• বুধবার, ১৫ এপ্রিল ২০২৬, ০৪:১১ অপরাহ্ন

তাফসীর | সূরা ৫ : আয়াত ৫১

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ১৩৬ Time View
Update : শনিবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬

তাফসীর | সূরা আল-মায়িদাহ : আয়াত ৫১

লেখক: মাহাতাব আকন্দ
প্রকাশনা: Friends of Quran Foundation


আরবি আয়াত

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تَتَّخِذُوا الْيَهُودَ وَالنَّصَارَىٰ أَوْلِيَاءَ ۘ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ ۚ وَمَن يَتَوَلَّهُم مِّنكُمْ فَإِنَّهُ مِنْهُمْ ۗ إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ


বাংলা ভাবার্থ

হে ঈমানদারগণ, তোমরা ইয়াহূদী ও নাসারাদেরকে অভিভাবক (অন্তরঙ্গ রক্ষক-সহযোগী) হিসেবে গ্রহণ করো না। তারা একে অপরের অভিভাবক। আর তোমাদের মধ্যে যে তাদেরকে এভাবে গ্রহণ করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে। নিশ্চয়ই আল্লাহ জালিম জাতিকে হিদায়াত দেন না।


আয়াতের তাফসীর ও বিশদ ব্যাখ্যা

সূরা আল-মায়িদাহর ৫১ নম্বর আয়াত ইসলামী রাজনৈতিক ও নৈতিক অবস্থানের একটি গুরুত্বপূর্ণ আয়াত। এই আয়াত বহুবার ভুলভাবে উদ্ধৃত হয়েছে, কখনো কঠোরতা প্রমাণে, কখনো বিদ্বেষ উসকে দিতে। অথচ কুরআনের আয়াতকে কুরআনের সামগ্রিক প্রেক্ষাপটে না বুঝলে বিভ্রান্তি তৈরি হয়। তাই এই আয়াতের শব্দার্থ, প্রেক্ষাপট, এবং কুরআনের অন্যান্য নির্দেশনার সাথে সামঞ্জস্য রেখে ব্যাখ্যা করা জরুরি।

আয়াত শুরু হয়েছে—
“يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا” — হে ঈমানদারগণ।
অর্থাৎ এই নির্দেশ একটি ঈমানী অবস্থান থেকে দেওয়া হচ্ছে। এটি ব্যক্তিগত সম্পর্কের সাধারণ বিধান নয়; বরং একটি নীতিগত অবস্থান।

মূল শব্দটি হলো—“أولياء” (আউলিয়া)। “ওলী” শব্দের অর্থ বহুস্তরীয়—অন্তরঙ্গ রক্ষক, রাজনৈতিক অভিভাবক, সামরিক সহযোগী, প্রভুত্বশীল মিত্র, এমন সম্পর্ক যা আনুগত্য ও নির্ভরতার ভিত্তিতে গড়ে ওঠে। এখানে কেবল সামাজিক সৌজন্য বা প্রতিবেশীসুলভ আচরণ বোঝানো হয়নি। বরং এমন রাজনৈতিক ও কৌশলগত আনুগত্য বোঝানো হয়েছে যা ঈমানী অবস্থানকে দুর্বল করে দেয়।

ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপটে দেখা যায়—মদিনায় মুসলিম সমাজ প্রতিষ্ঠার পর কিছু লোক ইয়াহূদী ও নাসারাদের রাজনৈতিক শক্তির উপর নির্ভর করতে চাইত। কিছু মুনাফিক গোপনে তাদের সঙ্গে আঁতাত করত। এই আয়াত সেই ধরনের আনুগত্যের বিরুদ্ধে সতর্ক করছে।

এখানে বলা হয়েছে—
“بعضهم أولياء بعض” — তারা একে অপরের অভিভাবক।
অর্থাৎ তাদের নিজস্ব ধর্মীয় ও রাজনৈতিক ঐক্য রয়েছে। ফলে মুসলিমদের জন্য সতর্কবার্তা—তোমরা তোমাদের ঈমানী স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে তাদের শক্তির উপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ো না।

এরপর কঠোর সতর্কতা—
“ومن يتولهم منكم فإنه منهم” — তোমাদের মধ্যে যে তাদেরকে (এই ধরনের) অভিভাবক হিসেবে গ্রহণ করবে, সে তাদেরই অন্তর্ভুক্ত হবে।

