أُولَٰئِكَ مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ ۖ وَلَا يَجِدُونَ عَنْهَا مَحِيصًا
এদের আশ্রয় হবে জাহান্নাম, আর সেখান থেকে তারা কোনো মুক্তির পথ খুঁজে পাবে না।
(অনুবাদ – Friends of Quran Foundation)
সূরা আন-নিসার এই আয়াতটি এমন এক চূড়ান্ত বাস্তবতার ঘোষণা, যা কুরআনের ন্যায়বিচারভিত্তিক বিশ্বদৃষ্টিকে স্পষ্টভাবে সামনে নিয়ে আসে। এখানে আল্লাহ তাআলা এমন এক শ্রেণির মানুষের পরিণতির কথা বলছেন, যারা সত্যকে প্রত্যাখ্যান করেছে, শয়তানের ধোঁকায় বিভ্রান্ত হয়েছে এবং আল্লাহর নির্দেশিত পথ থেকে ইচ্ছাকৃতভাবে সরে গেছে। এই আয়াতকে বিচ্ছিন্নভাবে বুঝলে তার গভীরতা পুরোপুরি ধরা যায় না; বরং পূর্ববর্তী আয়াতগুলোর আলোকে এর অর্থ পরিষ্কার হয়ে ওঠে।
৪:১১৬ আয়াতে আল্লাহ বলেন যে তিনি শিরক ক্ষমা করেন না, কিন্তু এর নিচের গুনাহ যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করেন। এরপর ৪:১২০ আয়াতে শয়তানের প্রতারণামূলক প্রতিশ্রুতির কথা এসেছে—সে মানুষকে মিথ্যা আশা দেয়, ভ্রান্ত স্বপ্ন দেখায়, কিন্তু তার প্রতিশ্রুতি প্রতারণা ছাড়া কিছু নয়। এই প্রেক্ষাপটে ৪:১২১ আয়াত ঘোষণা করছে সেইসব মানুষের চূড়ান্ত পরিণতি, যারা শয়তানের সেই মিথ্যা আশ্বাসে বিভ্রান্ত হয়ে আল্লাহর পথ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে।
আয়াতটি শুরু হচ্ছে— “أُولَٰئِكَ مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ” — “এদের আশ্রয় হবে জাহান্নাম।” এখানে “مأوى” শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি সাময়িক অবস্থান বোঝায় না; বরং স্থায়ী আবাস বোঝায়। যেমন মানুষ ঝড়-ঝাপটা থেকে বাঁচার জন্য যে স্থানে আশ্রয় নেয়, সেটিই তার নিরাপদ আবাস; তেমনি কিয়ামতের বিচারের পর যে স্থানে একজন মানুষ অবস্থান করবে সেটিই তার চূড়ান্ত ঠিকানা। কুরআন জান্নাতের ক্ষেত্রেও আবাসের ভাষা ব্যবহার করেছে—“خَالِدِينَ فِيهَا” — তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। একইভাবে জাহান্নামের ক্ষেত্রেও আবাসের ভাষা ব্যবহার করা হয়েছে, যা এই অবস্থানের স্থায়িত্বকে নির্দেশ করে।
এরপর বলা হয়েছে— “وَلَا يَجِدُونَ عَنْهَا مَحِيصًا” — তারা সেখান থেকে কোনো মুক্তির পথ খুঁজে পাবে না। “محيص” শব্দটি পালানোর রাস্তা, বিকল্প পথ বা এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ বোঝায়। অর্থাৎ জাহান্নামে প্রবেশের পর তাদের জন্য কোনো দরজা খোলা থাকবে না, কোনো আপিলের সুযোগ থাকবে না, কোনো সময়সীমা শেষ হওয়ার অপেক্ষা থাকবে না। এটি চূড়ান্ত পরিণতি।
