রমজানে শয়তান শিকলবদ্ধ থাকে—এই কথাটি এতবার, এত আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে বলা হয়েছে যে অনেকেই একে কুরআনের অংশ ভেবে বসে। অথচ এই বক্তব্যের মুখোমুখি দাঁড়ালে আবেগ দিয়ে নয়, ব্যাখ্যার কৌশল দিয়ে নয়—শুধু কুরআনের ঘোষণাই যথেষ্ট। কারণ এখানে প্রশ্নটা কোনো ফিকহি শাখা-প্রশাখার নয়, এখানে প্রশ্ন আল্লাহর ওয়াদা নিয়ে। আর আল্লাহর ওয়াদা একবার কুরআনে ঘোষিত হলে, তার ওপর আর কোনো বর্ণনা দাঁড়াতে পারে না।
কুরআন স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে—শয়তান নিজেই আল্লাহর কাছে কিয়ামত পর্যন্ত অবকাশ চেয়েছিল, এবং আল্লাহ সেই অবকাশ মঞ্জুর করেছেন। এই কথাটি কোনো ইঙ্গিত নয়, কোনো রূপক নয়, বরং সরাসরি ঘোষণা। কুরআন বলে—
قَالَ أَنْظِرْنِي إِلَىٰ يَوْمِ يُبْعَثُونَ قَالَ إِنَّكَ مِنَ الْمُنْظَرِينَ
“শয়তান বলল, আমাকে সেই দিন পর্যন্ত অবকাশ দিন যেদিন তারা পুনরুত্থিত হবে। আল্লাহ বললেন, নিশ্চয়ই তুমি অবকাশপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত।” (সূরা আল-আ‘রাফ ৭:১৪–১৫)
এই ঘোষণায় কোনো ব্যতিক্রম নেই। আল্লাহ বলেননি—তোমাকে কিয়ামত পর্যন্ত ছাড় দিলাম, তবে বছরে এক মাস শিকলে বাঁধব। রমজান, শাবান, শুক্রবার—কোনো কিছুর কথাই এখানে নেই। একই কথা আবার পুনরাবৃত্তি হয়েছে অন্য সূরায়—
قَالَ رَبِّ فَأَنْظِرْنِي إِلَىٰ يَوْمِ يُبْعَثُونَ قَالَ فَإِنَّكَ مِنَ الْمُنْظَرِينَ
“শয়তান বলল, হে আমার প্রতিপালক, আমাকে পুনরুত্থানের দিন পর্যন্ত অবকাশ দিন। আল্লাহ বললেন, নিশ্চয়ই তুমি অবকাশপ্রাপ্ত।” (সূরা আল-হিজর ১৫:৩৬–৩৭)
এটি সময়ভিত্তিক বা মৌসুমি কোনো অবকাশ নয়; এটি অবিচ্ছিন্ন অবকাশ। আর কুরআনের একটি মৌলিক নীতি হলো—আল্লাহ তাঁর প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না। কুরআন নিজেই ঘোষণা করে—
إِنَّ اللَّهَ لَا يُخْلِفُ الْمِيعَادَ
“নিশ্চয়ই আল্লাহ প্রতিশ্রুতি ভঙ্গ করেন না।” (সূরা আলে ইমরান ৩:৯)
অতএব যখন আল্লাহ শয়তানকে কিয়ামত পর্যন্ত অবকাশ দেওয়ার ওয়াদা করেন, তখন সেই ওয়াদার ভেতরে রমজানি ব্যতিক্রম ঢোকানো মানে আল্লাহর ঘোষণাকে শর্তসাপেক্ষ করে ফেলা। এখানে যুক্তিগতভাবে কোনো মাঝামাঝি পথ নেই। হয় কুরআনের ঘোষণা সত্য, নয়তো “রমজানে শয়তান শিকলবদ্ধ”—এই হাদিসটি আক্ষরিকভাবে সত্য। দুটো একসঙ্গে সত্য হতে পারে না।
কুরআন আরও একধাপ এগিয়ে শয়তানের নিজের ঘোষণাও তুলে ধরে। শয়তান আল্লাহর সামনে কসম করে বলে—
فَبِعِزَّتِكَ لَأُغْوِيَنَّهُمْ أَجْمَعِينَ إِلَّا عِبَادَكَ مِنْهُمُ الْمُخْلَصِينَ
“তোমার মহিমার শপথ! আমি অবশ্যই সবাইকে বিভ্রান্ত করব—তোমার নির্বাচিত বান্দারা ছাড়া।” (সূরা সদ ৩৮:৮২–৮৩)
এই ঘোষণাতেও কোনো মৌসুমি বিরতি নেই। কুরআন বলেনি—রমজান এলে এই কসম স্থগিত হয়ে যায়। বরং কুরআন পুরো সময়জুড়েই মানুষকে সতর্ক করে দেয়—শয়তান থাকবে, প্ররোচনা দেবে, কিন্তু দায় তোমারই।
এখানেই আসে বাস্তবতার প্রশ্ন। যদি সত্যিই রমজানে শয়তান শিকলবদ্ধ থাকে, তাহলে রমজানে পাপ হয় কীভাবে? রমজান মাসেই কি ব্যভিচার বন্ধ হয়ে যায়? রমজান মাসেই কি সুদ, ঘুষ, দুর্নীতি, জুলুম, মিথ্যা, প্রতারণা থেমে যায়? বাস্তবতা সবাই জানে—না। বরং অনেক ক্ষেত্রে রমজানেই দ্বিচারিতা বাড়ে—দিনে রোজা, রাতে অন্যায়। যদি শয়তান সত্যিই বন্দি থাকত, তাহলে এই পাপগুলোর দায় কার?
