লিখকঃ মাহাতাব আকন্দ
“ইসলামের স্তম্ভ পাঁচটি”—এই বাক্যটি মুসলিম সমাজে এতটাই প্রচলিত যে, একে প্রশ্ন করা যেন অপরাধের সমান। শিশুর মুখে মুখে, মসজিদের মিম্বরে, মাদরাসার পাঠ্যসূচিতে—এই পাঁচটি বিষয়কে ইসলাম নামক ঘরের একমাত্র ভিত্তি হিসেবে উপস্থাপন করা হয়। অথচ বিস্ময়কর বাস্তবতা হলো—এই “পাঁচ স্তম্ভ” ধারণাটি কুরআনের কোনো আয়াত নয়; এটি একটি হাদিসভিত্তিক কাঠামো, যা আক্ষরিকভাবে গ্রহণ করলে কুরআনের ইসলাম-সংজ্ঞা সংকুচিত হয়ে পড়ে।
হাদিসটি এভাবে বর্ণিত—
রাসূল ﷺ বলেন— “ইসলাম পাঁচটি বিষয়ের ওপর প্রতিষ্ঠিত: আল্লাহ ছাড়া কোনো উপাস্য নেই এবং মুহাম্মাদ ﷺ আল্লাহর রাসূল—এ কথার সাক্ষ্য দেওয়া, সালাত কায়িম করা, যাকাত আদায় করা, হাজ্জ সম্পাদন করা এবং রমযানের রোজা রাখা।”
(সহিহ মুসলিম ১৬; বুখারী ৪৫১৪)
এই বর্ণনাটি প্রশ্নাতীত ধরে নিলে প্রথম যে সমস্যাটি দেখা দেয়, তা হলো—কুরআন ইসলামকে কখনোই পাঁচটি আচারে সীমাবদ্ধ করেনি। বরং কুরআন ইসলামের পরিচয় দিয়েছে একটি পূর্ণাঙ্গ আত্মসমর্পণ, নৈতিক দায়িত্ব ও জীবনব্যবস্থার নাম হিসেবে।
কুরআনের ভাষায় ইসলাম কোনো তালিকা নয়, এটি একটি অবস্থান—
وَمَنْ أَسْلَمَ وَجْهَهُ لِلَّهِ وَهُوَ مُحْسِنٌ فَلَهُ أَجْرُهُ عِنْدَ رَبِّهِ
বাংলা অর্থ:
“যে ব্যক্তি আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করে এবং সৎকর্মশীল হয়—তার প্রতিদান তার প্রতিপালকের কাছে রয়েছে।”
এখানে ইসলাম মানে পাঁচটি ইবাদতের নাম নয়; ইসলাম মানে আল্লাহর কাছে নিজেকে সমর্পণ করা। এই সমর্পণ জীবনের সব ক্ষেত্রে বিস্তৃত—নৈতিকতা, বিচার, অর্থনীতি, ক্ষমতা, সম্পর্ক—সবকিছুতে।
কুরআন যখন ঈমান ও দ্বীনের সারাংশ বলে, তখন সেখানে পাঁচটি স্তম্ভের তালিকা দেয় না। বরং বলে—
قَالَتِ الْأَعْرَابُ آمَنَّا قُلْ لَمْ تُؤْمِنُوا وَلَٰكِنْ قُولُوا أَسْلَمْنَا
বাংলা অর্থ:
“বেদুইনরা বলে—আমরা ঈমান এনেছি। বলুন—তোমরা ঈমান আনোনি; বরং বলো, আমরা আত্মসমর্পণ করেছি।”
এখানে দেখা যায়—ইসলাম কোনো আনুষ্ঠানিক তালিকার নাম নয়; এটি একটি অবস্থা, একটি নৈতিক অবস্থান।
আরও বড় প্রশ্ন হলো—যদি ইসলাম সত্যিই পাঁচটি স্তম্ভের ওপর দাঁড়িয়ে থাকে, তাহলে কুরআন কেন এত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দেয় যে নামাজ, রোজা, হজ—even এগুলোও মূল্যহীন হয়ে যায় যদি নৈতিকতা ও ইনসাফ না থাকে?
فَوَيْلٌ لِلْمُصَلِّينَ الَّذِينَ هُمْ عَنْ صَلَاتِهِمْ سَاهُونَ
বাংলা অর্থ:
“ধ্বংস তাদের জন্য, যারা সালাত আদায় করে—কিন্তু সালাতের চেতনা থেকে উদাসীন।”
অর্থাৎ সালাত নিজেই ইসলামের নিশ্চয়তা নয়। তাহলে কীভাবে পাঁচটি আমলকে ইসলামের স্তম্ভ ঘোষণা করা হয়?
কুরআন ইসলামের ভিত্তি হিসেবে যে বিষয়টি তুলে ধরে, তা হলো তাকওয়া ও ন্যায়বিচার—
اعْدِلُوا هُوَ أَقْرَبُ لِلتَّقْوَىٰ
বাংলা অর্থ:
“ন্যায়বিচার করো—এটাই তাকওয়ার নিকটতম।”
কুরআনের এই কাঠামোতে ইসলাম কোনো ধর্মীয় চেকলিস্ট নয়। বরং এটি মানুষের চরিত্র, সিদ্ধান্ত ও দায়বদ্ধতার নাম।
পাঁচ স্তম্ভের ধারণা সমাজে কী প্রভাব ফেলেছে?
এটি মানুষকে শিখিয়েছে—
নামাজ পড়ো, রোজা রাখো, হজ করো—ব্যস, ইসলাম পূর্ণ।
কিন্তু কুরআন বলে—
জুলুম করেও নামাজ পড়লে, প্রতারণা করেও রোজা রাখলে, মানুষের হক নষ্ট করেও হজ করলে—এগুলো আল্লাহর কাছে গ্রহণযোগ্য নয়।
كُونُوا قَوَّامِينَ بِالْقِسْطِ
বাংলা অর্থ:
“ন্যায়ের ওপর দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত হও।”
এই আয়াত ইসলামের স্তম্ভের কথা বলছে—কিন্তু সেখানে পাঁচটি আচার নেই, আছে ন্যায়।
সুতরাং সমস্যা হাদিস বলায় নয়; সমস্যা হলো—এই হাদিসকে কুরআনের ওপর বসিয়ে দেওয়া। রাসূল ﷺ কখনোই কুরআনের বিপরীতে কোনো নতুন সংজ্ঞা দিতে পারেন না। যদি কোনো বর্ণনা ইসলামের ব্যাপ্তিকে সংকুচিত করে, নৈতিক দায়কে আচার দিয়ে প্রতিস্থাপন করে—তাহলে সেই বর্ণনাকে কুরআনের আলোকে পুনর্বিবেচনা করতেই হবে।
ইসলাম পাঁচটি স্তম্ভের নাম নয়।
ইসলাম হলো—আল্লাহর কাছে সম্পূর্ণ আত্মসমর্পণ,
ন্যায় প্রতিষ্ঠা,
মানুষের অধিকার রক্ষা,
এবং প্রতিটি কাজে তাকওয়ার উপস্থিতি।
কুরআনই মীযান।
যে সংজ্ঞা সেই মীযানে টেকে না—তা ইসলামের চূড়ান্ত ব্যাখ্যা হতে পারে না, যত পরিচিতই হোক।
