• মঙ্গলবার, ২২ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৮:৩২ অপরাহ্ন

বিবাদের কারণে লায়লাতুল কদরের জ্ঞান উঠিয়ে নেওয়া

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ১৪৪ Time View
Update : শুক্রবার, ৯ জানুয়ারি, ২০২৬


বিবাদের কারণে লায়লাতুল কদরের জ্ঞান উঠিয়ে নেওয়া—এই হাদিস কুরআনের মানদণ্ডে বিচার

লিখক: মাহাতাব আকন্দ

ইসলামে লায়লাতুল কদর কোনো সাধারণ রাত নয়। কুরআনের ভাষায় এটি এমন এক রজনী, যা হাজার মাসের চেয়েও উত্তম। এই রাতকে কেন্দ্র করে মুসলিম সমাজে গভীর আবেগ, ইবাদত ও প্রত্যাশা গড়ে উঠেছে। অথচ লায়লাতুল কদর সম্পর্কে একটি প্রচলিত হাদিস এমন এক ধারণা দেয়, যা কুরআনের জ্ঞান-দর্শন, আল্লাহর সুবিচার ও নৈতিক নীতির সঙ্গে গুরুতর প্রশ্নের মুখে পড়ে।

সহিহ বুখারীতে বর্ণিত হাদিসটি হলো—

আরবি ইবারত:
عَنْ عُبَادَةَ بْنِ الصَّامِتِ قَالَ خَرَجَ النَّبِيُّ ﷺ لِيُخْبِرَنَا بِلَيْلَةِ الْقَدْرِ فَتَلَاحَىٰ رَجُلَانِ مِنَ الْمُسْلِمِينَ فَقَالَ: «خَرَجْتُ لِأُخْبِرَكُمْ بِلَيْلَةِ الْقَدْرِ فَتَلَاحَىٰ فُلَانٌ وَفُلَانٌ فَرُفِعَتْ، وَعَسَىٰ أَنْ يَكُونَ خَيْرًا لَكُمْ، فَالْتَمِسُوهَا فِي السَّبْعِ وَالتِّسْعِ وَالْخَمْسِ»

সূত্র: সহিহ বুখারী ২০২৩, ৬০৪৯
(আধুনিক প্রকাশনী: ৪৭; ইসলামী ফাউন্ডেশন: ৪৭)

বাংলা অর্থ:
উবাদা ইবনুস সামিত (রা.) থেকে বর্ণিত—
নবী ﷺ লায়লাতুল কদর সম্পর্কে জানানোর জন্য বের হলেন। তখন দু’জন মুসলমান বিবাদে লিপ্ত ছিল। তিনি বললেন, “আমি তোমাদের লায়লাতুল কদর সম্পর্কে জানানোর জন্য বের হয়েছিলাম; কিন্তু অমুক ও অমুকের বিবাদের কারণে তা উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে। হয়তো এটাই তোমাদের জন্য কল্যাণকর। সুতরাং তোমরা তা অনুসন্ধান করো সাতাশ, ঊনত্রিশ ও পঁচিশ রাতে।”

এই হাদিসটি আক্ষরিকভাবে গ্রহণ করলে কয়েকটি গুরুতর প্রশ্ন অনিবার্য হয়ে ওঠে—যেগুলো কুরআনের মৌলিক নীতির সঙ্গে সরাসরি সংঘর্ষে যায়।

প্রথম প্রশ্নটি হলো—
আল্লাহ কি দু’জন মানুষের বিবাদের কারণে সমগ্র উম্মাহ থেকে একটি গুরুত্বপূর্ণ জ্ঞান তুলে নেন?

কুরআন আল্লাহকে পরিচয় করিয়ে দেয় পরম ন্যায়পরায়ণ ও সুবিচারক হিসেবে। সেখানে কোনো সমষ্টিগত শাস্তি দেওয়া হয় না ব্যক্তিগত অপরাধের ভিত্তিতে।

কুরআনের স্পষ্ট ঘোষণা—

সূরা আল-আন‘আম ৬:১৬৪
وَلَا تَزِرُ وَازِرَةٌ وِزْرَ أُخْرَىٰ
“কোনো বহনকারী অন্যের বোঝা বহন করবে না।”

এই আয়াতের আলোকে প্রশ্ন ওঠে—
দু’জন ব্যক্তির বিবাদের দায় কীভাবে পুরো মুসলিম উম্মাহ বহন করবে? যদি লায়লাতুল কদরের নির্দিষ্ট তারিখ “উঠিয়ে নেওয়া” হয়ে থাকে, তাহলে যারা সেই বিবাদে ছিল না, তারা কেন সেই জ্ঞান থেকে বঞ্চিত হবে? এই ধারণা কুরআনের ন্যায়বিচার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

দ্বিতীয়ত, কুরআন লায়লাতুল কদরকে কোনো গোপন বা অনিশ্চিত বিষয় হিসেবে উপস্থাপন করেনি, বরং একে স্পষ্টভাবে সংজ্ঞায়িত একটি বাস্তব ঘটনা হিসেবে তুলে ধরেছে।

