• শুক্রবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৬, ০৩:০৮ অপরাহ্ন

তাফসীর | সূরা ৪ : আয়াত ৩৭

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ১৭১ Time View
Update : শুক্রবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

তাফসীর | সূরা আন-নিসা : আয়াত ৩৭

তাফসীর | Friends of Quran Foundation


আরবি আয়াত

الَّذِينَ يَبْخَلُونَ وَيَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبُخْلِ وَيَكْتُمُونَ مَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ ۗ وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ عَذَابًا مُّهِينًا


ভাবার্থভিত্তিক অনুবাদ

যারা কৃপণতা করে এবং মানুষকেও কৃপণতার নির্দেশ দেয়, এবং আল্লাহ তাদেরকে যে অনুগ্রহ দিয়েছেন তা গোপন করে—আর আমরা কাফিরদের জন্য প্রস্তুত রেখেছি অপমানজনক শাস্তি।
(অনুবাদ – Friends of Quran Foundation)


আয়াতের তাফসীর

সূরা আন-নিসা সামাজিক ন্যায়, সম্পদ, পরিবার ও নৈতিক চরিত্রের সূরা। ৩৬ নম্বর আয়াতে আল্লাহ নির্দেশ দেন—তোমরা আল্লাহর ইবাদত করো, তাঁর সাথে কাউকে শরিক করো না, এবং পিতা-মাতা, আত্মীয়স্বজন, এতিম, মিসকীন, প্রতিবেশী, পথিক—সবাইয়ের সাথে উত্তম আচরণ করো। এই মানবিক ও সামাজিক নির্দেশনার পরই ৩৭ নম্বর আয়াত আসে। যেন বলা হচ্ছে—সমাজকে ধ্বংস করে এমন একটি চরিত্র হলো কৃপণতা।

আয়াতটি শুরু হয়েছে— “الَّذِينَ يَبْخَلُونَ” — যারা কৃপণতা করে। “بخل” অর্থ শুধু দান না করা নয়; বরং আল্লাহ প্রদত্ত সম্পদকে নিজের একচেটিয়া অধিকার মনে করা। কুরআন সম্পদকে মানুষের অর্জন নয়, আল্লাহর অনুগ্রহ বলে ঘোষণা করেছে। সূরা হাদীদ (৫৭:৭)-এ বলা হয়েছে:
“وَأَنفِقُوا مِمَّا جَعَلَكُم مُّسْتَخْلَفِينَ فِيهِ” — তোমরা সেই সম্পদ থেকে ব্যয় করো, যার উপর তোমাদেরকে প্রতিনিধি করা হয়েছে।
অর্থাৎ সম্পদের প্রকৃত মালিক আল্লাহ; মানুষ কেবল আমানতদার।

কৃপণতা সেই আমানতের খিয়ানত।

এরপর বলা হয়েছে— “وَيَأْمُرُونَ النَّاسَ بِالْبُخْلِ” — তারা মানুষকেও কৃপণতার নির্দেশ দেয়। অর্থাৎ তারা শুধু নিজেরাই ব্যয় করে না; বরং অন্যকেও নিরুৎসাহিত করে। এটি একটি সামাজিক রোগ। কেউ যদি ব্যক্তিগতভাবে কৃপণ হয়, তার ক্ষতি সীমিত; কিন্তু যখন সে অন্যদেরও দান থেকে ফিরিয়ে রাখে, তখন সমাজে কল্যাণের প্রবাহ থেমে যায়।

কুরআন অন্যত্র এই মানসিকতার চিত্র তুলে ধরেছে। সূরা লাইল (৯২:৮–১০):
“وَأَمَّا مَن بَخِلَ وَاسْتَغْنَىٰ ۝ وَكَذَّبَ بِالْحُسْنَىٰ ۝ فَسَنُيَسِّرُهُ لِلْعُسْرَىٰ”
যে কৃপণতা করে, নিজেকে অমুখাপেক্ষী মনে করে এবং উত্তম প্রতিদানকে অস্বীকার করে—আমরা তার জন্য কঠিন পথ সহজ করে দেব।

