লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ
কুরআন আখিরাতের পরিণতিকে উপস্থাপন করে ঈমান ও সৎকর্মের ফলাফল হিসেবে। মানুষ বিশ্বাস করবে কি করবে না—এটি তার নিজস্ব নির্বাচন; আর সেই নির্বাচন অনুযায়ী বিচার। কিন্তু প্রচলিত একটি হাদিসে দাবি করা হয়—জান্নাতি ও জাহান্নামিদের নাম আগেই পৃথক দুটি কিতাবে লিখে রাখা হয়েছে। এতে মৌলিক প্রশ্ন ওঠে: তাহলে ঈমান, সৎকর্ম, তওবা ও সংশোধনের অর্থ কী থাকে? এবং সবকিছু আগেই নির্ধারিত হলে দায়ভার কার?
আরবি:
هُوَ الَّذِي خَلَقَكُمْ فَمِنكُمْ كَافِرٌ وَمِنكُم مُّؤْمِنٌ
বাংলা অর্থ:
“তিনিই তোমাদের সৃষ্টি করেছেন; অতঃপর তোমাদের মধ্যে কেউ কাফির এবং তোমাদের মধ্যে কেউ মুমিন।”
(সূরা আত-তাগাবুন ৬৪:২)
➡️ এখানে নির্বাচনের বাস্তবতা স্পষ্ট—একটি পূর্বনির্ধারিত তালিকা নয়।
আরবি:
وَمَن يُؤْمِن بِاللَّهِ وَيَعْمَلْ صَالِحًا يُكَفِّرْ عَنْهُ سَيِّئَاتِهِ وَيُدْخِلْهُ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِن تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ خَالِدِينَ فِيهَا أَبَدًا
বাংলা অর্থ:
“যে আল্লাহে বিশ্বাস করে এবং সৎকর্ম করে, তিনি তার পাপ মোচন করবেন এবং তাকে দাখিল করবেন জান্নাতে—যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত; সেখানে তারা চিরকাল থাকবে।”
(সূরা আত-তাগাবুন ৬৪:৯)
আরবি:
وَالَّذِينَ كَفَرُوا وَكَذَّبُوا بِآيَاتِنَا أُولَٰئِكَ أَصْحَابُ النَّارِ خَالِدِينَ فِيهَا
বাংলা অর্থ:
“আর যারা কুফরি করে এবং আমার আয়াতসমূহ অস্বীকার করে—তারাই জাহান্নামের অধিবাসী; সেখানে তারা স্থায়ী হবে।”
(সূরা আত-তাগাবুন ৬৪:১০)
➡️ কুরআনের কাঠামো শর্তভিত্তিক: বিশ্বাস ও কর্ম → ফলাফল।
আরবি (সারসংক্ষেপ):
خَرَجَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ وَمَعَهُ كِتَابَانِ… فَقَالَ لِلَّذِي فِي يَمِينِهِ: هَذَا كِتَابٌ مِنْ رَبِّ الْعَالَمِينَ فِيهِ أَسْمَاءُ أَهْلِ الْجَنَّةِ… ثُمَّ قَالَ لِلَّذِي فِي شِمَالِهِ: وَهَذَا كِتَابٌ فِيهِ أَسْمَاءُ أَهْلِ النَّارِ…
বাংলা অর্থ:
“একদিন রাসূল ﷺ দুইটি কিতাব নিয়ে বের হলেন… ডান হাতের কিতাবে জান্নাতিদের নাম, বংশপরিচয় ও সংখ্যা; আর বাম হাতের কিতাবে জাহান্নামিদের নাম ও বংশপরিচয় লেখা রয়েছে।”
(তিরমিযি; মেশকাত ১/৯০)
এই হাদিসে একটি চূড়ান্ত পূর্বনির্ধারণ উপস্থাপিত হয়—
এতে অবধারিত প্রশ্ন:
আরবি:
كُلُّ نَفْسٍ بِمَا كَسَبَتْ رَهِينَةٌ
বাংলা অর্থ:
“প্রত্যেক ব্যক্তি তার অর্জিত কর্মের জন্য দায়বদ্ধ।”
(সূরা আল-মুদ্দাসসির ৭৪:৩৮)
➡️ দায়বদ্ধতা তখনই অর্থবহ, যখন পরিণতি পূর্বনির্ধারিত তালিকা নয়।
আরবি:
إِنَّا هَدَيْنَاهُ السَّبِيلَ إِمَّا شَاكِرًا وَإِمَّا كَفُورًا
বাংলা অর্থ:
“আমি তাকে পথ দেখিয়েছি—হোক সে কৃতজ্ঞ, অথবা অকৃতজ্ঞ।”
(সূরা আল-ইনসান ৭৬:৩)
➡️ এখানে নির্বাচন মানুষের; তালিকা নয়।
আরবি:
إِنَّ اللَّهَ لَا يَظْلِمُ النَّاسَ شَيْئًا
বাংলা অর্থ:
“নিশ্চয়ই আল্লাহ মানুষের প্রতি কোনো জুলুম করেন না।”
(সূরা ইউনুস ১০:৪৪)
➡️ আগেই নির্ধারিত জান্নাত/জাহান্নামের তালিকা থাকলে বিচার জুলুমে রূপ নেয়।
আরবি:
قُلْ يَا عِبَادِيَ الَّذِينَ أَسْرَفُوا عَلَىٰ أَنفُسِهِمْ لَا تَقْنَطُوا مِن رَّحْمَةِ اللَّهِ
বাংলা অর্থ:
“হে আমার বান্দারা! যারা নিজেদের উপর সীমালঙ্ঘন করেছ—আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না।”
(সূরা আয-যুমার ৩৯:৫৩)
➡️ পরিবর্তনের আহ্বান পূর্বনির্ধারিত তালিকার ধারণাকে নাকচ করে।
তুলনা স্পষ্ট—
এই হাদিসকে আক্ষরিক সত্য ধরলে—
যা কুরআনের সার্বিক শিক্ষার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
কুরআনের সুস্পষ্ট অবস্থান—
অতএব,
ফয়সালা:
জান্নাতি–জাহান্নামিদের নাম আগেই পৃথক কিতাবে লিখে রাখা—এই ধারণা কুরআনের শর্তভিত্তিক বিচারব্যবস্থা, ন্যায়বিচার ও মানব-স্বাধীনতার সাথে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়।
এই হাদিস আক্ষরিকভাবে সঠিক হলে, সকল অপকর্মের দায়ভার মানুষের নয়—আল্লাহর উপরই বর্তায়, যা কুরআনের ঘোষণার বিপরীত।
