• বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:৩৭ অপরাহ্ন

তাফসীর | সূরা ৪ : আয়াত ১২

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ১৭৮ Time View
Update : শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

তাফসীর | সূরা আন-নিসা : আয়াত ১২

তাফসীর | Friends of Quran Foundation


আরবি আয়াত

وَلَكُمْ نِصْفُ مَا تَرَكَ أَزْوَاجُكُمْ إِن لَّمْ يَكُن لَّهُنَّ وَلَدٌ ۚ فَإِن كَانَ لَهُنَّ وَلَدٌ فَلَكُمُ الرُّبُعُ مِمَّا تَرَكْنَ ۚ مِن بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصِينَ بِهَا أَوْ دَيْنٍ ۚ وَلَهُنَّ الرُّبُعُ مِمَّا تَرَكْتُمْ إِن لَّمْ يَكُن لَّكُمْ وَلَدٌ ۚ فَإِن كَانَ لَكُمْ وَلَدٌ فَلَهُنَّ الثُّمُنُ مِمَّا تَرَكْتُم مِّن بَعْدِ وَصِيَّةٍ تُوصُونَ بِهَا أَوْ دَيْنٍ ۗ وَإِن كَانَ رَجُلٌ يُورَثُ كَلَالَةً أَوِ امْرَأَةٌ وَلَهُ أَخٌ أَوْ أُخْتٌ فَلِكُلِّ وَاحِدٍ مِّنْهُمَا السُّدُسُ ۚ فَإِن كَانُوا أَكْثَرَ مِن ذَٰلِكَ فَهُمْ شُرَكَاءُ فِي الثُّلُثِ ۚ مِن بَعْدِ وَصِيَّةٍ يُوصَىٰ بِهَا أَوْ دَيْنٍ غَيْرَ مُضَارٍّ ۚ وَصِيَّةً مِّنَ اللَّهِ ۗ وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَلِيمٌ


ভাবার্থভিত্তিক অনুবাদ

তোমাদের স্ত্রীরা যদি সন্তান রেখে না যায়, তবে তাদের রেখে যাওয়া সম্পদের অর্ধেক তোমাদের জন্য। আর যদি তাদের সন্তান থাকে, তবে তাদের রেখে যাওয়া সম্পদের এক-চতুর্থাংশ তোমাদের জন্য—তাদের করা অঙ্গীকার পূরণ ও ঋণ পরিশোধের পরে। আর তোমরা যদি সন্তান না রেখে মারা যাও, তবে তোমাদের রেখে যাওয়া সম্পদের এক-চতুর্থাংশ তাদের (স্ত্রীদের) জন্য। আর যদি তোমাদের সন্তান থাকে, তবে তাদের জন্য এক-অষ্টমাংশ—তোমাদের করা অঙ্গীকার পূরণ ও ঋণ পরিশোধের পরে। আর যদি কোনো পুরুষ বা নারী সন্তান ও পিতা-মাতা ছাড়া উত্তরাধিকারী রেখে যায় (কালালাহ), এবং তার একটি ভাই বা বোন থাকে, তবে প্রত্যেকের জন্য এক-ষষ্ঠাংশ। আর যদি তারা একাধিক হয়, তবে তারা এক-তৃতীয়াংশে অংশীদার হবে—অঙ্গীকার পূরণ ও ঋণ পরিশোধের পরে, কারো ক্ষতি না করে। এটি আল্লাহর নির্দেশ। আর আল্লাহ সর্বজ্ঞ, সহনশীল।
(অনুবাদ – Friends of Quran Foundation)


আয়াতের তাফসীর

সূরা আন-নিসার ১১ ও ১২ নম্বর আয়াত ইসলামী উত্তরাধিকার আইনের মৌলিক কাঠামো নির্ধারণ করে। ১১ নম্বর আয়াতে সন্তান ও পিতা-মাতার অংশ নির্ধারণ করা হয়েছে, আর ১২ নম্বর আয়াতে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক উত্তরাধিকার এবং “কালালাহ” সংক্রান্ত বিধান ব্যাখ্যা করা হয়েছে। এই আয়াতগুলো প্রমাণ করে—উত্তরাধিকার ইসলামে কোনো সামাজিক রীতি নয়; এটি আল্লাহর নির্ধারিত আইন।

আয়াতের শুরুতেই বলা হয়েছে— “وَلَكُمْ نِصْفُ مَا تَرَكَ أَزْوَاجُكُمْ إِن لَّمْ يَكُن لَّهُنَّ وَلَدٌ” — যদি তোমাদের স্ত্রীরা সন্তান রেখে না যায়, তবে তাদের সম্পদের অর্ধেক তোমাদের। এখানে স্পষ্টভাবে দেখা যায় যে স্বামী স্ত্রীর সম্পদের উত্তরাধিকারী। ইসলাম-পূর্ব সমাজে নারীর সম্পদের স্বতন্ত্র অধিকার ছিল না; কিন্তু ইসলামে নারী তার সম্পদের পূর্ণ মালিক, এবং তার মৃত্যুর পর সেই সম্পদ বিধান অনুযায়ী বণ্টিত হবে।