কুরআনের বহু আয়াতে এই সত্য পুনরাবৃত্ত হয়েছে। সূরা মায়েদা (৫:৩৭)-এ বলা হয়েছে— “তারা আগুন থেকে বের হতে চাইবে, কিন্তু তারা সেখান থেকে বের হতে পারবে না।” সূরা বাকারা (২:১৬৭)-এ বলা হয়েছে— “তারা আগুন থেকে বের হবে না।” সূরা আহযাব (৩৩:৬৫)-এ এসেছে— “তারা সেখানে চিরকাল থাকবে।” সূরা জিন (৭২:২৩)-এ বলা হয়েছে— “তার জন্য জাহান্নামের আগুন, সেখানে তারা চিরকাল অবস্থান করবে।” এখানে “خالدين فيها أبدا” শব্দবন্ধ ব্যবহার হয়েছে—যা অনন্তকাল বোঝায়, যার শেষ নেই।
এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ আকীদাগত প্রশ্ন উঠে আসে। অনেকের মধ্যে একটি বিশ্বাস প্রচলিত আছে যে কিছু মানুষ জাহান্নামে যাবে, শাস্তি ভোগ করবে, তারপর দীর্ঘ সময় পরে সেখান থেকে বের হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে। কিন্তু কুরআনের ভাষা কি এই ধারণাকে সমর্থন করে? যদি জাহান্নাম সাময়িক হতো, তাহলে “ولا يجدون عنها محيصا” — তারা সেখান থেকে কোনো মুক্তির পথ পাবে না—এই ঘোষণা অর্থহীন হয়ে যেত। কুরআন বারবার বলছে—“وما هم بخارجين من النار” — তারা আগুন থেকে বের হবে না। এটি একটি সরাসরি অস্বীকৃতি, যা সাময়িক শাস্তির ধারণাকে সমর্থন করে না।
জাহান্নামের স্থায়িত্ব কেবল শাস্তির কঠোরতা নয়; এটি ন্যায়বিচারের পূর্ণতা। কিয়ামতের দিন বিচার হবে পূর্ণাঙ্গ ও সুবিচারভিত্তিক। সূরা যিলযাল (৯৯:৭–৮)-এ বলা হয়েছে— অণু পরিমাণ ভালো বা মন্দ কাজও প্রকাশিত হবে। সূরা নিসা (৪:৪০)-এ আল্লাহ ঘোষণা করেছেন— “আল্লাহ অণু পরিমাণও জুলুম করেন না।” অর্থাৎ কেউ অন্যায়ভাবে জাহান্নামে যাবে না। সতর্কবার্তা পৌঁছানোর পর, সত্য স্পষ্ট হওয়ার পর, প্রমাণ উপস্থাপিত হওয়ার পর যে ব্যক্তি ইচ্ছাকৃতভাবে সত্য প্রত্যাখ্যান করে, তার পরিণতিই এই স্থায়ী শাস্তি।
সূরা বায়্যিনাহ (৯৮:৬)-এ বলা হয়েছে— “যারা কুফর করেছে, তারা জাহান্নামের আগুনে থাকবে, সেখানে তারা চিরকাল অবস্থান করবে।” একইভাবে সূরা তাগাবুন (৬৪:১০)-এ বলা হয়েছে— “যারা কুফর করেছে এবং আমার আয়াতসমূহকে অস্বীকার করেছে, তারাই আগুনের অধিবাসী; তারা সেখানে চিরকাল থাকবে।” এই আয়াতগুলো একত্রে একটি স্পষ্ট নীতি প্রতিষ্ঠা করে—জাহান্নাম কোনো সংশোধনাগার নয়; এটি চূড়ান্ত বিচার-পরবর্তী আবাস।
