• বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৪০ অপরাহ্ন

তাফসীর | সূরা ৪ : আয়াত ১১

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ১৮১ Time View
Update : শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

তাফসীর | সূরা আন-নিসা : আয়াত ১১

তাফসীর | Friends of Quran Foundation


আরবি আয়াত

يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ ۖ لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنثَيَيْنِ ۚ فَإِن كُنَّ نِسَاءً فَوْقَ اثْنَتَيْنِ فَلَهُنَّ ثُلُثَا مَا تَرَكَ ۖ وَإِن كَانَتْ وَاحِدَةً فَلَهَا النِّصْفُ ۚ وَلِأَبَوَيْهِ لِكُلِّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا السُّدُسُ مِمَّا تَرَكَ إِن كَانَ لَهُ وَلَدٌ ۚ فَإِن لَّمْ يَكُن لَّهُ وَلَدٌ وَوَرِثَهُ أَبَوَاهُ فَلِأُمِّهِ الثُّلُثُ ۚ فَإِن كَانَ لَهُ إِخْوَةٌ فَلِأُمِّهِ السُّدُسُ ۚ مِن بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصِي بِهَا أَوْ دَيْنٍ ۗ آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ لَا تَدْرُونَ أَيُّهُمْ أَقْرَبُ لَكُمْ نَفْعًا ۚ فَرِيضَةً مِّنَ اللَّهِ ۗ إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا


ভাবার্থভিত্তিক অনুবাদ

তোমাদের সন্তানদের বিষয়ে আল্লাহ তোমাদের নির্দেশ দেন—এক ছেলের অংশ দুই মেয়ের অংশের সমান। যদি কেবল দুই বা ততোধিক মেয়ে থাকে, তবে তারা পাবে রেখে যাওয়া সম্পদের দুই-তৃতীয়াংশ; আর যদি একজন মেয়ে হয়, তবে সে পাবে অর্ধেক। মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকলে তার পিতা ও মাতা প্রত্যেকে পাবে এক-ষষ্ঠাংশ। আর যদি তার সন্তান না থাকে এবং তার উত্তরাধিকারী হয় শুধু পিতা-মাতা, তবে তার মাতা পাবে এক-তৃতীয়াংশ। আর যদি তার ভাই-বোন থাকে, তবে তার মাতা পাবে এক-ষষ্ঠাংশ—সবই তার করা অঙ্গীকার পূরণ ও ঋণ পরিশোধের পরে। তোমাদের পিতা-মাতা ও সন্তানদের মধ্যে কে তোমাদের জন্য বেশি উপকারী, তা তোমরা জান না। এটি আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়।
(অনুবাদ – Friends of Quran Foundation)


আয়াতের তাফসীর

সূরা আন-নিসা মূলত সামাজিক ন্যায়, পরিবারব্যবস্থা, উত্তরাধিকার, নারী-অধিকার এবং সম্পদ বণ্টনের নীতিমালা নিয়ে অবতীর্ণ একটি সূরা। ইসলাম আগমনের পূর্বে আরব সমাজে উত্তরাধিকার ছিল শক্তিশালীদের অধিকার। নারী, শিশু, দুর্বল—তারা সম্পদ পেত না। সম্পদ যেত যুদ্ধ করতে পারে এমন পুরুষদের হাতে। সেই প্রেক্ষাপটে সূরা আন-নিসার এই আয়াত একটি বিপ্লবী ঘোষণা—উত্তরাধিকার আল্লাহ নির্ধারণ করবেন, মানুষ নয়।

আয়াতটি শুরু হয়েছে— “يُوصِيكُمُ اللَّهُ فِي أَوْلَادِكُمْ” — আল্লাহ তোমাদের সন্তানদের বিষয়ে তোমাদেরকে নির্দেশ দিচ্ছেন। এখানে “يوصيكم” শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি সাধারণ পরামর্শ নয়; এটি গুরুতর নির্দেশ। অর্থাৎ সম্পদ বণ্টন মানুষের ইচ্ছাধীন নয়; এটি আল্লাহর নির্দেশাধীন। উত্তরাধিকার কোনো পারিবারিক আবেগের বিষয় নয়; এটি একটি আইনি বিধান।

এরপর বলা হয়েছে— “لِلذَّكَرِ مِثْلُ حَظِّ الْأُنثَيَيْنِ” — এক ছেলের অংশ দুই মেয়ের অংশের সমান। এই অংশটি নিয়ে অনেক প্রশ্ন ওঠে। কেউ কেউ এটিকে বৈষম্য মনে করে। কিন্তু কুরআনের বিধানকে বিচ্ছিন্নভাবে না দেখে সামগ্রিক পারিবারিক দায়িত্বের আলোকে দেখতে হবে। ইসলামী ব্যবস্থায় পুরুষের উপর আর্থিক দায়িত্ব বর্তায়—স্ত্রীর ভরণপোষণ, সন্তানের দায়িত্ব, পরিবার পরিচালনা। নারী তার প্রাপ্ত সম্পদের উপর পূর্ণ মালিকানা রাখে এবং তার উপর পরিবার চালানোর বাধ্যবাধকতা নেই। সুতরাং এখানে অংশের পার্থক্য দায়িত্বের পার্থক্যের সঙ্গে সম্পর্কিত। এটি মূল্যবোধগত শ্রেষ্ঠত্ব নয়; দায়িত্বভিত্তিক বণ্টন।

এরপর আয়াত বিশদভাবে পরিস্থিতি ব্যাখ্যা করেছে। যদি কেবল দুই বা ততোধিক মেয়ে থাকে এবং কোনো ছেলে না থাকে, তাহলে তারা পাবে দুই-তৃতীয়াংশ। আর যদি একজন মেয়ে থাকে, সে পাবে অর্ধেক। অর্থাৎ নারীকে সম্পূর্ণভাবে উত্তরাধিকার থেকে বঞ্চিত করা হয়নি; বরং নির্দিষ্ট অংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। ইসলাম-পূর্ব সমাজে যা অকল্পনীয় ছিল।

