লেখক: মাহাতাব আকন্দ
প্রকাশনা: Friends of Quran Foundation
فَمَن لَّمْ يَجِدْ فَصِيَامُ شَهْرَيْنِ مُتَتَابِعَيْنِ مِن قَبْلِ أَن يَتَمَاسَّا ۖ فَمَن لَّمْ يَسْتَطِعْ فَإِطْعَامُ سِتِّينَ مِسْكِينًا ۚ ذَٰلِكَ لِتُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ۚ وَتِلْكَ حُدُودُ اللَّهِ ۗ وَلِلْكَافِرِينَ عَذَابٌ أَلِيمٌ
অতএব যে (দাসমুক্ত করার সামর্থ্য) পায় না—তবে তাদের পরস্পর স্পর্শের আগে ধারাবাহিক দুই মাস সিয়াম পালন করবে। আর যে তাও সামর্থ্য রাখে না—তবে ষাটজন দরিদ্রকে খাদ্য দান করবে। এটি এজন্য, যাতে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান স্থাপন করো। এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা। আর যারা অস্বীকার করে, তাদের জন্য রয়েছে বেদনাদায়ক শাস্তি।
সূরা আল-মুজাদালাহর ৪ নম্বর আয়াত যিহার সংক্রান্ত কাফফারার দ্বিতীয় ও তৃতীয় স্তর নির্ধারণ করে। আগের আয়াতে (৫৮:৩) বলা হয়েছিল—যিহার করে সম্পর্ক পুনঃস্থাপন করতে চাইলে প্রথমে একটি দাসমুক্ত করতে হবে। এখন এখানে বলা হচ্ছে—যদি সে সামর্থ্য না থাকে, তাহলে কী করবে।
আয়াতের শুরু—
“فمن لم يجد”
যে পায় না (অর্থাৎ দাসমুক্তির সামর্থ্য রাখে না)।
ইসলাম বাস্তবতা বিবেচনা করে বিধান দেয়। সবার আর্থিক অবস্থা এক নয়। তাই বিকল্প পথ রাখা হয়েছে।
প্রথম বিকল্প—
“فصيام شهرين متتابعين”
ধারাবাহিক দুই মাস সিয়াম পালন।
“মুতাতাবি‘আয়েন” মানে টানা, বিরতিহীন। অর্থাৎ এটি সহজ নয়; শারীরিক ও মানসিক শৃঙ্খলা দাবি করে। যিহার ছিল একটি আবেগপ্রসূত, দায়িত্বহীন উচ্চারণ। তার কাফফারা হলো দীর্ঘস্থায়ী সংযম। এটি প্রতীকী—জিহ্বার বেপরোয়া ব্যবহারের প্রায়শ্চিত্ত শরীরের সংযমের মাধ্যমে।
শর্ত—
“من قبل أن يتماسا”
দাম্পত্য সম্পর্ক পুনঃস্থাপনের আগে।
অর্থাৎ সংশোধন ছাড়া সম্পর্ক পুনরায় শুরু নয়। এটি সম্পর্কের পবিত্রতা রক্ষা করে।
দ্বিতীয় বিকল্প—
“فمن لم يستطع فإطعام ستين مسكينا”
যে তা-ও পারে না—তবে ষাটজন দরিদ্রকে খাদ্যদান।
এখানে সামাজিক দিকটি স্পষ্ট। ব্যক্তিগত ভুলের প্রায়শ্চিত্ত সমাজকল্যাণের মাধ্যমে। ষাটজন দরিদ্রকে খাওয়ানো মানে সমাজের উপকার। ইসলাম ব্যক্তিগত পাপের কাফফারাকে সামাজিক কল্যাণের সাথে যুক্ত করেছে।
এরপর আয়াত বলছে—
“ذلك لتؤمنوا بالله ورسوله”
এটি এজন্য, যাতে তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের উপর ঈমান স্থাপন করো।
এখানে গভীর শিক্ষা আছে। কাফফারা কেবল শাস্তি নয়; ঈমানের অনুশীলন। যখন মানুষ কষ্টসাধ্য প্রায়শ্চিত্ত গ্রহণ করে, তখন সে বুঝতে শেখে—আল্লাহর বিধান হালকা নয়। আনুগত্য ঈমানের প্রমাণ।
অর্থাৎ ঈমান কেবল মুখের ঘোষণা নয়; বাস্তব আনুগত্য।
এগুলো আল্লাহর নির্ধারিত সীমা।
“হুদুদুল্লাহ” মানে নির্ধারিত সীমারেখা। সীমা মানা মানে শৃঙ্খলা। সীমালঙ্ঘন মানে জুলুম। যিহার ছিল সীমালঙ্ঘন; কাফফারা সেই সীমা পুনঃস্থাপন।
কুরআনে বারবার বলা হয়েছে—
“এগুলো আল্লাহর সীমা; এগুলো অতিক্রম করো না।” (২:২২৯)
শেষে সতর্কতা—
“وللكافرين عذاب أليم”
অস্বীকারকারীদের জন্য বেদনাদায়ক শাস্তি।
এখানে “কাফির” শব্দটি এমন ব্যক্তিকে বোঝাতে পারে, যে আল্লাহর নির্ধারিত বিধানকে অবজ্ঞা করে বা প্রত্যাখ্যান করে। অর্থাৎ কেউ যদি বলে—আমি এই সীমা মানি না—তাহলে তা ঈমানের বিপরীত অবস্থান।
এই আয়াত আমাদের কয়েকটি বড় শিক্ষা দেয়:
১. মুখের কথা হালকা নয়।
২. ভুলের সংশোধন কষ্টসাধ্য হতে পারে।
৩. ব্যক্তিগত অন্যায় সমাজকল্যাণের মাধ্যমে সংশোধিত হতে পারে।
৪. ঈমানের প্রমাণ আনুগত্যে।
যিহার ছিল নারীর প্রতি অন্যায়। কাফফারা সেই অন্যায়ের গুরুত্ব বোঝাতে কঠোর। এটি নারীর মর্যাদা রক্ষার অংশ।
এই আয়াত পরিবার, সমাজ ও ঈমান—তিন স্তরে কাজ করে:
এটি ইসলামের একটি নীতিগত দিক তুলে ধরে—আইন কেবল শাস্তি নয়; চরিত্রগঠন।
✔ জিহ্বা সংযত রাখা
✔ ভুল করলে আন্তরিক প্রায়শ্চিত্ত
✔ আল্লাহর সীমা মানা
✔ দরিদ্রের অধিকার স্মরণ
✔ ঈমানকে আনুগত্যের মাধ্যমে প্রমাণ
আল্লাহ আমাদেরকে তাঁর নির্ধারিত সীমা সম্মান করার তাওফীক দিন, পরিবারে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করার শক্তি দিন, এবং ভুল হলে আন্তরিকভাবে সংশোধনের পথ গ্রহণ করার ঈমান দান করুন। নিশ্চয় তিনি সীমা নির্ধারণকারী এবং বিচারকারী।
