লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ
কুরআন মানুষ সৃষ্টির বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট, মর্যাদাপূর্ণ ও ন্যায়ভিত্তিক ভাষা ব্যবহার করেছে। নারী–পুরুষ উভয়কেই একই মানবিক উৎস থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে—এটাই কুরআনের মৌলিক শিক্ষা। অথচ বুখারি–মুসলিমে বর্ণিত একটি প্রচলিত হাদিসে বলা হয়, নারীকে পাঁজরের বাঁকা হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে এবং তাকে “সোজা করতে গেলে ভেঙে যাবে”—যার ব্যাখ্যা হিসেবে তালাকের কথাও যুক্ত করা হয়। এতে প্রশ্ন ওঠে—আল্লাহ কি তাঁর কিতাবে এমন কোনো কথা বলেছেন?
আরবি:
إِنَّ الْمَرْأَةَ خُلِقَتْ مِنْ ضِلَعٍ، وَإِنَّ أَعْوَجَ شَيْءٍ فِي الضِّلَعِ أَعْلَاهُ، فَإِنْ ذَهَبْتَ تُقِيمُهُ كَسَرْتَهُ، وَإِنْ تَرَكْتَهُ لَمْ يَزَلْ أَعْوَجَ، فَاسْتَوْصُوا بِالنِّسَاءِ
বাংলা অর্থ:
“নারীকে পাঁজরের হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে। পাঁজরের সবচেয়ে বাঁকা অংশ তার ওপরের দিক। তুমি যদি একে সোজা করতে যাও, ভেঙে ফেলবে; আর ছেড়ে দিলে তা বাঁকাই থাকবে। সুতরাং নারীদের বিষয়ে সদুপদেশ গ্রহণ করো।”
(বুখারি–মুসলিম; মেশকাত ৬/৩১০০–৩১০১)
এই হাদিসে তিনটি স্পষ্ট দাবি পাওয়া যায়—
এই দাবিগুলো কুরআনের সৃষ্টি-তত্ত্ব, মানবিক মর্যাদা ও ন্যায়নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ কি না—এটাই মূল প্রশ্ন।
আরবি:
يَا أَيُّهَا النَّاسُ اتَّقُوا رَبَّكُمُ الَّذِي خَلَقَكُم مِّن نَّفْسٍ وَاحِدَةٍ وَخَلَقَ مِنْهَا زَوْجَهَا
বাংলা অর্থ:
“হে মানুষ! তোমরা তোমাদের রবকে ভয় করো, যিনি তোমাদেরকে একটি সত্তা থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তা থেকেই তার সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন।”
(সূরা আন-নিসা ৪:১)
➡️ এখানে পাঁজরের হাড়ের কোনো উল্লেখ নেই; আছে একটি সত্তা (নফস ওয়াহিদা)।
আরবি:
الَّذِي أَحْسَنَ كُلَّ شَيْءٍ خَلَقَهُ
বাংলা অর্থ:
“তিনি সবকিছু যা সৃষ্টি করেছেন, তা সুন্দর ও সুষমভাবে সৃষ্টি করেছেন।”
(সূরা আস-সাজদা ৩২:৭)
➡️ নারীকে স্বভাবগতভাবে “বাঁকা” বলে চিহ্নিত করা এই ঘোষণার সঙ্গে যায় না।
আরবি:
وَلَقَدْ كَرَّمْنَا بَنِي آدَمَ
বাংলা অর্থ:
“আমি আদম সন্তানদের সম্মানিত করেছি।”
(সূরা আল-ইসরা ১৭:৭০)
➡️ এখানে নারী–পুরুষের মধ্যে কোনো জৈবিক বা নৈতিক হীনতার পার্থক্য করা হয়নি।
আরবি:
وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُم مِّنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُم مَّوَدَّةً وَرَحْمَةً
বাংলা অর্থ:
“তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকেই সঙ্গিনী সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে প্রশান্তি পাও; এবং তোমাদের মধ্যে ভালোবাসা ও দয়া স্থাপন করেছেন।”
(সূরা আর-রূম ৩০:২১)
➡️ কুরআনের দাম্পত্য দর্শন ভালোবাসা ও দয়া, “বাঁকা–সোজা” নয়।
এখন স্পষ্টভাবে তুলনা করলে দেখা যায়—
এই ভাষা ও ধারণা কুরআনের সমতা, সম্মান ও ন্যায়-দর্শনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক। বিশেষ করে, নারীকে স্বভাবগতভাবে ত্রুটিপূর্ণ হিসেবে উপস্থাপন করা কুরআনিক মানব-মর্যাদার পরিপন্থী।
কুরআনের সুস্পষ্ট বক্তব্য হলো—
অতএব,
ফয়সালা:
“নারীকে পাঁজরের বাঁকা হাড় থেকে সৃষ্টি করা হয়েছে”—এই বক্তব্য আল্লাহর কিতাবে নেই।
বরং এটি কুরআনের সৃষ্টি-দর্শন ও মানবিক মর্যাদার নীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
