লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ
ইসলামের নামে প্রচলিত কিছু বর্ণনা রয়েছে, যেগুলো শুধু বিতর্কিত নয়, বরং সরাসরি মানবিক বিবেক ও কুরআনিক নৈতিকতাকে আহত করে। তেমনই একটি ধারণা হলো— কোনো নারী যদি পূর্ণবয়স্ক পুরুষকে নির্দিষ্ট সংখ্যক ঢোক বুকের দুধ পান করায়, তবে তাদের মধ্যে মাহরাম সম্পর্ক প্রতিষ্ঠিত হয়ে যায়। এই বক্তব্য কোনো প্রান্তিক লোককথা নয়; বরং কিছু হাদিসগ্রন্থে বর্ণিত একটি দাবি, যা বহু শতাব্দী ধরে মুসলিম চিন্তাজগতে অস্বস্তি ও প্রশ্নের জন্ম দিয়েছে।
এই ধারণার পক্ষে সাধারণত যে বর্ণনাটি পেশ করা হয়, তা আয়িশা (রা.)–এর সঙ্গে সম্পৃক্ত—
«كَانَ فِيمَا أُنْزِلَ مِنَ الْقُرْآنِ عَشْرُ رَضَعَاتٍ مَعْلُومَاتٍ يُحَرِّمْنَ، ثُمَّ نُسِخْنَ بِخَمْسٍ مَعْلُومَاتٍ»
“কুরআনে নাযিল হয়েছিল—জানা দশবার দুধপান হারাম সম্পর্ক সৃষ্টি করে; পরে তা জানা পাঁচবার দ্বারা রহিত করা হয়।” (সহিহ মুসলিম, ইবনু মাযাহ ১৯৪৪)
এই বর্ণনা এবং সালিম মাওলা আবি হুযাইফা সংক্রান্ত অন্যান্য হাদিস মিলিয়ে একটি ফিকহি সিদ্ধান্ত দাঁড় করানো হয়েছে— প্রাপ্তবয়স্ক পুরুষের দুধপানও মাহরামিয়্যাত সৃষ্টি করতে পারে।
এখানেই প্রশ্নটি আবেগ নয়, বিবেক ও কুরআনিক নৈতিকতার আলোকে তুলতে হয়।
একজন পূর্ণবয়স্ক, যৌনক্ষম পুরুষ যদি কোনো নারীর বুকের দুধ পান করে—
তা দশ ঢোক হোক বা এক ঢোক—
এটি কি স্বাভাবিক মানবিক আচরণ?
এটি কি শালীনতার পরিসরের মধ্যে পড়ে?
নাকি এটি স্পষ্টভাবে সেই সব ঘনিষ্ঠ আচরণের অন্তর্ভুক্ত, যেগুলো মানুষকে যৌন সীমা লঙ্ঘনের দিকে নিয়ে যায়?
কুরআন যিনাকে কেবল একটি শেষ কর্ম হিসেবে দেখেনি; বরং যিনার দিকে নিয়ে যায়—এমন সব আচরণকেই নিষিদ্ধ করেছে—
وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَىٰ إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا
“যিনার কাছেও যেও না। নিশ্চয়ই তা অশ্লীলতা এবং অত্যন্ত নিকৃষ্ট পথ।” (সূরা আল-ইসরা ১৭:৩২)
এখানে “কাছেও যেও না” কথাটির অর্থ হলো—
শারীরিক ঘনিষ্ঠতা, স্পর্শ বা এমন আচরণ যা যৌন উত্তেজনা বা সীমা ভাঙার দিকে নিয়ে যায়
তাহলে প্রশ্ন অনিবার্য—
পূর্ণবয়স্ক পুরুষের মুখ নারীর স্তনের সংস্পর্শে আসা কি যিনার দিকে যাওয়ার অন্তর্ভুক্ত নয়?
