লেখক: মাহাতাব আকন্দ
প্রকাশনা: Friends of Quran Foundation
إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِندَ اللَّهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا فِي كِتَابِ اللَّهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ ۚ ذَٰلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ ۚ فَلَا تَظْلِمُوا فِيهِنَّ أَنفُسَكُمْ ۚ وَقَاتِلُوا الْمُشْرِكِينَ كَافَّةً كَمَا يُقَاتِلُونَكُمْ كَافَّةً ۚ وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ مَعَ الْمُتَّقِينَ
নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা বারো—আল্লাহর বিধানে—যেদিন তিনি আসমানসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন সেদিন থেকে। এর মধ্যে চারটি সম্মানিত মাস। এটিই সোজা ও প্রতিষ্ঠিত দ্বীন। সুতরাং এ মাসগুলোর মধ্যে তোমরা নিজেদের উপর জুলুম করো না। আর তোমরা সকল মুশরিকদের বিরুদ্ধে সমবেতভাবে লড়াই করো, যেমন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সমবেতভাবে লড়াই করে। আর জেনে রাখো—আল্লাহ মুত্তাকীদের সাথে আছেন।
সূরা আত-তাওবাহের ৩৬ নম্বর আয়াতটি ইসলামের সময়বোধ, নৈতিক সংযম, যুদ্ধনীতি এবং তাকওয়ার ধারণাকে একত্রে তুলে ধরে। এখানে আল্লাহ মানুষের তৈরি ক্যালেন্ডার বা সামাজিক প্রচলন নয়; বরং সৃষ্টির সূচনালগ্ন থেকে নির্ধারিত এক ব্যবস্থার কথা বলেছেন। অর্থাৎ সময়ের কাঠামো মানবিক চুক্তির ফল নয়; বরং আল্লাহর সৃষ্টিব্যবস্থার অংশ।
আয়াত শুরু হয়েছে—
“إِنَّ عِدَّةَ الشُّهُورِ عِندَ اللَّهِ اثْنَا عَشَرَ شَهْرًا”
নিশ্চয়ই আল্লাহর কাছে মাসের সংখ্যা বারো।
এখানে “عند الله”—আল্লাহর কাছে—শব্দটি অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। এটি বোঝায় যে মাসের সংখ্যা মানুষের রীতি বা জাতিগত প্রথার উপর নির্ভরশীল নয়। আল্লাহ আসমান ও জমিন সৃষ্টি করার দিন থেকেই সময়ের এই বিন্যাস নির্ধারিত। অর্থাৎ সময়ের হিসাব আল্লাহর বিধানের অংশ।
এরপর বলা হয়েছে—
“فِي كِتَابِ اللَّهِ يَوْمَ خَلَقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضَ”
আল্লাহর কিতাবে, যেদিন তিনি আসমান ও জমিন সৃষ্টি করেছেন।
“কিতাবুল্লাহ” এখানে সৃষ্টিগত বিধান—আল্লাহর নির্ধারিত নিয়ম। এটি ইঙ্গিত করে যে সময়ের শৃঙ্খলা একটি মহাজাগতিক বাস্তবতা।
এরপর গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণা—
“مِنْهَا أَرْبَعَةٌ حُرُمٌ”
এর মধ্যে চারটি সম্মানিত মাস।
এই চার মাস হলো—যুলক্বদ, যুলহিজ্জা, মুহাররম ও রজব। এগুলোকে “হুরুম” বলা হয়েছে—অর্থাৎ সম্মানিত, পবিত্র। ইসলামের পূর্বেও আরব সমাজে এ মাসগুলোতে যুদ্ধ বন্ধ রাখা হতো। কুরআন সেই প্রথাকে শুদ্ধ ও প্রতিষ্ঠিত করেছে।
