• বুধবার, ২৩ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ১০:০৮ অপরাহ্ন

পুরুষের জন্য স্বর্ণ হারাম—এই হাদিস কুরআনের মানদণ্ডে বিচার

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ১৩১ Time View
Update : শুক্রবার, ৯ জানুয়ারি, ২০২৬


পুরুষের জন্য স্বর্ণ হারাম—এই হাদিস কুরআনের মানদণ্ডে বিচার

লিখক: মাহাতাব আকন্দ

ইসলামের বিধান নির্ধারণে প্রথম ও শেষ মানদণ্ড হলো কুরআন। রাসূল ﷺ–এর কোনো বক্তব্য, বর্ণনা বা রেওয়ায়েত যদি কুরআনের স্পষ্ট নীতির সঙ্গে সংঘর্ষে যায়, তবে কুরআনের দৃষ্টিতে সেই বর্ণনা নতুন করে বিচারযোগ্য হয়ে পড়ে। ঠিক এই জায়গাতেই “পুরুষের জন্য স্বর্ণ হারাম”—এই হাদিসটি গুরুতর প্রশ্নের মুখে পড়ে।

সহিহ হাদিসগ্রন্থে বর্ণিত হাদিসটি হলো—

হাদিসের আরবি পাঠ:

عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ قَالَ: أَخَذَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ حَرِيرًا فَجَعَلَهُ فِي يَمِينِهِ، وَأَخَذَ ذَهَبًا فَجَعَلَهُ فِي شِمَالِهِ، ثُمَّ قَالَ: «إِنَّ هَذَيْنِ حَرَامٌ عَلَى ذُكُورِ أُمَّتِي، حِلٌّ لِإِنَاثِهِمْ»

আলী ইবন আবি তালিব (রা.) থেকে বর্ণিত—রাসূল সাঃ এক হাতে রেশম এবং অন্য হাতে স্বর্ণ নিয়ে বললেন:
“এই দুটি আমার উম্মতের পুরুষদের জন্য হারাম এবং নারীদের জন্য হালাল।” (আবু দাউদ, হাঃ ৪০৫৭, নাসাঈ হাঃ ৫১৪৮, ইবন মাজাহ  হাঃ ৩৫৯৫, মুসনাদ আহমাদ হাঃ ৯৩৫)

এই হাদিসটি আক্ষরিকভাবে গ্রহণ করলে একটি মৌলিক প্রশ্ন সামনে আসে—
আল্লাহ কি কুরআনে যে জিনিসকে হালাল রেখেছেন, তা কি রাসূল সাঃ নিজে থেকে হারাম ঘোষণা করতে পারেন?

কুরআনের উত্তর এখানে একেবারেই পরিষ্কার।

কুরআন ঘোষণা করে—হারাম ও হালালের অধিকার একমাত্র আল্লাহর। এই অধিকার কোনো নবী, রাসূল বা আলেমের হাতে ন্যস্ত করা হয়নি।

আল্লাহ বলেন—

সূরা আল-আ‘রাফ ৭:৩২

قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ

“বলুন—আল্লাহ যে সৌন্দর্য (অলংকার) তাঁর বান্দাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন, তা কে হারাম করেছে?”

এই আয়াতে “যীনাতুল্লাহ”—আল্লাহর সৌন্দর্য বা অলংকার—শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে। স্বর্ণ নিঃসন্দেহে এর অন্তর্ভুক্ত। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—আয়াতে “ইবাদিহি” (তাঁর বান্দাদের) বলা হয়েছে, নারী বা পুরুষ আলাদা করে বলা হয়নি।

অর্থাৎ কুরআনের ভাষায় অলংকারের ক্ষেত্রে লিঙ্গভিত্তিক কোনো নিষেধাজ্ঞা নেই

এরপর কুরআন আরও জোর দিয়ে জানিয়ে দেয়—হারাম বিষয়গুলো আল্লাহ নিজেই স্পষ্ট করে দিয়েছেন।

সূরা আল-আন‘আম ৬:১১৯

وَقَدْ فَصَّلَ لَكُمْ مَا حَرَّمَ عَلَيْكُمْ

“তিনি তোমাদের জন্য স্পষ্টভাবে ব্যাখ্যা করে দিয়েছেন—কী কী তিনি হারাম করেছেন।”