কিছু লোক বলেন— “এটা যৌন নয়, এটা আইনি বিষয়।”
এই যুক্তি বাস্তবে নৈতিক বাস্তবতাকে অস্বীকার করে।
নৈতিকতা কোনো সংখ্যার খেলায় চলে না। দশ ঢোক বৈধ, নয় ঢোক অবৈধ।
এভাবে নৈতিকতা নির্ধারণ হয় না। এটি কোনো ঐশী নৈতিকতার ভাষা নয়; এটি কৃত্রিম আইনি কারসাজি, যা মানুষের স্বাভাবিক লজ্জাবোধকে উপেক্ষা করে।
কুরআন দুধপানকে দেখেছে শিশুর পুষ্টি ও মাতৃত্বের প্রেক্ষিতে—নির্দিষ্ট বয়স, নির্দিষ্ট প্রয়োজন ও নির্দিষ্ট সময়ের জন্য।
উদাহরণস্বরূপ—
وَالْوَالِدَاتُ يُرْضِعْنَ أَوْلَادَهُنَّ حَوْلَيْنِ كَامِلَيْنِ
“মায়েরা তাদের সন্তানদের পূর্ণ দুই বছর দুধ পান করাবে।” (সূরা বাকারা ২:২৩৩)
এই আয়াতে স্পষ্টভাবে রয়েছে— মা, শিশু, নির্দিষ্ট সময় (দুই বছর)
কোথাও কুরআন বলেনি যে দুধপান একটি সামাজিক বা আইনি শর্টকাট হবে, যার মাধ্যমে অচেনা নারী–পুরুষের ঘনিষ্ঠতাকে বৈধ করা যাবে।
কুরআন নারীর শরীরকে দেখেছে লজ্জা, সম্মান ও সুরক্ষার পরিসর হিসেবে—
وَلَا يُبْدِينَ زِينَتَهُنَّ إِلَّا مَا ظَهَرَ مِنْهَا
“তারা যেন তাদের সৌন্দর্য প্রকাশ না করে, যা স্বাভাবিকভাবে প্রকাশ পায় তা ছাড়া।” (সূরা আন-নূর ২৪:৩১)
এখানে “সৌন্দর্য” বলতে কেবল অলংকার নয়; বরং সেই সব অঙ্গ বোঝানো হয়েছে, যেগুলো মানুষের ফিতরাতগত লজ্জার সঙ্গে যুক্ত। নারীর স্তন সেই তালিকার কেন্দ্রেই রয়েছে। সেখানে একজন পূর্ণবয়স্ক পুরুষের উপস্থিতি ও সংস্পর্শ— কুরআনের হায়া-দর্শনের সম্পূর্ণ বিপরীত।
এই ধারণা যিনাকে প্রতিরোধ করে না; বরং যিনার দরজাকে আইনি ভাষায় সাজিয়ে দেয়। এটি বলে শরীরের সবচেয়ে ব্যক্তিগত সীমা ভাঙা যাবে, যদি তার নাম পাল্টে দেওয়া যায়।
কিন্তু কুরআন নাম দেখে বিচার করে না; কাজের প্রকৃতি দেখে বিচার করে।
وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ الْفَسَادَ
“আল্লাহ বিপর্যয় ও অশ্লীলতাকে ভালোবাসেন না।” (সূরা বাকারা ২:২০৫-এর অর্থগত নীতি)
এই সব আলোচনার আলোকে একটি সিদ্ধান্ত অনিবার্য—
পূর্ণবয়স্ককে “দশ ঢোক দুধ পান করানো” কোনো ঐশী বিধান হতে পারে না। এটি কুরআনের নৈতিক কাঠামোর সঙ্গে সংঘর্ষে লিপ্ত একটি ধারণা, যা পরবর্তী যুগে ফিকহি ব্যাখ্যার ভেতর ঢুকে পড়েছে।
যে ধারণা—
তা কখনো আল্লাহর দ্বীন হতে পারে না।
শেষ কথা পরিষ্কার—
শরিয়ত মানুষের ফিতরাত রক্ষা করতে আসে, ফিতরাত ভাঙতে নয়।
আর যে বর্ণনা পূর্ণবয়স্ক নারী–পুরুষের মধ্যে এমন ঘনিষ্ঠতাকে বৈধ বলে, তা কুরআনের আলোকে গ্রহণযোগ্য নয়—তা যত “হাদিস” নামেই প্রচারিত হোক না কেন।
কুরআনই নৈতিকতার মানদণ্ড।
আর যে ধারণা কুরআনের নৈতিক সীমারেখা ভেঙে দেয়—তা দ্বীন নয়, দ্বীনের নামে সংযোজিত বোঝা।