কুরআন এই প্রশ্নের উত্তর খুব পরিষ্কারভাবে দেয়। মানুষ পাপ করে নিজের প্রবৃত্তির কারণে, শয়তান শুধু উসকানি দেয়। কুরআন বলে—
وَنَفْسٍ وَمَا سَوَّاهَا فَأَلْهَمَهَا فُجُورَهَا وَتَقْوَاهَا
“মানুষের আত্মাকে তিনি সঠিক ও ভুলের বোধ দান করেছেন।” (সূরা আশ-শামস ৯১:৭–৮)
অর্থাৎ পাপের বীজ মানুষের ভেতরেই আছে। তাই কুরআন কখনোই মানুষকে শয়তানের অনুপস্থিতি বা উপস্থিতির অজুহাত দেয় না। বরং স্পষ্ট করে বলে—
وَأَنْ لَيْسَ لِلْإِنْسَانِ إِلَّا مَا سَعَىٰ
“মানুষ যা নিজে চেষ্টা করে, তাই তার প্রাপ্য।” (সূরা আন-নাজম ৫৩:৩৯)
এমনকি কিয়ামতের দিন শয়তান নিজেই ঘোষণা করবে—
مَا كَانَ لِيَ عَلَيْكُمْ مِنْ سُلْطَانٍ إِلَّا أَنْ دَعَوْتُكُمْ فَاسْتَجَبْتُمْ لِي
“আমি তোমাদের ওপর কোনো জোর খাটাইনি; আমি শুধু ডাক দিয়েছিলাম, আর তোমরাই সাড়া দিয়েছিলে।” (সূরা ইবরাহিম ১৪:২২)
এই ঘোষণার পর আর সন্দেহ থাকে না—পাপের দায় মানুষের, শয়তানের নয়। তাহলে রমজানে শয়তানকে শিকলবদ্ধ করার ধারণা মানুষের দায়িত্ববোধকেই দুর্বল করে। এটি বোঝাতে চায়—রমজানে ভালো হওয়া সহজ, কারণ শয়তান নেই; আর বাকি এগারো মাস পাপ করলে দায় শয়তানের। কুরআন এই দায় হস্তান্তরের সংস্কৃতিকে সম্পূর্ণ ভেঙে দেয়।
সুতরাং সিদ্ধান্ত আবারও স্পষ্ট জায়গায় এসে দাঁড়ায়। যদি কুরআন সত্য হয়—আর কুরআন সত্য—তাহলে “রমজানে শয়তান শিকলবদ্ধ”—এই হাদিসটি আক্ষরিক অর্থে গ্রহণযোগ্য হতে পারে না। হয় এটি রূপক, নয় ভুল ব্যাখ্যা, নয় নির্দিষ্ট অর্থে সীমাবদ্ধ কোনো বক্তব্য। কিন্তু এটিকে আল্লাহর ঘোষণার ওপরে বসানো যায় না।
কারণ কুরআনই মীযান।
আল্লাহ ওয়াদা ভঙ্গ করেন না।
আর যে বর্ণনা কুরআন ও বাস্তব—দুয়ের সঙ্গেই সংঘর্ষে যায়, তা যত পরিচিতই হোক, সত্য হতে পারে না।
