লেখক: মাহাতাব আকন্দ
প্রকাশনা: Friends of Quran Foundation
بَدِيعُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۖ وَإِذَا قَضَىٰ أَمْرًا فَإِنَّمَا يَقُولُ لَهُ كُن فَيَكُونُ
তিনি আসমানসমূহ ও পৃথিবীর উদ্ভাবক। আর যখন তিনি কোনো বিষয়ের ফয়সালা করেন, তখন তিনি তাকে শুধু বলেন “হও”—অতঃপর তা হয়ে যায়।
সূরা আল-বাকারার ১১৭ নম্বর আয়াত আল্লাহর সৃষ্টিশক্তি, ইচ্ছাশক্তি এবং সর্বময় ক্ষমতার এক সংক্ষিপ্ত অথচ গভীর ঘোষণা। এই আয়াতটি বিশেষভাবে সেই দাবির জবাব, যেখানে কেউ আল্লাহর জন্য সন্তান সাব্যস্ত করতে চেয়েছিল (পূর্ববর্তী আয়াতে এ প্রসঙ্গ এসেছে)। কুরআন এখানে যুক্তি দিচ্ছে—যিনি আসমান ও জমিনের উদ্ভাবক, তাঁর জন্য সন্তান ধারণের ধারণাই অযৌক্তিক। কারণ সন্তান ধারণ হয় অভাব, প্রয়োজন, বংশধারা বা দুর্বলতার কারণে। অথচ আল্লাহ হলেন “বদী‘” — উদ্ভাবক, যিনি বিনা নমুনায় সৃষ্টি করেন।
আয়াতের শুরু—
“بَدِيعُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ”
তিনি আসমানসমূহ ও পৃথিবীর উদ্ভাবক।
“বদী‘” শব্দটি “বদ‘” মূল থেকে, যার অর্থ—কোনো কিছু পূর্বনিদর্শন ছাড়া সৃষ্টি করা। মানুষ যা সৃষ্টি করে, তা বিদ্যমান উপাদান ও জ্ঞানের ভিত্তিতে। কিন্তু আল্লাহ সৃষ্টি করেন অস্তিত্বহীনতা থেকে। সূরা আন‘আম (৬:১০১)-এ একই শব্দ এসেছে—
“بَدِيعُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ ۖ أَنَّىٰ يَكُونُ لَهُ وَلَدٌ”
তিনি আসমান ও জমিনের উদ্ভাবক; তাঁর কীভাবে সন্তান হতে পারে?
অর্থাৎ সৃষ্টিকর্তা ও সৃষ্টির সম্পর্ক পিতা-পুত্রের সম্পর্ক নয়। তিনি সৃষ্টির উপরে, স্বাধীন, পরিপূর্ণ।
এরপর আয়াত বলে—
“وَإِذَا قَضَىٰ أَمْرًا”
আর যখন তিনি কোনো বিষয়ের সিদ্ধান্ত নেন।
“কদা” মানে চূড়ান্ত ফয়সালা, নির্ধারণ। এখানে বোঝানো হয়েছে—আল্লাহর ইচ্ছা কোনো বাধার মুখোমুখি হয় না। তাঁর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের জন্য কোনো বাহ্যিক শক্তির প্রয়োজন হয় না।
এরপর এসেছে কুরআনের এক মহৎ বাক্য—
“فَإِنَّمَا يَقُولُ لَهُ كُن فَيَكُونُ”
তিনি তাকে বলেন—“হও”—অতঃপর তা হয়ে যায়।
এটি রূপক ভাষা, যা আল্লাহর ইচ্ছাশক্তির তাৎক্ষণিক কার্যকারিতা বোঝায়। আল্লাহর সৃষ্টিকাজ মানুষের মতো প্রক্রিয়াগত সীমাবদ্ধতায় আবদ্ধ নয়। তাঁর আদেশ ও বাস্তবায়নের মাঝে বিলম্ব নেই।
এই বাক্য কুরআনের বিভিন্ন স্থানে এসেছে (৩:৪৭, ১৬:৪০, ১৯:৩৫, ৩৬:৮২)। সূরা ইয়াসীন (৩৬:৮২)-এ বলা হয়েছে—
“إِنَّمَا أَمْرُهُ إِذَا أَرَادَ شَيْئًا أَن يَقُولَ لَهُ كُن فَيَكُونُ”
তাঁর বিষয় কেবল এই—যখন তিনি কিছু ইচ্ছা করেন, বলেন “হও”—অতঃপর তা হয়ে যায়।
এখানে আল্লাহর সৃষ্টিশক্তির সীমাহীনতা বোঝানো হয়েছে। মানববুদ্ধি সময়, স্থান, উপাদান, প্রক্রিয়া—এসবের উপর নির্ভরশীল। কিন্তু আল্লাহর ইচ্ছা এসব সীমার ঊর্ধ্বে।
এই আয়াত তিনটি মৌলিক শিক্ষা দেয়:
প্রথমত, আল্লাহর সৃষ্টিশক্তি তুলনাহীন। তিনি উদ্ভাবক—বিনা নমুনায় সৃষ্টি করেন।
দ্বিতীয়ত, আল্লাহর ইচ্ছা চূড়ান্ত। কোনো শক্তি তাঁর সিদ্ধান্ত ঠেকাতে পারে না।
তৃতীয়ত, সৃষ্টির প্রক্রিয়া তাঁর জন্য কষ্টসাধ্য নয়; বরং তাঁর আদেশই বাস্তবতা।
এখানে একটি গুরুত্বপূর্ণ ঈমানী শিক্ষা রয়েছে—মানুষ যখন অসম্ভব ভেবে হতাশ হয়, তখন এই আয়াত স্মরণ করায়—আল্লাহর জন্য অসম্ভব বলে কিছু নেই। সৃষ্টি, পুনরুত্থান, ক্ষমা, পরিবর্তন—সবই তাঁর “কুন” আদেশের অধীন।
এটি কেবল সৃষ্টিতত্ত্ব নয়; আখিরাতের প্রমাণও। যদি আল্লাহ প্রথমবার সৃষ্টি করতে পারেন, তবে পুনরায় সৃষ্টি (পুনরুত্থান) তাঁর জন্য কঠিন নয়। সূরা রূম (৩০:২৭)-এ বলা হয়েছে—
“প্রথম সৃষ্টি তিনিই শুরু করেন, তারপর তা পুনরাবৃত্তি করেন; এটি তাঁর জন্য আরও সহজ।”
✔ আল্লাহর সৃষ্টিশক্তিতে পূর্ণ আস্থা
✔ অসম্ভব মনে হলেও আল্লাহর উপর নির্ভর
✔ আল্লাহকে সৃষ্টির সাথে তুলনা না করা
✔ আখিরাত ও পুনরুত্থানে বিশ্বাস দৃঢ় করা
আল্লাহ আমাদের অন্তরে এমন ঈমান দান করুন, যাতে আমরা তাঁর “কুন ফায়াকূন” ক্ষমতার উপর অটল আস্থা রাখি এবং তাঁর একত্ব ও পরিপূর্ণতা স্বীকার করে জীবনযাপন করি।
