তাফসীরঃ Friends of Quran Foundation
وَلَا تَقْرَبُوا مَالَ الْيَتِيمِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ حَتَّىٰ يَبْلُغَ أَشُدَّهُ ۖ وَأَوْفُوا الْكَيْلَ وَالْمِيزَانَ بِالْقِسْطِ ۖ لَا نُكَلِّفُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا ۖ وَإِذَا قُلْتُمْ فَاعْدِلُوا وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبَىٰ ۖ وَبِعَهْدِ اللَّهِ أَوْفُوا ۚ ذَٰلِكُمْ وَصَّاكُم بِهِ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ
এবং তোমরা এতিমের সম্পদের নিকটবর্তী হয়ো না— তবে সর্বোত্তম পদ্ধতিতে, যতক্ষণ না সে প্রাপ্তবয়স্ক হয়। আর ন্যায়সহকারে পরিমাপ ও ওজন পূর্ণ করো। আমি কোনো প্রাণকে তার সাধ্যের বাইরে বোঝা দিই না। আর যখন তোমরা কথা বলবে, তখন ন্যায় বলবে— যদিও তা নিকটাত্মীয়ের বিরুদ্ধেই হয়। আর আল্লাহর অঙ্গীকার পূর্ণ করো। এগুলোই তিনি তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন,
যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ করো।
সূরা আল-আন‘আমের এই আয়াতটি কুরআনের নৈতিক ও সামাজিক ন্যায়বিধানের একটি সংক্ষিপ্ত কিন্তু অত্যন্ত গভীর ঘোষণাপত্র। এখানে আল্লাহ মানুষের জীবনের চারটি মৌলিক ক্ষেত্র—দুর্বলদের অধিকার, অর্থনৈতিক ন্যায়, ভাষাগত সততা এবং চুক্তিগত দায়বদ্ধতা—একই আয়াতে একত্র করেছেন। এটি দেখায় যে কুরআনের ন্যায়নীতি খণ্ডিত নয়; বরং জীবনের সর্বস্তরে বিস্তৃত।
আয়াতের শুরুতেই এতিমের সম্পদের প্রসঙ্গ আসে। কুরআন বলে, “তোমরা এতিমের সম্পদের নিকটবর্তী হয়ো না—তবে সর্বোত্তম পদ্ধতিতে।” এখানে নিষেধাজ্ঞা সম্পূর্ণ স্পর্শহীনতা নয়; বরং শোষণ ও অপব্যবহার থেকে কঠোর বিরতি। “সর্বোত্তম পদ্ধতি” বলতে বোঝানো হয়েছে—রক্ষা করা, বৃদ্ধি করা, আমানতদারির সাথে পরিচালনা করা। অর্থাৎ দায়িত্বশীল তত্ত্বাবধান। কুরআন দুর্বলদের সম্পদকে সামাজিক পরীক্ষার মানদণ্ড বানিয়েছে।
এরপর আসে অর্থনৈতিক ন্যায়—পরিমাপ ও ওজন পূর্ণ করা। এটি শুধু বাজারের মাপজোক নয়; বরং সব ধরনের লেনদেন, হিসাব, চুক্তি ও মূল্যায়নের ন্যায়নীতি। এখানে “বিল কিস্ত”—ন্যায়ের সাথে—শব্দটি দেখায়, অর্থনৈতিক আচরণও ইবাদতের অন্তর্ভুক্ত। সাথে সাথে আল্লাহ বলেন, “আমি কোনো প্রাণকে তার সাধ্যের বাইরে বোঝা দিই না।” অর্থাৎ ন্যায় মানে অমানবিক কঠোরতা নয়; বরং সক্ষমতার মধ্যে ভারসাম্য।
এরপর ভাষাগত ও সাক্ষ্যগত ন্যায় আসে—“যখন তোমরা কথা বলবে, ন্যায় বলবে—যদিও তা নিকটাত্মীয়ের বিরুদ্ধেই হয়।” এটি সূরা আন-নিসা ৪:১৩৫–এর নীতিরই পুনরুক্তি। কুরআন এখানে স্পষ্ট করে দেয়—সত্যের ক্ষেত্রে আত্মীয়তা কোনো ছাড়পত্র নয়। কথা, সাক্ষ্য, বিবৃতি—সবখানেই ন্যায়ই মানদণ্ড।
আয়াতের শেষাংশে আল্লাহ বলেন—“আল্লাহর অঙ্গীকার পূর্ণ করো।” এটি কেবল ধর্মীয় অঙ্গীকার নয়; বরং সব ধরনের নৈতিক, সামাজিক ও চুক্তিগত দায়। মানুষ হিসেবে আল্লাহর সামনে যে নৈতিক অঙ্গীকার আমরা বহন করি—ন্যায়, সততা, আমানত—সবই এর অন্তর্ভুক্ত।
এই পুরো আয়াতটি একটি ভারসাম্যপূর্ণ নৈতিক কাঠামো তৈরি করে, যেখানে দয়া ও ন্যায়, সক্ষমতা ও দায়িত্ব, ব্যক্তি ও সমাজ—সবকিছু একসাথে বিবেচিত।
আজকের সমাজে দুর্বলদের সম্পদ, বাজারের ন্যায়, তথ্য ও বক্তব্যের সততা—সবকিছুই চ্যালেঞ্জের মুখে। এতিম, অসহায় ও প্রান্তিকদের সম্পদ নানা আইনি ফাঁক দিয়ে গ্রাস করা হয়। ব্যবসায় মাপে কম, কথায় বেশি—এটাই স্বাভাবিক ধরে নেওয়া হয়। সূরা আল-আন‘আম ৬:১৫২ এই স্বাভাবিকতাকেই অস্বীকার করে। এটি বলে—ন্যায় কোনো বিশেষ ক্ষেত্রের জন্য নয়; বরং জীবনের প্রতিটি স্তরের জন্য অপরিহার্য।
সূরা আল-আন‘আম ৬:১৫২ কুরআনের ন্যায়দর্শনের একটি সংক্ষিপ্ত সংবিধান। এখানে ন্যায় মানে শুধু আদালত নয়— বরং সম্পদ, বাজার, কথা ও অঙ্গীকার—সবখানে আল্লাহর ভয়।
যে সমাজ দুর্বলদের সম্পদ রক্ষা করে, যে বাজার ন্যায়ে চলে, যে জিহ্বা সত্য বলে— সেই সমাজই কুরআনের ভাষায় ভারসাম্যপূর্ণ ও স্মরণশীল।
