(আন‘আম ৬:১১৪–১১৫-এর আলোকে কুরআনভিত্তিক তাসীর। তাফসীর – Friends of Quran Foundation)
কুরআন নিজেই নিজের পরিচয় দিয়েছে—কী ধরনের কিতাব এটি, কী উদ্দেশ্যে এটি নাজিল হয়েছে, এবং মানুষের জন্য এটি কতটুকু যথেষ্ট। অথচ ইতিহাসের বিভিন্ন পর্যায়ে আমরা দেখি, কুরআনের এই আত্মপরিচয়কে পাশ কাটিয়ে মানুষ কুরআনের ওপর এমন সব ব্যাখ্যা, কাঠামো ও কর্তৃত্ব চাপিয়েছে, যা শেষ পর্যন্ত কুরআনের দাবিকেই প্রশ্নবিদ্ধ করে তোলে। সূরা আল-আন‘আমের ১১৪–১১৫ নম্বর আয়াত এই জায়গায় এসে একেবারে স্পষ্ট ভাষায় ঘোষণা করে দেয়—আল্লাহর কিতাব পূর্ণ, সুস্পষ্ট ও চূড়ান্ত; এর ওপর মানুষের মনগড়া ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই।
এই ঘোষণা কোনো বিচ্ছিন্ন বক্তব্য নয়। কুরআনের বহু আয়াতে একই সত্য ভিন্ন ভিন্ন ভাষায় পুনরুক্ত হয়েছে। আন‘আম ৬:১১৪–১১৫ মূলত সেই সব ঘোষণার একটি কেন্দ্রীভূত রূপ।
আল্লাহ বলেন—
أَفَغَيْرَ اللَّهِ أَبْتَغِي حَكَمًا
“আমি কি আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে বিচারক হিসেবে খুঁজব?”
(আন‘আম ৬:১১৪)
এই প্রশ্নের ভেতরেই একটি মৌলিক নীতি ঘোষণা করা হয়েছে—দ্বীনের ক্ষেত্রে চূড়ান্ত বিচারক একজনই। কুরআন এখানে “হাকাম” শব্দ ব্যবহার করেছে, যার অর্থ কেবল আইনি বিচারক নয়; বরং সত্য-মিথ্যা, হালাল-হারাম, সঠিক-বেঠিক নির্ধারণের সর্বোচ্চ কর্তৃত্ব। এই আয়াত সরাসরি সেই প্রবণতাকে প্রশ্নবিদ্ধ করে, যেখানে মানুষ কুরআনের পাশাপাশি অন্য কোনো উৎসকে চূড়ান্ত মানদণ্ড বানায়।
এরপর আল্লাহ বলেন—
وَهُوَ الَّذِي أَنزَلَ إِلَيْكُمُ الْكِتَابَ مُفَصَّلًا
“তিনি তো সেই সত্তা, যিনি তোমাদের কাছে কিতাব নাজিল করেছেন—সম্পূর্ণভাবে বিস্তারিত করা অবস্থায়।”
(আন‘আম ৬:১১৪)
এখানে مُفَصَّلًا (মুফাসসাল) শব্দটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কুরআন নিজেই বলছে—এই কিতাব অস্পষ্ট নয়, খণ্ডিত নয়, অসম্পূর্ণ নয়। দ্বীনের জন্য যা প্রয়োজনীয়, তা এতে স্পষ্টভাবে আলাদা করে দেওয়া হয়েছে। এই বক্তব্যের সাথে কুরআনের অন্য ঘোষণাগুলো মিলিয়ে দেখলে বিষয়টি আরও পরিষ্কার হয়।
আল্লাহ অন্যত্র বলেন—
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَابَ تِبْيَانًا لِكُلِّ شَيْءٍ
“আমি তোমার প্রতি কিতাব নাজিল করেছি—সব কিছুর সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা হিসেবে।”
(নাহল ১৬:৮৯)
এখানে “সব কিছু” বলতে দুনিয়ার প্রতিটি খুঁটিনাটি প্রযুক্তিগত তথ্য নয়, বরং হেদায়াত, ন্যায়, দ্বীন ও জীবনপথের জন্য প্রয়োজনীয় সবকিছু। এই আয়াত আন‘আম ৬:১১৪-এর দাবিকে শক্তিশালী করে—কুরআন নিজেকে অপর্যাপ্ত বলে না।
এরপর আন‘আম ৬:১১৪–এ আল্লাহ আরও বলেন—
الَّذِينَ آتَيْنَاهُمُ الْكِتَابَ يَعْلَمُونَ أَنَّهُ مُنَزَّلٌ مِّن رَّبِّكَ بِالْحَقِّ
“যাদের আমি কিতাব দিয়েছি, তারা জানে—এটি তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকেই সত্যসহ নাজিল হয়েছে।”
অর্থাৎ, কুরআনের সত্যতা ও পরিপূর্ণতা কোনো আবেগী দাবি নয়; এটি পূর্ববর্তী কিতাবধারীরাও জানে। সমস্যা জ্ঞানে নয়, সমস্যা মানসিকতায়।
এরপর আসে চূড়ান্ত ঘোষণা—
وَتَمَّتْ كَلِمَتُ رَبِّكَ صِدْقًا وَعَدْلًا