এরপর পিতা-মাতার অংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। যদি মৃত ব্যক্তির সন্তান থাকে, তবে তার পিতা ও মাতা প্রত্যেকে এক-ষষ্ঠাংশ পাবে। যদি সন্তান না থাকে এবং কেবল পিতা-মাতা উত্তরাধিকারী হয়, তবে মাতা পাবে এক-তৃতীয়াংশ। কিন্তু যদি ভাই-বোন থাকে, তাহলে মাতা পাবে এক-ষষ্ঠাংশ। এই সূক্ষ্ম বণ্টন প্রমাণ করে—এটি কোনো মানুষের রচিত নিয়ম নয়; বরং গভীর জ্ঞান ও প্রজ্ঞার ভিত্তিতে নির্ধারিত।

আয়াতে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি উল্লেখ করা হয়েছে— “مِن بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصِي بِهَا أَوْ دَيْنٍ” — অঙ্গীকার (ওসিয়ত) পূরণ ও ঋণ পরিশোধের পরে। অর্থাৎ উত্তরাধিকার বণ্টনের আগে মৃত ব্যক্তির দায়-দেনা নিষ্পত্তি করা হবে। ইসলাম সম্পদ বণ্টনের আগে ন্যায়বিচার নিশ্চিত করে। ঋণ পরিশোধ অগ্রাধিকার পায়। এতে বোঝা যায়, ইসলামী আইন শুধু বণ্টন নয়; দায়বদ্ধতারও শিক্ষা দেয়।

এরপর আয়াত একটি গভীর মনস্তাত্ত্বিক সত্য ঘোষণা করেছে— “آبَاؤُكُمْ وَأَبْنَاؤُكُمْ لَا تَدْرُونَ أَيُّهُمْ أَقْرَبُ لَكُمْ نَفْعًا” — তোমাদের পিতা-মাতা ও সন্তানদের মধ্যে কে তোমাদের জন্য বেশি উপকারী, তা তোমরা জান না। মানুষ আবেগপ্রবণ। সে হয়তো মনে করতে পারে, এই সন্তান বেশি প্রিয়, তাকে বেশি দেই; বা কোনো আত্মীয়কে বঞ্চিত করতে চায়। কিন্তু আল্লাহ জানেন প্রকৃত কল্যাণ কোথায়। তাই উত্তরাধিকার আবেগের ভিত্তিতে নয়; বিধানের ভিত্তিতে।

সবশেষে ঘোষণা— “فَرِيضَةً مِّنَ اللَّهِ” — এটি আল্লাহর নির্ধারিত বিধান। “ফরিদাহ” মানে বাধ্যতামূলক, অবশ্যম্ভাবী। এটি ঐচ্ছিক নয়। মানুষ ইচ্ছেমতো পরিবর্তন করতে পারে না। তারপর বলা হয়েছে— “إِنَّ اللَّهَ كَانَ عَلِيمًا حَكِيمًا” — নিশ্চয় আল্লাহ সর্বজ্ঞ, প্রজ্ঞাময়। এখানে দুটি গুণ উল্লেখ করা হয়েছে—জ্ঞান ও প্রজ্ঞা। আল্লাহ জানেন মানুষের প্রয়োজন, সম্পর্কের জটিলতা, ভবিষ্যৎ প্রভাব; এবং তিনি প্রজ্ঞার সঙ্গে বিধান নির্ধারণ করেছেন।

এই আয়াত ইসলামী অর্থনৈতিক ন্যায়ের একটি ভিত্তি। এটি প্রমাণ করে—ইসলামে সম্পদ ব্যক্তিগত সম্পত্তি হলেও তার বণ্টন আল্লাহর বিধান দ্বারা নিয়ন্ত্রিত। এতে দুর্বলদের অধিকার সুরক্ষিত হয়। নারী, শিশু, পিতা-মাতা—সবাই নির্ধারিত অংশ পায়।

আজকের প্রেক্ষাপটে এই আয়াতের তাৎপর্য আরও গভীর। অনেক সমাজে এখনো উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধ, অবিচার, নারী বঞ্চনা দেখা যায়। কেউ মেয়েদের সম্পূর্ণ বঞ্চিত করে, কেউ ইচ্ছামতো বণ্টন করে। কিন্তু এই আয়াত ঘোষণা করে—এটি আল্লাহর নির্ধারিত আইন। এর ব্যত্যয় করা মানে আল্লাহর নির্ধারণকে অস্বীকার করা।

এই বিধান কেবল আর্থিক নয়; এটি সামাজিক স্থিতিশীলতার ভিত্তি। সম্পদের সুষম বণ্টন পরিবারে ভারসাম্য আনে। পিতা-মাতা নিরাপত্তা পায়, কন্যারা অধিকার পায়, পরিবারে দ্বন্দ্ব কমে।

সংক্ষেপে (করণীয়)

এই আয়াত আমাদের শেখায়—উত্তরাধিকার বণ্টনে আল্লাহর বিধান মানা অপরিহার্য। আবেগ বা সামাজিক রীতি দিয়ে বিধান পরিবর্তন করা যাবে না। ঋণ পরিশোধ ও অঙ্গীকার পূরণকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। নারী-অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। এবং সর্বোপরি, মনে রাখতে হবে—আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়; তাঁর নির্ধারণই ন্যায় ও কল্যাণের ভিত্তি।

আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর নির্ধারিত আইন অনুযায়ী জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন।

Print this entry


আপনার মতামত লিখুন :
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x