এই “ফাসসালা” (স্পষ্টভাবে বর্ণনা)–এর পর কুরআন বিভিন্ন স্থানে হারামগুলোর তালিকা দেয়—
মৃত প্রাণী, প্রবাহিত রক্ত, শুকরের মাংস, আল্লাহ ছাড়া অন্য নামে জবাই—এর বাইরে কোনো বস্তুগত অলংকার বা ধাতুর কথা সেখানে নেই।

যদি পুরুষের জন্য স্বর্ণ সত্যিই হারাম হতো, তবে তা এমন কোনো গৌণ বিষয় নয় যে কুরআন তা উল্লেখ করবে না। অথচ কুরআনের কোথাও স্বর্ণকে হারাম বলা হয়নি—না পুরুষের জন্য, না নারীর জন্য।

আরও স্পষ্টভাবে কুরআন সতর্ক করে দেয়—মানুষ যেন নিজেরাই রিজিককে হারাম–হালাল বানিয়ে না নেয়।

সূরা ইউনুস ১০:৫৯

قُلْ أَرَأَيْتُمْ مَا أَنْزَلَ اللَّهُ لَكُمْ مِنْ رِزْقٍ فَجَعَلْتُمْ مِنْهُ حَرَامًا وَحَلَالًا

“আল্লাহ যে রিজিক তোমাদের জন্য নাজিল করেছেন, তোমরা কি তা থেকে নিজেরাই হারাম ও হালাল নির্ধারণ করছ?”

স্বর্ণ আল্লাহর সৃষ্টি, পৃথিবীর রিজিক এবং কুরআনের ভাষায় যীনাহ। একে লিঙ্গভিত্তিকভাবে হারাম ঘোষণা করা কুরআনের এই সতর্কবার্তার সরাসরি আওতায় পড়ে।

এখানেই সংঘর্ষ আরও গভীর হয়, যখন আমরা জান্নাতের বর্ণনায় তাকাই।

কুরআন জান্নাতবাসীদের সম্পর্কে বলে—

সূরা আল-হাজ্জ ২২:২৩

يُحَلَّوْنَ فِيهَا مِنْ أَسَاوِرَ مِنْ ذَهَبٍ

“তাদের সেখানে স্বর্ণের কংকনে অলংকৃত করা হবে।”

কুরআনের কোথাও বলা হয়নি—এটি শুধু নারীদের জন্য। জান্নাতবাসী পুরুষদের জন্য যদি স্বর্ণ অলংকার পুরস্কার হয়, তবে দুনিয়ায় সেটিকে নৈতিকভাবে হারাম ঘোষণা করা কুরআনের সামগ্রিক নীতির সঙ্গে খাপ খায় না। কারণ কুরআনের নীতি হলো—
যা নৈতিকভাবে হারাম, তা জান্নাতের পুরস্কার হতে পারে না।

সবশেষে কুরআনের একটি চূড়ান্ত ঘোষণা সামনে আসে—

সূরা আল-মায়িদা ৫:৩

الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِينَكُمْ

“আজ আমি তোমাদের জন্য দ্বীনকে পূর্ণ করলাম।”

পূর্ণ দ্বীনের মধ্যে নতুন করে স্থায়ী হারাম যোগ করার অর্থ দাঁড়ায়—
দ্বীন পূর্ণ ছিল না, অথবা কুরআনের হারাম তালিকা অসম্পূর্ণ। উভয় দাবিই কুরআনের বিরুদ্ধে।

অতএব কুরআনের মানদণ্ডে দাঁড়িয়ে এই সিদ্ধান্তে পৌঁছানো ছাড়া উপায় থাকে না—

“পুরুষের জন্য স্বর্ণ হারাম”—এই হাদিসটি হয়

  • নির্দিষ্ট সামাজিক প্রেক্ষাপটের উপদেশ,
  • অথবা সাময়িক নির্দেশ,
  • অথবা আক্ষরিক শরঈ হারাম হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়।

কারণ কুরআন যেখানে অলংকারকে আল্লাহর দান, রিজিক ও যীনাহ হিসেবে উপস্থাপন করেছে, সেখানে কোনো বর্ণনাই সেই ঘোষণার ওপর কর্তৃত্ব ফলাতে পারে না।

কুরআনই মীযান।
আর যে বর্ণনা সেই মীযানে টেকে না—তা ধর্মের মানদণ্ড হতে পারে না, যতই “সহিহ” বলা হোক।

পুরুষের জন্য স্বর্ণ হারাম—এই হাদিস কুরআনের মানদণ্ডে বিচার


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page