এখানে “তাওয়াল্লা” মানে অন্তরঙ্গ আনুগত্য গ্রহণ করা। অর্থাৎ যদি কেউ তার ঈমানী পরিচয় বিসর্জন দিয়ে তাদের প্রভাবাধীন হয়ে পড়ে, তাদের নীতির অনুসারী হয়ে যায়, তাদের শক্তির উপর নির্ভর করে দ্বীনের অবস্থান দুর্বল করে—তাহলে সে নিজের অবস্থান পরিবর্তন করে ফেলে।

এখানে লক্ষ্যণীয়—কুরআন অন্যত্র স্পষ্টভাবে ন্যায় ও সদাচরণের নির্দেশ দিয়েছে:

“لَا يَنْهَاكُمُ اللَّهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ…” (৬০:৮)
আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না তাদের সাথে সদাচরণ করতে, যারা তোমাদের সঙ্গে দ্বীনের কারণে যুদ্ধ করেনি।

অতএব ৫:৫১ আয়াত বিদ্বেষ বা সাধারণ সম্পর্ক নিষিদ্ধ করছে না। বরং এমন রাজনৈতিক ও বিশ্বাসগত আনুগত্য নিষিদ্ধ করছে যা মুসলিম সমাজের নিরাপত্তা ও ঈমানী অবস্থানকে ক্ষতিগ্রস্ত করে।

আয়াতের শেষাংশ—
“إِنَّ اللَّهَ لَا يَهْدِي الْقَوْمَ الظَّالِمِينَ” — আল্লাহ জালিম জাতিকে হিদায়াত দেন না।

এখানে “জালিম” শব্দটি গুরুত্বপূর্ণ। জুলুম মানে অন্যায়ের সীমা অতিক্রম। যে ব্যক্তি নিজের ঈমানী অবস্থানকে বিসর্জন দিয়ে অন্যের শক্তির কাছে আত্মসমর্পণ করে, সে নিজের উপর জুলুম করে। আবার যারা ঈমানের স্বাতন্ত্র্য ধ্বংস করে রাজনৈতিক সুবিধার জন্য আপস করে, তারাও জুলুম করে।


গভীর তাৎপর্য

এই আয়াতের তিনটি মৌলিক শিক্ষা রয়েছে:

প্রথমত, মুসলিম সমাজের ঈমানী স্বাতন্ত্র্য রক্ষা করা আবশ্যক।
দ্বিতীয়ত, রাজনৈতিক ও কৌশলগত আনুগত্য ঈমানের ভিত্তিতে নির্ধারিত হতে হবে।
তৃতীয়ত, সাধারণ মানবিক সম্পর্ক, ব্যবসা, প্রতিবেশীসুলভ আচরণ নিষিদ্ধ নয়—বরং ন্যায় ও সদাচরণ কুরআনের নির্দেশ।

এখানে বিদ্বেষ নয়; সতর্কতা। এখানে ঘৃণা নয়; নীতিগত অবস্থান। ইসলামের ইতিহাসে মুসলিমরা অমুসলিমদের সঙ্গে ব্যবসা করেছে, চুক্তি করেছে, সহাবস্থান করেছে। কিন্তু ঈমানী পরিচয় বিসর্জন দিয়ে নির্ভরশীল হয়ে পড়া অনুমোদিত নয়।


সম্পর্কিত আয়াতসমূহ

  • ৬০:৮ — অযুদ্ধকারী অমুসলিমদের সঙ্গে সদাচরণ
  • ৫:৫ — আহলে কিতাবের খাদ্য ও বিবাহ বৈধ
  • ৩:২৮ — মুমিনদেরকে অবিশ্বাসীদেরকে অন্তরঙ্গ রক্ষক না বানাতে সতর্কতা
  • ৪:১৪৪ — মুমিনদেরকে কুফরপন্থীদের উপর নির্ভর না করতে বলা

সংক্ষেপে (করণীয়)

✔ ঈমানী স্বাতন্ত্র্য রক্ষা
✔ রাজনৈতিক আনুগত্যে সতর্কতা
✔ সাধারণ সদাচরণ বজায় রাখা
✔ বিদ্বেষ নয়, ন্যায় ও ভারসাম্য
✔ জুলুম থেকে বাঁচা

আল্লাহ আমাদেরকে এমন অবস্থানে রাখুন যাতে আমরা ন্যায়, ভারসাম্য ও ঈমানী দৃঢ়তার সাথে জীবনযাপন করতে পারি, এবং কুরআনের নির্দেশনা বিকৃত না করি।

Print this entry


আপনার মতামত লিখুন :
0 0 votes
Article Rating
Subscribe
Notify of
guest

0 Comments
Oldest
Newest Most Voted
Inline Feedbacks
View all comments
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page

0
Would love your thoughts, please comment.x
()
x