এরপর বলা হয়েছে—
“ذَٰلِكَ الدِّينُ الْقَيِّمُ”
এটাই সোজা, প্রতিষ্ঠিত দ্বীন।
অর্থাৎ সময়ের এই সম্মান, যুদ্ধবিরতি, সংযম—এসব দ্বীনের অংশ। দ্বীন কেবল নামাজ-রোজা নয়; সময়ের সম্মানও দ্বীনের অন্তর্ভুক্ত।
তারপর নির্দেশ—
“فَلَا تَظْلِمُوا فِيهِنَّ أَنفُسَكُمْ”
এই মাসগুলোতে নিজেদের উপর জুলুম করো না।
এখানে আবার “নিজেদের উপর জুলুম” বলা হয়েছে। জুলুম মানে সীমালঙ্ঘন, অন্যায়, পাপ। সম্মানিত মাসে পাপের গুরুতরতা আরও বেশি। যদিও পাপ সব সময়ই খারাপ, কিন্তু সম্মানিত সময়, স্থান ও অবস্থা পাপকে আরও গুরুতর করে তোলে। যেমন রমজানে গুনাহের ওজন বেশি অনুভূত হয়।
এরপর আয়াত যুদ্ধের প্রসঙ্গ এনেছে—
“وَقَاتِلُوا الْمُشْرِكِينَ كَافَّةً كَمَا يُقَاتِلُونَكُمْ كَافَّةً”
তোমরা সকল মুশরিকদের বিরুদ্ধে সমবেতভাবে লড়াই করো, যেমন তারা তোমাদের বিরুদ্ধে সমবেতভাবে লড়াই করে।
এই অংশটি প্রেক্ষাপটসহ বোঝা জরুরি। সূরা আত-তাওবাহ নাযিল হয়েছিল এমন এক সময়, যখন মুসলিম সমাজের বিরুদ্ধে সংগঠিত আক্রমণ হচ্ছিল। এখানে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে—যদি তারা সম্মিলিতভাবে আক্রমণ করে, তাহলে তোমরাও ঐক্যবদ্ধভাবে প্রতিরোধ করো। এটি আক্রমণাত্মক যুদ্ধের লাইসেন্স নয়; বরং সংগঠিত আগ্রাসনের জবাবে ঐক্যবদ্ধ প্রতিরোধের নীতি।
সবশেষে বলা হয়েছে—
“وَاعْلَمُوا أَنَّ اللَّهَ مَعَ الْمُتَّقِينَ”
জেনে রাখো, আল্লাহ মুত্তাকীদের সাথে।
এখানে যুদ্ধের নির্দেশের পরই তাকওয়ার কথা বলা হয়েছে। অর্থাৎ যুদ্ধও সীমাহীন নয়; তাকওয়ার সীমার ভেতরে। যারা সংযমী, ন্যায়পরায়ণ, সীমালঙ্ঘন করে না—আল্লাহ তাদের সাথে।
এই আয়াত চারটি মৌলিক শিক্ষা দেয়:
প্রথমত, সময় আল্লাহর নির্ধারিত। মানুষের সুবিধামতো পরিবর্তনযোগ্য নয়।
দ্বিতীয়ত, কিছু সময় বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ—সেখানে পাপের গুরুতরতা বেশি।
তৃতীয়ত, আত্মজুলুম সবসময়ই নিষিদ্ধ, বিশেষত সম্মানিত সময়ে।
চতুর্থত, যুদ্ধের নীতিও তাকওয়ার অধীন; প্রতিরোধের ক্ষেত্রেও সীমা রয়েছে।
এখানে একটি ভারসাম্য আছে—একদিকে সম্মানিত মাসে সংযম, অন্যদিকে প্রয়োজন হলে সংগঠিত প্রতিরোধ। দ্বীন কেবল শান্তিবাদ নয়; আবার অরাজক যুদ্ধও নয়। এটি ন্যায়ের ভারসাম্য।
✔ সময়ের সম্মান রক্ষা করা
✔ সম্মানিত মাসে পাপ থেকে বিশেষভাবে বিরত থাকা
✔ আত্মজুলুম থেকে সতর্ক থাকা
✔ ঐক্যবদ্ধ থাকা যখন আগ্রাসন আসে
✔ যুদ্ধেও তাকওয়ার সীমা মানা
আল্লাহ আমাদেরকে সময়ের মর্যাদা বুঝার তাওফীক দিন, সম্মানিত মাসগুলোতে বিশেষ সংযম দান করুন এবং সব অবস্থায় তাকওয়ার উপর প্রতিষ্ঠিত রাখুন।