সূরা আল-কদর ৯৭:১–৩
إِنَّا أَنْزَلْنَاهُ فِي لَيْلَةِ الْقَدْرِ ۝ وَمَا أَدْرَاكَ مَا لَيْلَةُ الْقَدْرِ ۝ لَيْلَةُ الْقَدْرِ خَيْرٌ مِنْ أَلْفِ شَهْرٍ
“নিশ্চয়ই আমি একে নাজিল করেছি লায়লাতুল কদরে। আর তুমি কি জানো লায়লাতুল কদর কী? লায়লাতুল কদর হাজার মাসের চেয়েও উত্তম।”

কুরআন এখানে বলেনি—এই রাতের জ্ঞান মানুষের ঝগড়ার কারণে তুলে নেওয়া হবে। বরং কুরআন এই রাতকে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্ধারিত, স্থির ও মহিমান্বিত হিসেবে উপস্থাপন করেছে। কুরআনের কোথাও নেই যে, এই রাতের নির্ধারিত জ্ঞান মানবিক বিশৃঙ্খলার কারণে রহিত হয়ে যাবে।

আরও গভীর প্রশ্ন হলো—
আল্লাহর জ্ঞান কি মানুষের আচরণের ওপর নির্ভরশীল?

এই হাদিসটি এমন একটি ধারণা দেয় যে, নবী ﷺ একটি জ্ঞান জানাতে যাচ্ছিলেন, কিন্তু মানুষের বিবাদের কারণে সেই জ্ঞান “উঠিয়ে নেওয়া” হলো। অথচ কুরআন আল্লাহর জ্ঞান সম্পর্কে সম্পূর্ণ ভিন্ন কথা বলে।

সূরা আল-বাকারা ২:২৫৫ (আয়াতুল কুরসি)
وَلَا يُحِيطُونَ بِشَيْءٍ مِنْ عِلْمِهِ إِلَّا بِمَا شَاءَ
“তারা তাঁর জ্ঞানের কিছুই আয়ত্ত করতে পারে না, তিনি যা চান তা ছাড়া।”

আল্লাহ যদি কোনো জ্ঞান দিতে চান, তা কেউ ঠেকাতে পারে না। আর যদি তিনি না দিতে চান, তবে মানুষের ঝগড়া সেই সিদ্ধান্তের কারণ হতে পারে না। সুতরাং “বিবাদের কারণে জ্ঞান উঠিয়ে নেওয়া হয়েছে”—এই বক্তব্য কুরআনের জ্ঞান-দর্শনের সঙ্গে অসংগত।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই হাদিস মানুষের মধ্যে অনিশ্চয়তা ও আন্দাজভিত্তিক ধর্মচর্চা প্রতিষ্ঠা করে। বলা হয়—২৫, ২৭, ২৯ তারিখে অনুসন্ধান করো। অথচ কুরআন ইবাদতকে আন্দাজ বা লটারির ওপর ছেড়ে দেয় না।

কুরআন বলে—

সূরা আল-জিন ৭২:২৬–২৭
عَالِمُ الْغَيْبِ فَلَا يُظْهِرُ عَلَىٰ غَيْبِهِ أَحَدًا ۝ إِلَّا مَنِ ارْتَضَىٰ مِنْ رَسُولٍ
“তিনি অদৃশ্যের জ্ঞানী। তিনি তাঁর অদৃশ্য কাউকে প্রকাশ করেন না—তবে যাকে তিনি রাসূল হিসেবে মনোনীত করেন, তাকে ছাড়া।”

যদি লায়লাতুল কদরের নির্দিষ্ট জ্ঞান আল্লাহ নবীকে দিতে চাইতেন, তাহলে মানুষের ঝগড়া সেই জ্ঞান নষ্ট করতে পারত না। কুরআনের এই নীতির সঙ্গে হাদিসটির বক্তব্য সাংঘর্ষিক।

সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো—এই হাদিসটি অনিচ্ছাকৃতভাবে আল্লাহর সিদ্ধান্তকে মানুষের আচরণের ওপর নির্ভরশীল করে তোলে। অথচ কুরআন বারবার ঘোষণা করে—

সূরা আল-হজ ২২:১৪
إِنَّ اللَّهَ يَفْعَلُ مَا يُرِيدُ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ যা চান তাই করেন।”

আল্লাহর ইচ্ছা কোনো বিবাদে বাধাগ্রস্ত হয় না, তাঁর সিদ্ধান্ত মানবিক বিশৃঙ্খলায় পরিবর্তিত হয় না।

সুতরাং কুরআনের আলোকে সিদ্ধান্ত পরিষ্কার—
লায়লাতুল কদরের মর্যাদা সত্য, কিন্তু দু’জন মানুষের বিবাদের কারণে তার নির্দিষ্ট জ্ঞান তুলে নেওয়ার ধারণা কুরআনের ন্যায়বিচার, জ্ঞান-দর্শন ও আল্লাহর সার্বভৌম ইচ্ছার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।

কুরআনই মীযান।
আর যে বর্ণনা সেই মীযানে টেকে না—তা যত সহিহ গ্রন্থেই থাকুক, তা আক্ষরিকভাবে আকিদা ও নীতির ভিত্তি হতে পারে না।


বিবাদের কারণে লায়লাতুল কদরের জ্ঞান উঠিয়ে নেওয়া—এই হাদিস কুরআনের মানদণ্ডে বিচার


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page