• সোমবার, ২১ সেপ্টেম্বর ২০২৬, ০৫:৫৪ অপরাহ্ন

শোভার বস্তু দুনিয়া ও কিয়ামতে—নাকি কিয়ামতে হবে আগুন?

Reporter Name: মাহাতাব আকন্দ / ১৩৬ Time View
Update : সোমবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২৬

শোভার বস্তু দুনিয়া ও কিয়ামতে—নাকি কিয়ামতে হবে আগুন?

লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ


ভূমিকা

কুরআন আল্লাহর সৃষ্টি করা শোভার বস্তু ও বিশুদ্ধ রিয্ক–কে বৈধ ঘোষণা করে এবং স্পষ্টভাবে জানায়—হারাম করার অধিকার কেবল আল্লাহর। অথচ প্রচলিত কিছু হাদিসে বলা হয়, নারী সোনার হার বা কানের বালি পরলে কিয়ামতে তার বদলে আগুনের হার/বালি পরানো হবে। এতে মৌলিক প্রশ্ন ওঠে—আল্লাহ যে শোভার বস্তু বৈধ করেছেন, তা ব্যবহারের জন্য কি তিনি কিয়ামতে আগুনের শাস্তি দেবেন? এবং রাসূল কি আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে বিধান দিতে পারেন?


কুরআনের বক্তব্য: শোভার বস্তু ও বিধানের কর্তৃত্ব (আরবি ও বাংলা)

১) শোভার বস্তু হারাম করা হয়নি

আরবি:

قُلْ مَنْ حَرَّمَ زِينَةَ اللَّهِ الَّتِي أَخْرَجَ لِعِبَادِهِ وَالطَّيِّبَاتِ مِنَ الرِّزْقِ ۚ قُلْ هِيَ لِلَّذِينَ آمَنُوا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا خَالِصَةً يَوْمَ الْقِيَامَةِ
বাংলা অর্থ:
“বলুন, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের জন্য যে শোভার বস্তু ও বিশুদ্ধ রিয্ক বের করেছেন—তা কে হারাম করেছে? বলুন, দুনিয়ার জীবনে তা মুমিনদের জন্য; বিশেষ করে কিয়ামতের দিনে।”
(সূরা আল-আ‘রাফ ৭:৩২)

➡️ কুরআন শোভার বস্তুকে বৈধ বলে ঘোষণা করে—এখানে সোনা আলাদা করে নিষিদ্ধ নয়।


২) কী কী হারাম—সুস্পষ্ট তালিকা

আরবি:

قُلْ إِنَّمَا حَرَّمَ رَبِّيَ الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَالْإِثْمَ وَالْبَغْيَ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَأَنْ تُشْرِكُوا بِاللَّهِ مَا لَمْ يُنَزِّلْ بِهِ سُلْطَانًا وَأَنْ تَقُولُوا عَلَى اللَّهِ مَا لَا تَعْلَمُونَ
বাংলা অর্থ:
“বলুন, আমার রব হারাম করেছেন প্রকাশ্য ও গোপন অশ্লীলতা, পাপ, অন্যায় সীমালঙ্ঘন, আল্লাহর সাথে শরিক করা—যার কোনো প্রমাণ তিনি নাজিল করেননি—এবং আল্লাহ সম্পর্কে এমন কিছু বলা যা তোমরা জান না।”
(সূরা আল-আ‘রাফ ৭:৩৩)

➡️ সোনা/অলংকার এই হারামের তালিকায় নেই।


৩) বিধান দেওয়ার অধিকার কেবল আল্লাহর

আরবি:

إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ
বাংলা অর্থ:
“বিধান দেওয়ার অধিকার কেবল আল্লাহরই।”
(সূরা ইউসুফ ১২:৪০)

আরবি:

وَمَا أُغْنِي عَنكُم مِّنَ اللَّهِ مِن شَيْءٍ ۖ إِنِ الْحُكْمُ إِلَّا لِلَّهِ
বাংলা অর্থ:
“আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে আমি তোমাদের জন্য কিছুই করতে পারি না; বিধান কেবল আল্লাহর।”
(সূরা ইউসুফ ১২:৬৭)

আরবি:

قُلْ مَا يَكُونُ لِي أَنْ أُبَدِّلَهُ مِن تِلْقَاءِ نَفْسِي
বাংলা অর্থ:
“বলুন, আমার পক্ষে নিজ থেকে (আল্লাহর বিধান) বদলানো সম্ভব নয়।”
(সূরা ইউনুস ১০:১৫)