কেউ কেউ যুক্তি দিতে পারে যে আল্লাহ পরম দয়ালু; তাহলে কেন শাস্তি চিরস্থায়ী হবে? এর উত্তর কুরআন নিজেই দিয়েছে। দয়া ও ন্যায়বিচার একে অপরের বিরোধী নয়। আল্লাহ দয়ালু—তাই তিনি দুনিয়াতে সতর্কবার্তা পাঠিয়েছেন, রাসূল পাঠিয়েছেন, কিতাব নাজিল করেছেন, তওবার দরজা খুলে রেখেছেন। সূরা যুমার (৩৯:৫৩)-এ বলা হয়েছে— “হে আমার বান্দারা, যারা নিজেদের উপর সীমালঙ্ঘন করেছ, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।” অর্থাৎ দুনিয়ার জীবনে ফিরে আসার সুযোগ আছে। কিন্তু কিয়ামতের পর আর তওবার সুযোগ নেই। তখন ন্যায়বিচার কার্যকর হবে।
জাহান্নামের শাস্তি চিরস্থায়ী হওয়ার কারণ হলো—কুফর ও শিরক কোনো সাময়িক ভুল নয়; এটি একটি অবস্থান। এটি সত্যের বিরুদ্ধে সচেতন বিদ্রোহ। যখন একজন মানুষ স্পষ্ট প্রমাণের পরও সত্য অস্বীকার করে এবং সেই অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তখন সে একটি স্থায়ী অবস্থান বেছে নেয়। সেই স্থায়ী অবস্থানের পরিণতিও স্থায়ী।
এই আয়াত আমাদের সামনে এক ভয়ংকর কিন্তু বাস্তব সত্য তুলে ধরে। শয়তানের প্রতিশ্রুতি মিথ্যা; কিন্তু আল্লাহর ঘোষণা সত্য। দুনিয়ায় মানুষ ভাবে—সময় আছে, পরে দেখা যাবে, হয়তো শেষ পর্যন্ত রক্ষা পাওয়া যাবে। কিন্তু কুরআন সেই আত্মপ্রবঞ্চনাকে ভেঙে দেয়। “ولا يجدون عنها محيصا” — কোনো পালানোর পথ থাকবে না।
এই সত্য উপলব্ধি করা ঈমানের একটি অপরিহার্য অংশ। জাহান্নামকে হালকাভাবে নেওয়া বা সাময়িক মনে করা মানুষের ভেতরে দায়িত্ববোধ কমিয়ে দেয়। কিন্তু যখন একজন মানুষ বুঝতে পারে যে এটি একটি চূড়ান্ত পরিণতি, তখন তার জীবনদৃষ্টিতে পরিবর্তন আসে। সে পাপকে হালকা ভাবে না, শিরককে উপেক্ষা করে না, আল্লাহর আয়াতকে অবহেলা করে না।
এই আয়াত কেবল ভয় প্রদর্শন নয়; এটি একটি সতর্কবার্তা। আল্লাহ দুনিয়াতে বারবার সুযোগ দিয়েছেন। কিন্তু সুযোগের সময়সীমা আছে। যখন বিচার সম্পন্ন হবে, তখন আর পরিবর্তনের সুযোগ থাকবে না। তখন যে যেখানে দাঁড়াবে, সেটিই তার স্থায়ী আবাস হবে—জান্নাত অথবা জাহান্নাম।
এই আয়াত আমাদেরকে কয়েকটি গভীর শিক্ষা দেয়। প্রথমত, শিরক ও কুফর থেকে সম্পূর্ণ দূরে থাকা অপরিহার্য। দ্বিতীয়ত, শয়তানের মিথ্যা প্রতিশ্রুতিতে বিভ্রান্ত না হওয়া। তৃতীয়ত, জাহান্নামকে বাস্তব ও স্থায়ী পরিণতি হিসেবে উপলব্ধি করা। চতুর্থত, দুনিয়ার জীবনে তওবা ও সংশোধনের সুযোগকে অবহেলা না করা। পঞ্চমত, কুরআনের ঘোষণাকে বিকৃত ব্যাখ্যার মাধ্যমে দুর্বল না করা।
জাহান্নাম একটি নির্ধারিত আবাস, যেখান থেকে মুক্তির পথ নেই—এটি কুরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণা। আল্লাহ আমাদেরকে সেই পরিণতি থেকে রক্ষা করুন, সত্যকে গ্রহণ করার সাহস দিন এবং তাঁর ন্যায়বিচারকে সঠিকভাবে উপলব্ধি করার তাওফিক দান করুন।
