তাফসীরঃ Friends of Quran Foundation
وَلَا تَرْكَنُوا إِلَى الَّذِينَ ظَلَمُوا فَتَمَسَّكُمُ النَّارُ وَمَا لَكُم مِّن دُونِ اللَّهِ مِنْ أَوْلِيَاءَ ثُمَّ لَا تُنصَرُونَ
আর যারা জুলুম করেছে— তোমরা তাদের দিকে ঝুঁকে পড়ো না, নইলে আগুন তোমাদেরকে স্পর্শ করবে। আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কোনো অভিভাবক নেই, তারপর তোমাদের কোনো সাহায্যও করা হবে না।
সূরা হূদের এই আয়াতটি কুরআনের ন্যায় ও অবস্থানগত সততার একটি অত্যন্ত সূক্ষ্ম কিন্তু কঠোর নির্দেশ। এখানে আল্লাহ সরাসরি জুলুম করতে নিষেধ করেননি—কারণ জুলুম যে হারাম, তা কুরআনের বহু স্থানে স্পষ্ট। বরং তিনি এমন একটি স্তরের কথা বলেছেন, যেটি অনেক সময় মানুষ গুরুত্ব দেয় না—জালিমদের দিকে “ঝুঁকে পড়া”।
“তারকানূ” শব্দটি এখানে গভীর অর্থ বহন করে। এর মানে শুধু প্রকাশ্য সমর্থন নয়; বরং অন্তরের ঝোঁক, নীরব অনুমোদন, সুবিধাবাদী আপস, কিংবা নিরাপত্তা ও লাভের আশায় ন্যায়ের অবস্থান থেকে সরে যাওয়া। কুরআনের দৃষ্টিতে জুলুম টিকে থাকে শুধু জালিমের কারণে নয়; বরং সেইসব মানুষের কারণেও, যারা জালিমদের পাশে দাঁড়িয়ে যায় বা নীরব থাকে।
আয়াতে আল্লাহ সতর্ক করেন—যদি তোমরা জালিমদের দিকে ঝুঁকে পড়ো, তাহলে আগুন তোমাদেরকে স্পর্শ করবে। এখানে “আগুন” শুধু আখিরাতের শাস্তি নয়; বরং দুনিয়াতেও এর প্রভাব দেখা দেয়—নৈতিক অবক্ষয়, আত্মসম্মানহানি, সমাজে ন্যায়ের মৃত্যু। অর্থাৎ জুলুমের সাথে আপস করলে, তার পরিণতি থেকে কেউ নিরাপদ থাকে না।
এরপর আল্লাহ বলেন—“আল্লাহ ছাড়া তোমাদের কোনো অভিভাবক নেই।” এটি মানুষের সব কৃত্রিম আশ্রয় ভেঙে দেয়। ক্ষমতা, দল, রাষ্ট্র, সম্পর্ক—কিছুই শেষ পর্যন্ত রক্ষা করতে পারে না। যারা জালিমের ছায়ায় নিরাপত্তা খোঁজে, কুরআন তাদের এই ভ্রান্ত ধারণা ভেঙে দেয়।
আয়াতের শেষাংশ—“তারপর তোমাদের কোনো সাহায্যও করা হবে না”—এটি চূড়ান্ত সতর্কতা। অর্থাৎ ন্যায় থেকে সরে গিয়ে যে সহায়তা খোঁজা হয়, সেই সহায়তাই শেষ পর্যন্ত অদৃশ্য হয়ে যায়। কুরআনের ভাষায়, জুলুমের সাথে আপস মানেই নিজের নৈতিক ভিত্তি ধ্বংস করা।
এই আয়াতটি সূরা আল-মায়েদা ৫:৮ এবং সূরা আন-নিসা ৪:১৩৫–এর সাথে গভীরভাবে সম্পর্কিত। সেখানে বলা হয়েছে—ন্যায় প্রতিষ্ঠা করতে হবে, এমনকি নিজের বিপক্ষে হলেও। আর এখানে বলা হচ্ছে—ন্যায় থেকে সরে গিয়ে জালিমদের দিকে ঝোঁকাও নিষিদ্ধ। অর্থাৎ কুরআনের ন্যায়নীতি শুধু কাজের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং অবস্থান ও সম্পর্কের মধ্যেও প্রসারিত।
আজকের সমাজে জুলুমের সাথে “ঝুঁকে পড়া” অনেক সময় স্বাভাবিক বলে ধরে নেওয়া হয়। ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা, অন্যায়ের প্রতিবাদ না করা, সুবিধা নেওয়ার জন্য নীরব থাকা—এসবকে বাস্তবতা বলা হয়। কিন্তু সূরা হূদ ১১:১১৩ এই বাস্তবতাকে কুরআনের ভাষায় প্রত্যাখ্যান করে। এটি শেখায়—নিরপেক্ষতার মুখোশ পরে জুলুমের পাশে দাঁড়ানোও জুলুমের অংশ।
সূরা হূদ ১১:১১৩ আমাদের শেখায়— জুলুম শুধু করা নয়, জুলুমের দিকে ঝোঁকাও ধ্বংসের পথ।
যে ন্যায়কে ছেড়ে নিরাপত্তা খোঁজে, সে শেষ পর্যন্ত নিরাপত্তা হারায়।
কুরআনের দৃষ্টিতে মুক্তির পথ একটাই— ন্যায়ের পাশে অবিচল থাকা, যে মূল্যই দিতে হোক না কেন।
