• বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:৪৫ অপরাহ্ন

তাফসীর | সূরা ৪ : আয়াত ১৬৯

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ১৯৬ Time View
Update : শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

তাফসীর | সূরা আন-নিসা : আয়াত ১৬৯

তাফসীর | Friends of Quran Foundation


আরবি আয়াত

خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ۖ وَكَانَ ذَٰلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرًا


ভাবার্থভিত্তিক অনুবাদ

তারা সেখানে চিরকাল অবস্থান করবে। আর এটি আল্লাহর জন্য মোটেও কঠিন নয়।
(অনুবাদ – Friends of Quran Foundation)


আয়াতের তাফসীর

সূরা আন-নিসার ১৬৯ নম্বর আয়াতটি অত্যন্ত সংক্ষিপ্ত, কিন্তু এর ভেতরে একটি গভীর আকীদাগত সত্য স্পষ্টভাবে ঘোষণা করা হয়েছে। এটি কোনো সাধারণ বর্ণনা নয়; এটি চূড়ান্ত বিচার-পরবর্তী অবস্থার ঘোষণা। এই আয়াতের পূর্ববর্তী আয়াতে (৪:১৬৮) বলা হয়েছে—যারা কুফর করেছে এবং জুলুম করেছে, আল্লাহ তাদেরকে ক্ষমা করবেন না এবং তাদেরকে সঠিক পথে পরিচালিত করবেন না। সেই ঘোষণার পরপরই ১৬৯ নম্বর আয়াতে বলা হচ্ছে—“তারা সেখানে চিরকাল অবস্থান করবে, এবং এটি আল্লাহর জন্য সহজ।”

এখানে প্রথম শব্দটি—“خالدين”। এটি “خلود” ধাতু থেকে এসেছে, যার অর্থ স্থায়ীভাবে থাকা, শেষহীন অবস্থান। কুরআনে এই শব্দটি জান্নাত ও জাহান্নাম—উভয়ের ক্ষেত্রেই ব্যবহৃত হয়েছে। কিন্তু যখন এর সঙ্গে “أبدًا” শব্দটি যুক্ত হয়, তখন তা স্থায়িত্বকে আরো জোরালো করে তোলে। “أبدًا” অর্থ অনন্তকাল, যার শেষ নেই। অর্থাৎ এখানে কেবল দীর্ঘকাল নয়; বরং শেষহীন অবস্থান বোঝানো হয়েছে।

এই আয়াতটি জাহান্নামের স্থায়িত্বের একটি সুস্পষ্ট প্রমাণ। কুরআনের বিভিন্ন স্থানে একই ভাষা পুনরাবৃত্ত হয়েছে। সূরা আহযাব (৩৩:৬৫)-এ বলা হয়েছে—“خالدين فيها أبدا” — তারা সেখানে চিরকাল থাকবে। সূরা জিন (৭২:২৩)-এ এসেছে—“فإن له نار جهنم خالدين فيها أبدا” — তার জন্য জাহান্নামের আগুন, সেখানে তারা চিরকাল অবস্থান করবে। সূরা বায়্যিনাহ (৯৮:৬)-এ বলা হয়েছে—“في نار جهنم خالدين فيها” — তারা জাহান্নামে চিরকাল থাকবে। এই ধারাবাহিক ভাষা প্রমাণ করে যে জাহান্নাম কোনো সাময়িক শাস্তি নয়; এটি একটি চূড়ান্ত ও স্থায়ী পরিণতি।

অনেকের মধ্যে একটি প্রচলিত ধারণা আছে যে কিছু মানুষ জাহান্নামে যাবে, শাস্তি ভোগ করবে, তারপর দীর্ঘ সময় পরে সেখান থেকে বের হয়ে জান্নাতে প্রবেশ করবে। কিন্তু কুরআনের ভাষা সেই ধারণাকে সমর্থন করে না। কুরআন বারবার বলছে—“وما هم بخارجين من النار” (তারা আগুন থেকে বের হবে না) — সূরা বাকারা (২:১৬৭), সূরা মায়েদা (৫:৩৭)। যদি জাহান্নাম থেকে শেষ পর্যন্ত বের হয়ে যাওয়ার সুযোগ থাকত, তাহলে “أبدًا” এবং “وما هم بخارجين” এর মতো দৃঢ় ভাষা ব্যবহার হতো না।

কুরআনের বিচারব্যবস্থা ন্যায়ভিত্তিক। সূরা নিসা (৪:৪০)-এ বলা হয়েছে—“আল্লাহ অণু পরিমাণও জুলুম করেন না।” অর্থাৎ কেউ অন্যায়ভাবে জাহান্নামে যাবে না। সতর্কবার্তা পৌঁছানোর পর, সত্য স্পষ্ট হওয়ার পর, প্রমাণ দেখানোর পরও যারা কুফর ও জুলুমে অবিচল থাকে, তাদের পরিণতি স্থায়ী। এটি আবেগপ্রসূত শাস্তি নয়; এটি বিচার-পরবর্তী রায়।

