লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ
কুরআন নিজেকে ঘোষণা করেছে সমগ্র মানবজাতির জন্য হিদায়াত, আলো ও স্মরণিকা হিসেবে। কুরআনের এই সার্বজনীন ঘোষণার আলোকে যখন কিছু হাদিসের বক্তব্য সামনে আসে, তখন স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্ন জাগে—সেগুলো কি কুরআনের মৌলিক নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ? আলোচ্য হাদিসটিও তেমন একটি, যেখানে শত্রুভূমিতে কুরআন নিয়ে সফর করতে নিষেধ করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো—কুরআন যদি সকল মানুষের জন্য উন্মুক্ত গ্রন্থ হয়, তবে এমন নিষেধাজ্ঞা কি গ্রহণযোগ্য?
আরবি:
نَهَى رَسُولُ اللَّهِ ﷺ أَنْ يُسَافَرَ بِالْقُرْآنِ إِلَى أَرْضِ الْعَدُوِّ، مَخَافَةَ أَنْ يَنَالَهُ الْعَدُوُّ
বাংলা অর্থ:
“রাসূল ﷺ শত্রুভূমিতে কুরআন নিয়ে সফর করতে নিষেধ করেছেন—এই আশঙ্কায় যে, তা শত্রুর হাতে পড়ে যেতে পারে।”
(বুখারি–মুসলিম; মেশকাত ৫/২০৯৩)
এই হাদিস থেকে যে ধারণা পাওয়া যায় তা হলো—কুরআন শত্রুর হাতে পড়া অনুচিত বা ঝুঁকিপূর্ণ। কিন্তু কুরআন নিজে কোথাও বলেনি যে, এটি কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য সংরক্ষিত বা অন্যদের থেকে আড়াল করে রাখতে হবে। বরং কুরআন বারবার নিজেকে ঘোষণা করেছে মানুষের জন্য উন্মুক্ত পথনির্দেশনা হিসেবে।
আরবি:
شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِي أُنزِلَ فِيهِ الْقُرْآنُ هُدًى لِّلنَّاسِ
বাংলা অর্থ:
“রমযান মাস—যাতে কুরআন নাজিল করা হয়েছে, যা মানুষের জন্য হিদায়াত।”
(সূরা আল-বাকারা ২:১৮৫)
আরও বলা হয়েছে—
আরবি:
إِنْ هُوَ إِلَّا ذِكْرٌ لِّلْعَالَمِينَ
বাংলা অর্থ:
“এটি তো সমগ্র জগতের জন্য এক উপদেশমাত্র।”
(সূরা ইউসুফ ১২:১০৪)
➡️ এখানে কোথাও ‘মুমিনদের জন্য’ বা ‘নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর জন্য’ বলে সীমাবদ্ধ করা হয়নি।
আরবি:
إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ
বাংলা অর্থ:
“নিশ্চয়ই আমিই এই স্মরণিকা নাজিল করেছি এবং আমিই এর সংরক্ষণকারী।”
(সূরা আল-হিজর ১৫:৯)
➡️ যদি কুরআনের সংরক্ষণ আল্লাহ নিজেই নিশ্চিত করে থাকেন, তবে মানুষের হাতে পড়লে কুরআন নষ্ট হয়ে যাবে—এমন আশঙ্কা কুরআনিক বক্তব্যের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
আরবি:
فَذَكِّرْ بِالْقُرْآنِ مَن يَخَافُ وَعِيدِ
বাংলা অর্থ:
“তুমি কুরআনের মাধ্যমে উপদেশ দাও তাকে, যে আমার সতর্কবার্তাকে ভয় করে।”
(সূরা ক্বাফ ৫০:৪৫)
➡️ কুরআন মানুষকে শুনতে, ভাবতে ও বুঝতে আহ্বান জানায়—লুকিয়ে রাখতে নয়।
এই হাদিসটি যদি কুরআনের বিপরীতে দাঁড় করানো হয়, তবে সংঘাত স্পষ্ট হয়। তবে একটি বিষয় লক্ষণীয়—
অতএব, কুরআনের আলোকে এই বক্তব্যকে সর্বোচ্চ যা বলা যায়—তা হলো সময় ও প্রেক্ষিতভিত্তিক সিদ্ধান্ত, কুরআনিক নীতি নয়।
কুরআনের ভাষায়—
সুতরাং আলোচ্য হাদিসটি চিরস্থায়ী ধর্মীয় বিধান হিসেবে গ্রহণযোগ্য নয়। এটি কুরআনের মৌলিক দর্শনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না, যদি না একে নির্দিষ্ট সময়ের সতর্কতামূলক সিদ্ধান্ত হিসেবে সীমাবদ্ধ রাখা হয়।
শেষ কথা:
কুরআন কোনো গোপন দলিল নয়—এটি উন্মুক্ত সত্য, আলো ও পথনির্দেশনা; যা মানুষের কাছ থেকে লুকিয়ে রাখার নয়, বরং মানুষের কাছে পৌঁছে দেওয়ার জন্যই নাজিল হয়েছে।