➡️ রাসূল আল্লাহর বিধানের বাইরে কোনো নতুন হারাম নির্ধারণ করেন না।


প্রচলিত হাদিস: সোনার অলংকারে আগুনের শাস্তি (আরবি ও বাংলা)

আরবি (সারসংক্ষেপ):

مَنْ تَحَلَّتْ بِحِلْيَةٍ مِنْ ذَهَبٍ جُعِلَ لَهَا يَوْمَ الْقِيَامَةِ مِثْلُهَا مِنْ نَارٍ…
বাংলা অর্থ:
“যে নারী সোনার হার পরবে—কিয়ামতের দিন তার গলায় অনুরূপ আগুনের হার পরানো হবে; আর যে সোনার কানের বালি পরবে—কিয়ামতের দিন তার কানে অনুরূপ আগুনের বালি পরানো হবে।”
(আবূ দাঊদ, নাসাঈ; মেশকাত ৮/৪২০৬)


সমস্যার মূল দিক

এই হাদিসে যে সমস্যা দেখা দেয়—

  1. বৈধ জিনিসে শাস্তি: কুরআন যে শোভার বস্তু বৈধ করেছে, তা ব্যবহারে আগুনের শাস্তি—বৈপরীত্য
  2. হারাম ঘোষণার প্রশ্ন: সোনার অলংকারকে কার্যত শাস্তিযোগ্য করা হলে তা হারাম ঘোষণা হয়ে যায়—যা কুরআনের তালিকায় নেই।
  3. বিধানের কর্তৃত্ব: রাসূল কি আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে শাস্তি নির্ধারণ করতে পারেন? কুরআন বলছে—না।

কুরআনের আলোকে বিশ্লেষণ

  • শাস্তি নির্ধারিত হয়: কুফরি, শিরক, পাপ, জুলুম, অশ্লীলতা—এসবের জন্য।
  • শোভার বস্তু: বৈধ; কিয়ামতে মুমিনদের জন্যও তা স্বীকৃত (৭:৩২)।
  • হারাম করার অধিকার: কেবল আল্লাহর (১২:৪০)।

যদি সোনার অলংকার ব্যবহারেই আগুনের শাস্তি হতো, তবে কুরআন তা স্পষ্টভাবে হারাম করত—কিন্তু করেনি।


ব্যাখ্যামূলক বিশ্লেষণ

এই বর্ণনাকে আক্ষরিক বিধান ধরলে—

  • কুরআনের বৈধতাকে অকার্যকর করা হয়
  • আল্লাহর বিধানের বাইরে শাস্তি আরোপের ধারণা তৈরি হয়
  • “আল্লাহ সম্পর্কে যা জানা নেই, তা বলা”—এই নিষেধাজ্ঞার (৭:৩৩) মধ্যেই পড়ে

সর্বোচ্চ যে ব্যাখ্যা করা যায়—এগুলো রূপক/নৈতিক সতর্কতা হিসেবে ধরা যেতে পারে (যেমন: অপব্যবহার, অপচয়, অহংকার)। কিন্তু বৈধ অলংকার ব্যবহারে চিরস্থায়ী আগুনের শাস্তি—এটি কুরআনিক ন্যায় ও বিধানতত্ত্বের সাথে সঙ্গতিপূর্ণ নয়।


উপসংহার

কুরআনের আলোকে সুস্পষ্ট সিদ্ধান্ত—

  • আল্লাহ শোভার বস্তু হারাম করেননি; বরং তা মুমিনদের জন্য বৈধ।
  • হারাম ও শাস্তির বিধান কেবল আল্লাহর
  • রাসূল আল্লাহর বিধানের বিরুদ্ধে কোনো নতুন শাস্তিযোগ্য বিধান দেন না।

ফয়সালা:
সোনার হার বা কানের বালি—যা কুরআন বৈধ শোভার বস্তু হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছে—তা ব্যবহারের জন্য কিয়ামতে আগুনের শাস্তি দেওয়ার ধারণা কুরআনিক মানদণ্ডে গ্রহণযোগ্য নয়

শোভার বস্তু দুনিয়া ও কিয়ামতে—নাকি কিয়ামতে হবে আগুন?


আপনার মতামত লিখুন :
More News Of This Category

ফেসবুকে আমরা

Follow our Facebook Page