এই আয়াতের শেষাংশ—“وَكَانَ ذَٰلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرًا” — “এটি আল্লাহর জন্য সহজ।” এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক রয়েছে। মানুষের কাছে চিরস্থায়ী শাস্তি কল্পনা করা কঠিন মনে হতে পারে। কিন্তু আল্লাহর বিচারব্যবস্থা মানবীয় আবেগের ওপর নির্ভরশীল নয়। তাঁর জন্য বিচার কার্যকর করা সহজ। তিনি সর্বশক্তিমান, সর্বজ্ঞ। তিনি জানেন কার অন্তর কী অবস্থায় ছিল, কার কাছে কতটুকু প্রমাণ পৌঁছেছে, কে সচেতনভাবে অস্বীকার করেছে। সেই পূর্ণ জ্ঞানের ভিত্তিতেই তাঁর রায় কার্যকর হবে।

কেউ প্রশ্ন করতে পারে—আল্লাহ তো পরম দয়ালু, তাহলে চিরস্থায়ী শাস্তি কেন? এর উত্তর কুরআন নিজেই দিয়েছে। আল্লাহ দয়ালু—তাই তিনি দুনিয়াতে তওবার সুযোগ দিয়েছেন। সূরা যুমার (৩৯:৫৩)-এ তিনি বলেন—“হে আমার বান্দারা, আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।” অর্থাৎ জীবিত থাকা পর্যন্ত ক্ষমার দরজা খোলা। কিন্তু কিয়ামতের পর আর তওবার সুযোগ নেই। তখন ন্যায়বিচার কার্যকর হবে।

কুফর ও শিরক কেবল একটি ভুল কাজ নয়; এটি একটি অবস্থান। যখন একজন মানুষ স্পষ্ট সত্যের পরও তা অস্বীকার করে এবং সেই অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তখন সে একটি স্থায়ী অবস্থান বেছে নেয়। সেই স্থায়ী অবস্থানের পরিণতিও স্থায়ী। তাই কুরআন জান্নাত ও জাহান্নাম—উভয়ের ক্ষেত্রেই “خلود” শব্দ ব্যবহার করেছে। একদিকে চিরস্থায়ী পুরস্কার, অন্যদিকে চিরস্থায়ী শাস্তি।

এই আয়াত আমাদের সামনে একটি গুরুতর সতর্কবার্তা তুলে ধরে। দুনিয়ার জীবন ক্ষণস্থায়ী। এখানে ভুল করলে সংশোধনের সুযোগ আছে। কিন্তু বিচার-পরবর্তী অবস্থান চূড়ান্ত। তখন আর কোনো আপিল, কোনো মুক্তির রাস্তা থাকবে না। এই উপলব্ধি একজন মানুষের জীবনে গভীর পরিবর্তন আনতে পারে। সে বুঝতে পারে—দুনিয়ার সাময়িক স্বার্থের জন্য চিরস্থায়ী পরিণতি ঝুঁকিতে ফেলা বুদ্ধিমানের কাজ নয়।

অতএব সূরা আন-নিসা ৪:১৬৯ আয়াতটি কেবল জাহান্নামের শাস্তির কথা নয়; এটি আল্লাহর ন্যায়বিচারের চূড়ান্ততার ঘোষণা। এটি আমাদেরকে স্মরণ করিয়ে দেয়—আল্লাহর রায় কার্যকর করা তাঁর জন্য সহজ, এবং সেই রায় চিরস্থায়ী। তাই দুনিয়াতে থাকতেই সত্যকে গ্রহণ করা, শিরক ও কুফর থেকে দূরে থাকা এবং আল্লাহর পথে ফিরে আসাই একমাত্র নিরাপদ পথ।

সংক্ষেপে (করণীয়)

এই আয়াত আমাদের শেখায়—ঈমানকে হালকাভাবে নেওয়া যাবে না। শিরক ও কুফর থেকে সম্পূর্ণভাবে দূরে থাকতে হবে। দুনিয়ার জীবনে তওবা ও সংশোধনের সুযোগকে কাজে লাগাতে হবে। জাহান্নামকে সাময়িক ভেবে আত্মপ্রবঞ্চনায় না পড়ে কুরআনের সুস্পষ্ট ঘোষণাকে গ্রহণ করতে হবে। এবং সর্বোপরি, আল্লাহর ন্যায়বিচার ও সর্বশক্তিমত্তার প্রতি পূর্ণ আস্থা রাখতে হবে।

আল্লাহ আমাদেরকে সেই চিরস্থায়ী শাস্তি থেকে রক্ষা করুন এবং তাঁর সন্তুষ্টির পথে পরিচালিত করুন।

Print this entry


আপনার মতামত লিখুন :
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x