“তোমার প্রতিপালকের বাণী সত্য ও ন্যায়ের দিক থেকে পরিপূর্ণ হয়েছে।”
(আন‘আম ৬:১১৫)
এই আয়াতটি অত্যন্ত ভারী। এখানে আল্লাহ বলছেন—তাঁর বাণী তাম্মাত (সম্পূর্ণ হয়েছে)। অর্থাৎ, এতে কোনো ঘাটতি নেই, কোনো সংশোধনের প্রয়োজন নেই। এই বক্তব্যের সঙ্গে কুরআনের অন্য আয়াতগুলো মিলিয়ে দেখলে একটি সুস্পষ্ট নীতি দাঁড়িয়ে যায়।
যেমন—
لَا مُبَدِّلَ لِكَلِمَاتِ اللَّهِ
“আল্লাহর বাণী পরিবর্তন করার কেউ নেই।”
(আন‘আম ৬:১১৫; ইউনুস ১০:৬৪)
এখানে “পরিবর্তন” শুধু শব্দ বদলানো নয়; বরং অর্থ, সীমা, উদ্দেশ্য ও ভারসাম্য বদলে দেওয়াও এর অন্তর্ভুক্ত। যখন মানুষ কুরআনের স্পষ্ট বক্তব্যের ওপর অতিরিক্ত বিধান চাপায়, তখন সে কার্যত আল্লাহর বাণীর সীমা লঙ্ঘন করে।
এই কারণেই কুরআন বারবার সতর্ক করে—
اتَّبِعُوا مَا أُنزِلَ إِلَيْكُم مِّن رَّبِّكُمْ وَلَا تَتَّبِعُوا مِن دُونِهِ أَوْلِيَاءَ
“তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ থেকে যা নাজিল হয়েছে, তা অনুসরণ করো; তাঁর বাইরে অন্য অভিভাবকদের অনুসরণ কোরো না।”
(আ‘রাফ ৭:৩)
এই আয়াত স্পষ্ট করে দেয়—সমস্যা শুধু মূর্তিপূজা নয়; সমস্যা হলো আল্লাহর নাজিলকৃত নির্দেশের বাইরে অন্য কর্তৃত্ব গ্রহণ করা।
কুরআন আরও বলে—
إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ
“বিধান দেওয়ার অধিকার কেবল আল্লাহরই।”
(ইউসুফ ১২:৪০)
এই আয়াত আন‘আম ৬:১১৪-এর প্রশ্নের সরাসরি জবাব। যখন আল্লাহ নিজেই বিধানদাতা, তখন মানুষ কীভাবে তার পাশে নিজের ব্যাখ্যাকে চূড়ান্ত করে?
কুরআনের আরেকটি আয়াত এখানে অত্যন্ত প্রাসঙ্গিক—
أَفَلَا يَتَدَبَّرُونَ الْقُرْآنَ ۚ وَلَوْ كَانَ مِنْ عِندِ غَيْرِ اللَّهِ لَوَجَدُوا فِيهِ اخْتِلَافًا كَثِيرًا
“তারা কি কুরআন নিয়ে গভীরভাবে চিন্তা করে না? যদি এটি আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো পক্ষ থেকে হতো, তবে এতে বহু বৈপরীত্য পাওয়া যেত।”
(নিসা ৪:৮২)
এই আয়াত প্রমাণ করে—কুরআনের ভেতর অস্পষ্টতা বা বৈপরীত্য নেই; বিভ্রান্তি আসে পাঠকের দিক থেকে।
এই কারণেই কুরআন এক জায়গায় বলে—
يُضِلُّ بِهِ كَثِيرًا وَيَهْدِي بِهِ كَثِيرًا ۚ وَمَا يُضِلُّ بِهِ إِلَّا الْفَاسِقِينَ
“আল্লাহ এই কিতাবের মাধ্যমে অনেককে পথ দেখান, আবার অনেককে বিভ্রান্ত করেন—কিন্তু বিভ্রান্ত হন কেবল ফাসিকরাই।”
(বাকারা ২:২৬)
অর্থাৎ, কুরআন নিজে বিভ্রান্তিকর নয়; মানুষের অন্তরের অবস্থা ফল নির্ধারণ করে।
সবশেষে কুরআন ঘোষণা করে—
وَهَٰذَا كِتَابٌ أَنزَلْنَاهُ مُبَارَكٌ فَاتَّبِعُوهُ
“এটি এক বরকতময় কিতাব, যা আমি নাজিল করেছি—অতএব তোমরা একে অনুসরণ করো।”
(আন‘আম ৬:১৫৫)
লক্ষ্য করুন—আল্লাহ বলেননি “এর বাইরে কিছু যোগ করো”, বলেননি “এটি বুঝতে অন্য কিছুর শরণ নাও”; বলেছেন—এটিকেই অনুসরণ করো।
আন‘আম ৬:১১৪–১১৫ কোনো বিচ্ছিন্ন বক্তব্য নয়। এটি কুরআনের সার্বিক ঘোষণার একটি কেন্দ্রীয় রূপ। কুরআন নিজেই বলে—এটি পূর্ণ, সুস্পষ্ট, ন্যায়পরিপূর্ণ ও অপরিবর্তনীয়। এই ঘোষণার পরও যদি কেউ বলে—কুরআন যথেষ্ট নয়, মানুষের ব্যাখ্যা অপরিহার্য—তাহলে প্রশ্ন ওঠে, সে আসলে কাকে কর্তৃত্ব দিচ্ছে?
কুরআনের অবস্থান পরিষ্কার—
বিচারক আল্লাহ, কিতাব কুরআন, আর মানুষের কাজ কেবল অনুসরণ।

সবাই কমেন্ট করবেন