অধিকারও আজকের।
এই আয়াত গুদামদারি, দেরি করা, পরে দেব—এই মানসিকতাকে বাতিল করে।
কুরআন নাম ধরে বলেনি, কিন্তু কুরআনের সামগ্রিক নির্দেশনায় পরিষ্কার—
এটা দয়া নয়, এটা খাদ্য-ন্যায়বিচার।
কারণ কুরআন এখানে সংখ্যা দিচ্ছে না,
নীতি দিচ্ছে।
উশর (১/১০) বা অন্য হারগুলো
👉 পরবর্তী ফিকহি প্রয়োগ,
👉 কুরআনের আয়াত নয়।
কুরআন ইচ্ছা করলে সংখ্যা দিত—কিন্তু দেয়নি।
কারণ ক্ষুধা সব জায়গায় একরকম নয়।
শেষে বলা হয়েছে—
“অপচয় কোরো না”
এখানে অপচয় মানে শুধু খাবার ফেলা নয়।
কুরআনের ভাষায় অপচয় হলো—
এই কারণেই আল্লাহ বলেন—
তিনি অপচয়কারীদের ভালোবাসেন না।
সূরা ৬:১৪১ আমাদের বলে—
এই আয়াত কোনো উপদেশমূলক কথা নয়—
এটি খাদ্য ও সম্পদের ন্যায়বিচারের আইন।
যে সমাজ এই আয়াত মানে—
আর যে সমাজ এটি মানে না—
সে সমাজ যত ধর্মীয়ই দেখাক,
কুরআনের চোখে সে সমাজ অন্যায়ভিত্তিক।
এটাই সূরা আল-আন‘আম : ১৪১–এর পূর্ণ, কেন্দ্রীয় তাফসীর।