এরপর বলা হয়েছে— যদি স্ত্রী সন্তান রেখে যায়, তবে স্বামী পাবে এক-চতুর্থাংশ। অর্থাৎ সন্তানের উপস্থিতি উত্তরাধিকার বণ্টনে প্রভাব ফেলে। এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতি হলো—পরিবারের ভরণপোষণ ও দায়িত্বের ভারসাম্য বজায় রাখা। সন্তান থাকলে সম্পদের একটি বড় অংশ সন্তানের অধিকার হিসেবে সংরক্ষিত হয়।

পরবর্তী অংশে বলা হয়েছে— “وَلَهُنَّ الرُّبُعُ مِمَّا تَرَكْتُمْ إِن لَّمْ يَكُن لَّكُمْ وَلَدٌ” — যদি তোমরা সন্তান না রেখে মারা যাও, তবে তোমাদের সম্পদের এক-চতুর্থাংশ স্ত্রীদের জন্য। আর যদি সন্তান থাকে, তবে তাদের জন্য এক-অষ্টমাংশ। এখানে নারীকে নির্দিষ্ট অংশ প্রদান করা হয়েছে। ইসলামী আইন নারীর আর্থিক নিরাপত্তা নিশ্চিত করেছে—স্বামীর মৃত্যুর পর স্ত্রী বঞ্চিত হবে না।

এই আয়াতে বারবার একটি বাক্য পুনরাবৃত্ত হয়েছে— “مِن بَعْدِ وَصِيَّةٍ … أَوْ دَيْنٍ” — অঙ্গীকার পূরণ ও ঋণ পরিশোধের পরে। অর্থাৎ উত্তরাধিকার বণ্টনের আগে ঋণ শোধ এবং বৈধ ওসিয়ত বাস্তবায়ন করতে হবে। এতে বোঝা যায়, ইসলামী আইন দায়বদ্ধতাকে অগ্রাধিকার দেয়। কেউ মারা গেলে তার সম্পদ বণ্টনের আগে তার দায় নিষ্পত্তি হবে। এতে সামাজিক ন্যায় প্রতিষ্ঠিত হয়।

এরপর আয়াত “কালালাহ” প্রসঙ্গ তুলে ধরে—যে ব্যক্তি সন্তান ও পিতা-মাতা ছাড়া মারা যায়। এ ক্ষেত্রে ভাই বা বোনের অংশ নির্ধারণ করা হয়েছে। একজন হলে এক-ষষ্ঠাংশ, একাধিক হলে তারা এক-তৃতীয়াংশে অংশীদার। এই সূক্ষ্ম হিসাব প্রমাণ করে—এটি মানুষের তৈরি কোনো সাধারণ নিয়ম নয়; বরং সুসংগঠিত আইনব্যবস্থা।

আয়াতের শেষাংশে বলা হয়েছে— “غَيْرَ مُضَارٍّ” — কারো ক্ষতি না করে। অর্থাৎ কেউ যেন ওসিয়তের মাধ্যমে অন্য উত্তরাধিকারীদের ক্ষতিগ্রস্ত না করে। ইসলামে আইন শুধু অংশ নির্ধারণ করে না; বরং অপব্যবহার রোধও করে।

সবশেষে ঘোষণা— “وَصِيَّةً مِّنَ اللَّهِ” — এটি আল্লাহর নির্দেশ। এবং— “وَاللَّهُ عَلِيمٌ حَلِيمٌ” — আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও সহনশীল। “আলীম” মানে তিনি জানেন কার কী প্রয়োজন, “হালীম” মানে তিনি তাড়াহুড়ো করে শাস্তি দেন না; সুযোগ দেন, সময় দেন, কিন্তু আইন নির্ধারণ করেন প্রজ্ঞার সঙ্গে।

এই আয়াত ইসলামী অর্থনৈতিক ন্যায়ের একটি ভিত্তি। এতে স্বামী-স্ত্রীর পারস্পরিক অধিকার স্বীকৃত হয়েছে। নারী সম্পদের অধিকারী, পুরুষ সম্পদের অধিকারী—উভয়ের অংশ নির্ধারিত। এতে পরিবারে ভারসাম্য আসে, বিরোধ কমে, দুর্বলদের অধিকার সুরক্ষিত হয়।

আজকের সমাজে উত্তরাধিকার নিয়ে বিরোধ, প্রতারণা, বঞ্চনা সাধারণ ঘটনা। কেউ ইচ্ছামতো বণ্টন করে, কেউ নারীর অধিকার অস্বীকার করে। কিন্তু এই আয়াত ঘোষণা করে—এটি আল্লাহর নির্ধারিত আইন। মানুষ নিজের আবেগ বা সামাজিক রীতির ভিত্তিতে তা পরিবর্তন করতে পারে না।

সংক্ষেপে (করণীয়)

এই আয়াত আমাদের শেখায়—উত্তরাধিকার বণ্টনে আল্লাহর বিধান মেনে চলা বাধ্যতামূলক। ঋণ ও অঙ্গীকার নিষ্পত্তিকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। নারী-অধিকার নিশ্চিত করতে হবে। ওসিয়তের মাধ্যমে অন্যের ক্ষতি করা যাবে না। এবং মনে রাখতে হবে—আল্লাহ সর্বজ্ঞ ও প্রজ্ঞাময়; তাঁর নির্ধারণেই ন্যায় ও কল্যাণ নিহিত।

আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর নির্ধারিত বিধান অনুযায়ী জীবন পরিচালনার তাওফিক দান করুন।

Print this entry


আপনার মতামত লিখুন :
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x