এখানে কৃপণতা কেবল অর্থনৈতিক আচরণ নয়; এটি আখিরাতের অস্বীকৃতির লক্ষণ।

এরপর আয়াতে বলা হয়েছে— “وَيَكْتُمُونَ مَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِن فَضْلِهِ” — তারা আল্লাহ তাদেরকে যে অনুগ্রহ দিয়েছেন তা গোপন করে। এই গোপন করা দুইভাবে হতে পারে। এক, তারা সম্পদ লুকায় যাতে দান না করতে হয়। দুই, তারা জ্ঞান ও সত্য গোপন করে। সূরা বাকারা (২:১৫৯)-এ বলা হয়েছে:
“إِنَّ الَّذِينَ يَكْتُمُونَ مَا أَنزَلْنَا مِنَ الْبَيِّنَاتِ وَالْهُدَىٰ” — যারা আমরা যে স্পষ্ট নিদর্শন ও হেদায়াত নাজিল করেছি তা গোপন করে।
অর্থাৎ আল্লাহর অনুগ্রহ শুধু সম্পদ নয়; জ্ঞানও অনুগ্রহ। কৃপণতা সম্পদের ক্ষেত্রে যেমন অপরাধ, তেমনি জ্ঞান গোপন করাও অপরাধ।

এই আয়াতের শেষে কঠোর ঘোষণা— “وَأَعْتَدْنَا لِلْكَافِرِينَ عَذَابًا مُّهِينًا” — আমরা কাফিরদের জন্য অপমানজনক শাস্তি প্রস্তুত রেখেছি। এখানে “কাফির” শব্দ ব্যবহারের অর্থ গভীর। “কুফর” শব্দের মূল অর্থ ঢেকে দেওয়া। যে ব্যক্তি আল্লাহর অনুগ্রহকে স্বীকার না করে তা গোপন করে, কৃপণতা করে, সে এক অর্থে কৃতজ্ঞতার বিপরীত আচরণ করে। সূরা ইবরাহীম (১৪:৭)-এ বলা হয়েছে:
“لَئِن شَكَرْتُمْ لَأَزِيدَنَّكُمْ” — তোমরা কৃতজ্ঞ হলে আমি তোমাদের বৃদ্ধি দেব।
অর্থাৎ কৃতজ্ঞতা বৃদ্ধি আনে; কৃপণতা ও গোপন করা কুফরীর লক্ষণ।

কুরআন কৃপণতার পরিণতি সম্পর্কে আরও সতর্ক করেছে। সূরা আলে ইমরান (৩:১৮০):
“وَلَا يَحْسَبَنَّ الَّذِينَ يَبْخَلُونَ … هُوَ خَيْرًا لَّهُم ۖ بَلْ هُوَ شَرٌّ لَّهُم”
যারা কৃপণতা করে তারা যেন মনে না করে এটি তাদের জন্য কল্যাণকর; বরং এটি তাদের জন্য অকল্যাণকর।

অর্থাৎ কৃপণতা মানুষকে নিরাপদ করে না; বরং আখিরাতে অপমান ডেকে আনে।

সূরা মুহাম্মদ (৪৭:৩৮)-এ বলা হয়েছে:
“وَمَن يَبْخَلْ فَإِنَّمَا يَبْخَلُ عَن نَّفْسِهِ” — যে কৃপণতা করে, সে নিজেরই ক্ষতি করে।

অতএব সূরা আন-নিসা ৪:৩৭ আয়াতটি একটি চরিত্রগত অপরাধের বিরুদ্ধে ঘোষণা। এটি কেবল অর্থনৈতিক বিধান নয়; এটি ঈমানের পরীক্ষাও। সম্পদ আল্লাহর অনুগ্রহ—এটি স্বীকার করা মানে তা ব্যয়ে প্রস্তুত থাকা। আর অনুগ্রহ গোপন করা মানে কৃতজ্ঞতার অস্বীকার।

আজকের সমাজে কৃপণতা নানা রূপে দেখা যায়। কেউ সম্পদ জমিয়ে রাখে, সমাজের প্রয়োজন অগ্রাহ্য করে। কেউ জ্ঞান গোপন করে। কেউ অন্যকে দান থেকে নিরুৎসাহিত করে। কিন্তু কুরআনের ভাষা স্পষ্ট—এই আচরণ ঈমানের পরিপন্থী এবং অপমানজনক শাস্তির কারণ।

সংক্ষেপে (করণীয়)

এই আয়াত আমাদের শেখায়—সম্পদকে আল্লাহর আমানত হিসেবে দেখা। কৃপণতা থেকে নিজেকে রক্ষা করা। অন্যকে দানে উৎসাহিত করা, নিরুৎসাহিত না করা। আল্লাহর অনুগ্রহ—চাই তা সম্পদ হোক বা জ্ঞান—গোপন না করা। এবং মনে রাখা—কৃতজ্ঞতা বৃদ্ধি আনে, কৃপণতা অপমানজনক পরিণতি ডেকে আনে।

আল্লাহ আমাদের অন্তরকে উদার করুন, কৃপণতা থেকে রক্ষা করুন এবং তাঁর অনুগ্রহ সঠিকভাবে ব্যবহার করার তাওফিক দান করুন।

Print this entry


আপনার মতামত লিখুন :
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x