ইসলামে কুরআনই হলো সর্বোচ্চ ও চূড়ান্ত মানদণ্ড। আল্লাহ তাআলা কুরআনকে ফুরকান (সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী) হিসেবে নাজিল করেছেন। ফলে কোনো হাদিস বা বর্ণনা যদি কুরআনের স্পষ্ট বক্তব্য, আকিদাগত নীতি কিংবা বাস্তবতার সঙ্গে সাংঘর্ষিক হয়, তবে সেটিকে গ্রহণ করার আগে গভীরভাবে যাচাই করা অপরিহার্য।
এই আলোচনায় আমরা এমন একটি বহুল প্রচলিত হাদিস পর্যালোচনা করবো, যেখানে বলা হয়েছে—
“শয়তান মানুষের কানে পেশাব করে।”
এই বক্তব্যটি কুরআনের আলোকে আদৌ গ্রহণযোগ্য কি না, সেটিই এখানে বিচার্য।
সহীহ হাদিসে বর্ণিত হয়েছে—
আরবি:
ذَاكَ رَجُلٌ بَالَ الشَّيْطَانُ فِي أُذُنِهِ
বাংলা অর্থ:
“সে এমন একজন ব্যক্তি, যার কানে শয়তান পেশাব করেছে।”
এই কথা বলা হয়েছে সেই ব্যক্তির সম্পর্কে, যে ব্যক্তি ফজরের সালাত আদায় না করে ঘুমিয়ে থাকে।
হাদিসটির আক্ষরিক অর্থ অনুযায়ী শয়তানকে এমন এক সত্তা হিসেবে উপস্থাপন করা হয়, যে মানুষের দেহে প্রবেশ করতে পারে এবং শারীরিক ও জৈবিক কাজ সম্পাদন করতে সক্ষম। এই ধারণা সরাসরি শয়তানের ক্ষমতা ও সীমা সংক্রান্ত কুরআনের মৌলিক শিক্ষার সঙ্গে সংঘর্ষ সৃষ্টি করে।
কুরআনে শয়তানকে কখনোই এমন কোনো শারীরিক ক্ষমতার অধিকারী হিসেবে উপস্থাপন করা হয়নি।
কুরআন স্পষ্টভাবে ঘোষণা করে—
“নিশ্চয়ই আমার বান্দাদের ওপর তোমার কোনো কর্তৃত্ব নেই।”
(সূরা আল-ইসরা, ১৭:৬৫)
এই আয়াত থেকে পরিষ্কার বোঝা যায়, শয়তানের মানুষের ওপর কোনো জবরদস্তিমূলক বা শারীরিক কর্তৃত্ব নেই। তার ভূমিকা সীমাবদ্ধ কেবল প্ররোচনা ও কুমন্ত্রণার মধ্যে।
আরেক জায়গায় বলা হয়েছে—
“সে মানুষের অন্তরে কুমন্ত্রণা দেয়।”
(সূরা আন-নাস, ১১৪:৫)
এখানে শয়তানের কাজ নির্দিষ্ট করে দেওয়া হয়েছে—অন্তরে ওয়াসওয়াসা দেওয়া, দেহে প্রবেশ করে কোনো কার্য সম্পাদন নয়।
কুরআন আরও জানায়, কিয়ামতের দিন শয়তান নিজেই বলবে—
“আমার কোনো ক্ষমতা ছিল না তোমাদের ওপর; আমি শুধু আহ্বান করেছিলাম, আর তোমরা সাড়া দিয়েছিলে।”
(সূরা ইবরাহীম, ১৪:২২)
এই আয়াত প্রমাণ করে যে শয়তানের প্রভাব ছিল নৈতিক ও মানসিক, শারীরিক নয়। অতএব, “কানে পেশাব করা”র মতো ধারণা কুরআনের এই ঘোষণার সঙ্গে সরাসরি বিরোধ সৃষ্টি করে।
অনেকে দাবি করেন, হাদিসটি নাকি রূপক অর্থে বলা হয়েছে। কিন্তু সমস্যা এখানেই শেষ হয় না। কারণ কুরআন যেখানে শয়তানের সীমা এত স্পষ্টভাবে নির্ধারণ করে দিয়েছে, সেখানে এমন রূপক ব্যবহার সাধারণ মানুষের মনে শয়তান সম্পর্কে ভুল আকিদা ও অতিরঞ্জিত ধারণা তৈরি করে।
কুরআনের দৃষ্টিতে শয়তান কোনো দৈহিক বা অতিপ্রাকৃত শক্তিধর সত্তা নয়; বরং সে একটি পরীক্ষাস্বরূপ প্ররোচনাকারী মাত্র।
এই আলোচনার ভিত্তিতে স্পষ্টভাবে বলা যায়—
হাদিসে বর্ণিত “শয়তান মানুষের কানে পেশাব করে” বক্তব্যটি কুরআনের একাধিক মৌলিক আয়াতের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। কুরআন শয়তানকে কখনোই মানুষের দেহে প্রবেশকারী বা শারীরিক কাজ সম্পাদনকারী হিসেবে উপস্থাপন করেনি।
অতএব, কুরআনের মানদণ্ডে বিচার করলে এই বর্ণনাটি আকিদাগতভাবে গ্রহণযোগ্য নয় এবং একে ইসলামের মৌলিক শিক্ষার অংশ হিসেবে উপস্থাপন করা সঠিক হবে না।
Friend of Quran-এর নীতিগত অবস্থান–
কুরআনের বিরুদ্ধে যায়—এমন কোনো বর্ণনা আকিদা, শিক্ষা বা দাওয়াহর ভিত্তি হতে পারে না।
